রক্তপত্র - অপরেশ পাল

অলংকরণ : সুমিত রায়
বি. দ্র.- এই লেখার কিছু অংশের বিবরণ ও ভাষা সব ধরণের পাঠকের উপযুক্ত নয়।
এক

কর্কশ একঘেয়ে শব্দ রুমের দেয়ালে বারবার প্রতিফলিত হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে চাপা গোঙানির একটা শব্দে শোনা যাচ্ছিলো। তবে এ মুহূর্তে শুধু হাড় কাটার একঘেয়ে শব্দটি শোনা যাচ্ছে। বিশাল একটা রুমের ঠিক মাঝ বরাবর একটা চেয়ার বসানো রয়েছে। চেয়ারটি ফ্লোরের সাথে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাই চাইলেও চেয়ারে বেঁধে রাখা ছাব্বিশ বছর বয়সী মেয়েটির নড়ার কোন ক্ষমতা নেই। রুমে আরেকজন ব্যক্তি রয়েছে। নিবিষ্ট মনে মেয়েটির পা একটি টুলের উপর রেখে ধারালো করাতের ব্লেড দিয়ে ঘষে যাচ্ছে। তার যেন বেঁচে থাকা, মরে যাওয়া এর উপর নির্ভর করতে পারে। মেয়েটির ডান পা হাঁটুর উপর থেকে আলাদা করার পর শক্ত করে ব্যান্ডেজ করে অন্য পা কাটতে শুরু করলো লোকটি। মেয়েটির চেতনা কিছুক্ষণ আগে ফিরে এসেছে। করাত হাতে লোকটার উদেশ্য বোঝার সাথে সাথে শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে চিৎকার করার চেষ্টা করলো মেয়েটি। তবে উল্লেখযোগ্য কোন ফলাফল পাওয়া গেল না। মুখের ভিতরে ভালোভাবে কাপড় গুঁজে রাখার কারণে চিৎকার চাপা পড়ে গেল। আতঙ্কিত চোখে মেয়েটি লোকটির দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখ বেয়ে টপাটপ পানি পড়ছে। বুঝতে পারছে তার কোন রক্ষা নেই। ষাট ওয়াটের বাল্বের আলোতে মেয়েটি স্পষ্ট দেখলো তার বাম পা টাও আলাদা করা হয়েছে। সময় নিয়ে এবার ব্যান্ডেজ করেলো লোকটি। বেশ কিছুক্ষণ তার কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ করে ড্রিল মেশিনের শব্দ শুনে আঁতকে উঠলো মেয়েটি। এখন কী হবে তার? ড্রিল মেশিন দিয়ে নতুন কোন অত্যাচার করতে চায় তার উপর? নিজের শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে এসব ভেবে যখন মেয়েটি কূল পাচ্ছে না ঠিক তখন তার পিছনে এসে লোকটি দাঁড়ালো। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে ড্রিল মেশিনটা চালু করলো লোকটি। তারপর আস্তে আস্তে মেয়েটির মাথার পিছনের অংশে চেপে ধরলো মেশিনটি। হাড় ছিদ্র হওয়ার ভয়ঙ্কর শব্দ ড্রিলমেশিনের শব্দ ছাপিয়ে শোনা যাচ্ছে। মেয়েটি অসহ্য যন্ত্রণায় মাথা নাড়ানোর শেষ চেষ্টা করলো। কিন্তু তাকে এমনভাবে চেয়ারের সাথে আটকে রাখা হয়েছে যে মাথাটা এক চুল নাড়াচাড়া করতে পারলো না। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো মেয়েটি। তবে লোকটির কাজ এখনো শেষ হয়নি। ড্রিলমেশিন দিয়ে সে ক্রমাগত ছিদ্রের আকার বড় করে নিচ্ছে। ছিদ্র বড় হতে হতে এখন এতটা বড় হয়েছে যে যেকোন মানুষের মোটা দুই আঙ্গুল প্রবেশ করতে পারবে।

হাতের ড্রিলমেশিনটা রেখে একটা প্লাস্টিক পাইপ ঠোঁটে লাগিয়ে নিলো লোকটি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে পাইপের অপর প্রান্তে মেয়েটির মাথার সদ্য ছিদ্র করা ছিদ্রে প্রবেশ করালো। কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে পাইপে টান দিতে শুরু করলো সে। থোকা থোকা ব্রেইনের অংশ পাইপের মাঝে দিয়ে এসে তার গলার প্রবেশ করছে। দ্রুত খাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। এ মুহূর্তে তাকে দেখলো মনে হবে মেয়েটির ব্রেইন খাওয়াটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর মস্তিষ্ক খাওয়া তার পেশা। নিজের তৃপ্তি মিটিয়ে ব্রেইন গলাধঃকরণ করছে সে। থোকা থোকা জমাটবাঁধা মস্তিষ্ক পাইপের মধ্যে দিয়ে খুব দ্রুত শেষ হয়ে গেল। লোকটি হাতে আবার ধারালো করাতটি তুলে নিলো। লাইটের আলোতে চিকচিক করছে সেটি। আস্তে আস্তে ডান হাতটি কাটতে শুরু করলো সে। খুব বেশি সময় লাগলো না হাতটি আলাদা করতে। এরপর অন্য হাতটি কাটতে শুরু করলো। ঘসঘস বিশ্রী শব্দ রুমের দেয়ালে বারবার প্রতিফলিত হচ্ছে। হাত আলাদা করার পর মাথা কাটতে শুরু করলো সে। কণ্ঠনালীতে দ্রুত ব্লেড চালাচ্ছে। সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। রক্তে ফ্লোর ভেসে যাচ্ছে। তবে সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই তার। লাশের ব্যবস্থা করা হলে গরম পানি দিয়ে রুম পরিষ্কার করলেই হবে। ছিটেফোঁটাও রক্তের দাগ থাকবে না তখন। তবে রক্তের দাগ থাকলেও কিছু আসে যায় না। এখানে কেউ এসে দেখার নেই। প্রশ্ন করার নেই কেন এখানে রক্ত পড়ে রয়েছে। তবে রক্তের একটা বাজে গন্ধ আছে কিনা। সময়ের সাথে বিশ্রী গন্ধ ছড়ায়। তাজা রক্তই ভালো, ভাবছে লোকটি। খেতেও ভালো লাগে। ভাবতে ভাবতে মেয়েটির মাথাটা আলাদা করে ফেললো লোকটি। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে সেখান থেকে। তবে গতিটা এখন একটু কম। মাথা ফ্লোরে রেখে মেয়েটির কাটা কণ্ঠনালীতে মুখ লাগিয়ে রক্ত পান করতে লাগলো। খুব তৃষ্ণা পেয়েছে তার। আর এ তৃষ্ণা পানিতে মেটাবার না। রক্ত দিয়ে মেটানোর। তাজা রক্ত দিয়ে।

রক্ত কিছুক্ষণ পান করার পর কণ্ঠনালী থেকে মুখ তুলে নিলো লোকটি। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত এখনো সেখান থেকে পড়ছে। হাতে এবার একটা বড়সড় ধারালো ছুরি তুলে নিলো সে। স্টিলের ছুরিটা একটু পর পর লাইটের আলো প্রতিফলন করছে। বুকের মাঝখানে এসে ছুরিটা আটকে গেল। হাতুড়ি দিয়ে ছুরির উল্টোপাশে আঘাত করতে থাকলো লোকটি। দশ বারোটা আঘাত করার পর ছুরিটা আবার এগুতে লাগলো। দেখতে দেখতে পুরো শরীরটা দুভাগ হয়ে গেল। লোকটি অনেক আগেই দড়ি খুলে নিয়েছিলো। যে দড়িগুলো মেয়েটিকে বাঁধবার জন্য সে ব্যবহার করেছিলো। তাই মেয়েটির শরীর আলাদা করে রাখতে খুব একটা অসুবিধা হলো না। রুমের ফ্লোরের আসল রঙ রক্তের লাল রঙে ঢেকে গিয়েছে। রক্ত গুলো এরমধ্যেই শুকাতে শুরু করছে। নাহ্ এবার রক্ত তুলতে বেশ কষ্ট হবে। বিড়বিড় করে নিজের মনেই কথাটা বললো লোকটি। মেয়েটির নগ্ন শরীরের দিকে তাকালো সে। মেয়েটিকে বাঁধার আগেই জামাকাপড়গুলো খুলে নিয়েছিলো সে। নাহলে কাটাকুটি করা বেশ ঝামেলা। মেয়েটির হৃদপিণ্ড স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হাতের ছুরি দিয়ে হৃদপিণ্ডের শিরা ধমনী কেটে ফেললো সে। হৃদপিণ্ড হাতে নিলে দাঁড়ালো লোকটি। লাইটের আলোতে হৃদপিণ্ডের অলিন্দ আর নিলয় স্পষ্ট। হাতে হৃদপিণ্ডের উষ্ণতা অনুভব করছে সে। অল্প কিছুক্ষণ হয়েছে কিনা, উষ্ণ থাকাটাই স্বাভাবিক। মুখটা বড় কে হাঁ করে কামড় বসিয়ে দিলো সে। অনেকটা রবারের মত পেশীগুলি কচকচ শব্দ তুলে সে চাবাতে থাকলো। কোন ভালো স্বাদ পাচ্ছে না লোকটি। তারপরও সে দ্বিতীয়বারের মত হৃদপিণ্ডে কামড় দিলো। প্রায় পঁচিশ মিনিট হৃদপিণ্ড শেষ করতে লাগলো তার। রুমে লাশ লাশ একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। গন্ধটা লোকটার খুব পছন্দের। পলিথিনের প্যাকেটে লাশের অংশগুলো পেঁচিয়ে নিতে লাগলো। লাশের ব্যবস্থা করতে হবে।

দুই

রোকনের নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। রোকন ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের একজন কর্মকর্তা। তবে সাধারণ কর্মকর্তা না। স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন এজেন্ট। উপরন্তু এই স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইন চার্জ সে। রোকনের সম্পূর্ণ নাম জোবায়ের আহামেদ রোকন। বয়স একত্রিশ তার। এ বয়সে তার মাথায় বেশ কিছু সাদা চুল শোভা পাচ্ছে। তবে সাদা চুলগুলো দেখতে খারাপ লাগে না। গত চার মাসে ছয়টা খুন হয়েছে। হ্যাঁ প্রতিদিনই দেশে খুনোখুনি হয়। সেটা নিয়ে পুলিশের মাথাব্যাথা। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের না। তবে এ খুনগুলো স্বাভাবিক না। তাই যত সমস্যা আর দায়ভার তাদের নিতে হয়। খুনগুলো খুব ভয়াবহ যার কারণে তার উপর এসে এ কেসের দায়িত্ব বর্তাচ্ছে। প্রথম খুনটা হয়েছিলো গত বছরের সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ। পলিমারের ব্যাগে ভালো করে পেঁচিয়ে লাশটা খুনি ডাষ্টবিনে ফেলে গিয়েছে। ডাষ্টবিনের কুকুরগুলো লাশের গন্ধ পেয়ে অদ্ভুত আচরণ করেছিলো। তাই মানুষজন লাশ আবিষ্কার করতে পারে। লাশটির মাথা আলাদা করা ছিলো। পেটের অংশটা পুরোপুরি আলাদাভাবে ছিলো। কাটা অংশ দিয়ে নাড়িভুড়ি বের হয়ে ভয়াবহ অবস্থা। মাথাটাকেও খুনি রেহাই দেয়নি। মাথায় চামড়া তুলে ফেলা হয়েছিলো। এরপর দাঁতগুলো একটাও নেই। দেখে মনে হচ্ছিলো জীবন্ত অবস্থায় দাঁত টেনে তোলা হয়েছে। আর এ কাজে সম্ভবত প্লায়ার টাইপ কিছু ব্যবহার করা হয়েছে। ঠোঁটের অবস্থাও ভয়াবহ। ঠোঁটের দুপ্রান্ত ধারালো ছুরি দিয়ে আলাদা করা হয়েছে। দাঁতহীন মাড়ি সেখানে থেকে বেরিয়ে ছিলো। যে মেয়েটার লাশ পাওয়া গিয়েছিলো তার জীবিত অবস্থার ছবি দেখেছিলো রোকন। যে কেউ এ মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে চাইবে। কিন্তু তার লাশের অবস্থা কেউ যদি সামনাসামনি দেখে তাহলে তার কয়েক মাসের ঘুম হারাম হয়ে যাবে। মেয়েটার নাম ছিলো লিসা। লাশ আবিষ্কারের তিন দিনের মাথায় তাকে এ কেসে নিযুক্ত করা হয়। রোকন প্রথমে ধরে নিয়েছিলো ব্যক্তিগত আক্রোশে খুনটা হয়েছে। সেই হিসাবে তার তদন্ত চলছিলো। কিন্তু অক্টোবরের চব্বিশ তারিখের খুনটা তাকে অন্যকিছু ভাবতে বাধ্য করে। তাকে বাধ্য করে ভাবতে যে খুনি একজন সাইকোপ্যাথ।

দ্বিতীয় খুনটা প্রথমটার থেকে কম যায় না। বলা যায় ভয়াবহতার দিক থেকে এক কাঠি উপরে। এবার ভিকটিম ছিলো বাইশ বছর বয়সী একটা মেয়ে। নাম তমা। ভার্সিটি পড়ুয়া সাধারণ মেয়ে। খুনের ভয়াবহতা বেশি বলার কারণ হচ্ছে এবার খুনী মেয়ের নিচের অংশের উপর অত্যাচার চালিয়েছে। মেয়ের পায়ের প্রতিটি আঙ্গুলের প্রথমে নখ তুলেছে সে। তারপর ব্যান্ডেজ করেছে। এরপর ধারালো কিছু দিয়ে আঙ্গুলগুলো কেটেছে। ব্যান্ডেজ করা আঙ্গুলগুলো লাশের সাথে পাওয়া গিয়েছিলো। পায়ের পাতার চামড়া কিছু দিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিলো। রোকনের ধারণা পুরো কাজটাই ভিকটিমকে জীবন্ত অবস্থায় করা হয়েছে। উপরের অংশে প্রথম ভিকটিমের মত পাওয়া গিয়েছিলো। মাথা আলাদা, দাঁত তুলে নেওয়া, গাল কাটা। এমনকি কানটাও কেটে নেওয়া হয়েছে। প্রথম ভিকটিমের মত এরও মাথার চামড়া তুলে নেওয়া হয়েছিলো।

তৃতীয় ভিকটিম থেকে ষষ্ঠ ভিকটিম সবাই মিডিয়ার সাথে জড়িত ছিলো। তৃতীয় ভিকটিম ছিলো উঠতি মডেল। চতুর্থ ভিকটিম ছিলো নাটকের সাথে জড়িত। পঞ্চম ভিকটিম অবশ্য বাচ্চা। বারো বছরের শিশু শিল্পী। আর গতকাল খুন হওয়া ভিকটিম ছিলো বর্তমান মিডিয়ার টপ মডেল আর অভিনেত্রী। খুনের ধারা প্রতিটি প্রায় একই রকম তবে প্রতিটি খুনে নতুন নৃশংসতা যুক্ত হয়েছে। রোকনের কোন সন্দেহ নেই সব এক খুনি কাজ। আর খুনি অবশ্যই একজন। কারণ সাইকোপ্যাথ ঘরে ঘরে জন্মায় না। তবে খুনির মোটামুটি টাকাপয়সা আছে। কারণ ভিকটিমকে কিডনাপ করে নিয়ে আসা কম খরচের না। না হলেও নিজের গাড়ি থাকতে হবে। সুতরাং খুনি আর্থিকভাবে সচ্ছল। খুনি ফ্যান্টাসীতে ভুগছে। কারণ প্রথম খুনগুলো শুধু চুপচাপ কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া হত। আর এখন খুনি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। তৃতীয় খুন থেকে শেষ খুন অর্থাৎ ষষ্ঠ খুন পর্যন্ত সে তার খুনে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করেছে। ভিকটিমকে সপ্তাহখানেক আগে সাদা ইনভেলাপের মধ্যে লাল রংয়ের একটা কাগজ পাঠাতে শুরু করে। লাল কাগজটা পরীক্ষা করে দেখেছে রোকন। দেখে মনে হচ্ছিলো লাল রঙে ভিজিয়ে শুকানো হয়েছে সাদা কাগজকে। রোকনের কেন যেন মনে হচ্ছিলো এটা রক্তে ভেজানো। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে তার ধারণা সত্য। ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিলো। আর সেটার ফলাফলটা আরো ভয়াবহ ছিলো। পূর্ববর্তী ভিকটিমের রক্তে ভেজানো চিঠি ছিলো সেটা। ডিএনএ টেষ্ট একটা সুবিধা করে দিয়েছিলো। সুবিধাটি হচ্ছে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিলো যে সব খুন একজনই করছে।

কেসটা নিয়ে ভাবছে রোকন। কোন উল্লেখযোগ্য সূত্র এখনো তার চোখে পড়েনি। আচ্ছা কী কী জানি আমি খুনি সম্পর্কে? মোটামুটি বলা যায় কিছুই না। তবে কিছু সিদ্ধান্তে আসা যায়। যেমন খুনির বয়স পঁচিশের উপরে। কারণ এর নিচের বয়সী কেউ এতো সাহস নিয়ে একের পর এক খুন করতে পারবে না। খুনি একা একা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ কাউকে জানালে ধরা খাওয়ার সম্ভবনা আছে। তাছাড়া এত পাগলামি কোন সন্ত্রাসীও সাপোর্ট করবে না। খুনি আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে আছে আর অবশ্যই নিজস্ব গাড়ি রয়েছে। খুনি ফ্যান্টাসি প্রিয়। কারণ রেড লেটার তার ফ্যান্টাসি প্রকাশ করে। আর সাথে তার আত্মবিশ্বাসও প্রকাশ করে। সে ইচ্ছে করেই পুলিশকে ক্লু দিচ্ছে যে সব খুন একজন করেছে। সে নিজের উপর খুব বেশি আত্মবিশ্বাস না হলে এ কাজ করতো না। সাথে সাথে সে পুলিশ আর ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের উপর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। তবে খুনগুলোর পিছনে মোটিভ কী? ক্লিয়ার না রোকনের কাছে। স্রেফ পাগালামী পুরো ব্যাপারটি, এটা মানতে রোকন পুরোপুরি নারাজ। কোন কারণ অবশ্যই এর পিছনে রয়েছে। আর খুনগুলো অবশ্যই একটি অন্যটির সাথে সম্পর্ক যুক্ত। তবে এগুলোর মধ্যে রোকন তেমন কোন লিংক খুঁজে পাচ্ছে না। মিডিয়ার উপর রাগ? হতে পারে, সম্ভবনা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আচ্ছা খুনি কীভাবে ভিকটিম বাছাই করে? এটার উপর জোর দেওয়ার দরকার। যদি কোনভাবে লিংকটা বোঝা যায় তাহলে পরবর্তী টার্গেট বোঝা সহজ হবে। তবে এটা বোঝার একটা ভালো আইডিয়া রোকনের মাথায় এসেছে। তবে কাজে আসে কি না এটা নিয়ে রোকন কিছুটা সন্দেহ অনুভব করছে। তবে শুরু করে দেখা যেতে পারে। রোকন মোবাইল হাতে নিয়ে দ্রুত একটি সেভ করা নম্বরে কল করলো। তিনবার ডায়ালটোন শোনার পর মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো, স্লামালিকুম স্যার!

—সালামটা ঠিকমতো শিখলে না রাসেল। আচ্ছা তোমাকে যে জন্য ফোন করেছি। ঢাকার যত পত্রিকা আছে সবগুলোর গত ছয়মাসের পেপার সংগ্রহ করো। এরপর সেগুলো থেকে ভিকটিম ছয়জনের সম্পর্কে যত তথ্য আছে সেগুলো বাছাই করে সেসব পত্রিকা আমার কাছে নিয়ে আসো।

—কখন লাগবে স্যার?

—যত দ্রুত সম্ভব। কালকের মধ্যে না সম্ভব হলে পরশু।

—স্যার, আপনি কি আমাকে অপমান করছেন? আমাকে এ কাজের জন্য সরকার বেতন দিচ্ছে। আজকে রাত আটটার মধ্যে আপনার টেবিলে পেপার চলে যাবে।

—আচ্ছা তাহলে আমার বাসায় পেপার পাঠিয়ে দিও।

—জ্বি স্যার।

—আচ্ছা bye.

কল কেটে রোকনের মুখে হালকাভাবে একটা হাসির ভাব ফুটে উঠলো। রাসেল ছেলেটাকে তার সবসময়ই ভালো লাগে। কর্মঠ ছেলে। কোন কাজে এখন পর্যন্ত না বলেনি। উপরন্তু তার কাজের উপর অনাস্থা প্রকাশ করলে খুব রেগে যায়। এই যেমন এখন হয়েছে। কালকে দিতে পারবে কি না সন্দেহ প্রকাশ করায় রাসেল রেগে গিয়েছে। রোকন অবশ্য কাজটি ইচ্ছে করেই করেছে। রোকন ভালোভাবেই জানতো এভাবে কথা বললে রাসেল রেগে গিয়ে দ্রুত কাজ করে দিবে। বুদ্ধিটা অবশ্য কাজে দিয়েছে।

তিন

রুমে তিনটি জীবিত প্রাণীর শ্বাসপ্রশ্বাস শোনা যাচ্ছে। একজন চেয়ারে বাঁধা। আরেকজন বাঁধা অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে রয়েছে। চেয়ারে বাধা মেয়েটির নাম নাদিয়া। বয়সটা কমই বলা যায়, মাত্র চব্বিশ। অল্প কিছুদিন হয়েছে সে মিডিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছে। ফ্লোরে পরে থাকা মেয়েটির বয়স চার। নাদিয়ার মেয়ে। মেয়েটি না বলে বাচ্চা বলাটাই মানানসই। কিউট দুধের মত ফর্সা একটা বাচ্চা। ফ্লোরে পড়ে থাকার কারণে বাচ্চার গাল লাল হয়ে গিয়েছে। রুমের তৃতীয় লোকটি তার হাতের কুড়াল নিয়ে নাদিয়ার সামনে চলে আসলো। ফ্লোরে পড়ে থাকা বাচ্চার মত সে চেতনাহীন অবস্থায় রয়েছে। চেয়ারের সামনে রাখা এক বালতি পানি নাদিয়ার দিকে ছুড়ে মারলো লোকটি। দ্রুত উঠে বসার চেষ্টা করলো নাদিয়া। কিন্তু বাঁধা থাকার কারণে সেটা সম্ভব হয়ে উঠলো না। চিৎকার দিতে গিয়ে নাদিয়া বুঝতে পারলো তার মুখের ভিতরে কিছু একটি গুঁজে দেওয়া হয়েছে। যার কারণে কোন শব্দ বের করতে পারলো না সে। শুধু কয়েকবার গো গো আওয়াজ বের হলো। নাদিয়ার সামান্য সামনে তার মেয়েকে পড়ে থাকতে দেখলো। কী হচ্ছে এখানে দ্রুত ভেবে যাচ্ছে সে। কুড়াল হাতে লোকটি তার বাচ্চার পাশে এসে দাঁড়ালো। বাচ্চাটাকে তুলে আনার কোন ইচ্ছে তার ছিলো না। কিন্তু নাদিয়া কে যখন পিছনে থেকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে গাড়িতে তুলতে যাবে এমন সময় পিচ্চিটা কোথায় থেকে চলে আসে। হয়তো বাবার কাছ থেকে মায়ের কাছে এসেছিলো। নাদিয়ার স্বামী তখন দোকানে কী যেন কিনছিলো। বাচ্চা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেনি সে। একেও ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে গাড়িতে তুলে নেয়। তারপর এখানে নিয়ে এসেছে। বাচ্চাকে এভাবে তুলে নিয়ে আসার কোন প্ল্যান তার ছিলো না। কিন্তু বাচ্চা তার চেহারা দেখেছে। রিস্ক নেওয়া যায় না, যতই ছোট হোক না কেন। তবে সেটা নিয়ে এখন লোকটির কোন আপত্তি নেই। এ মুহূর্তে তার মাথায় সুন্দর একটা প্ল্যান এসেছে।

বাচ্চার পেট বরাবর লোকটি তার বুট পরা পা দিয়ে গায়ের জোরে লাথি মারলো। বাচ্চা মেয়েটি জ্ঞান কিছুক্ষণ আগে ফিরে এসেছিলো। লাথির প্রচণ্ড আঘাতে চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু তার টেপ প্যাঁচানো মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলো না। পা দিয়েই চার বছরের বাচ্চা মেয়েটির সোজা করলো লোকটি। হাতের কুড়ালটা ষাট ওয়াটের বাল্বের আলোতে চকচক করছে। কপালের একটু উপরে সেটা সে মাপমতো ধরলো। তারপর ধীরেসুস্থে ভারসাম্য রেখে লোকটি নিজের পিছনে কুড়ালটি নিয়ে আসলো। তার দিকে দুই জোড়া চোখ তাকিয়ে রয়েছে। নাদিয়া ও তার চার বছরের বাচ্চা মেয়েটি। নাদিয়া বিশ্বাস করতে পারছে না এটা সত্যিই হতে যাচ্ছে। সত্যিই সামনে দাঁড়ানো অপরিচিত লোকটি তার আদরের বাচ্চাটার মাথা বরাবর কোপ দিতে যাচ্ছে। খট করে শব্দ হলো। কুড়ালটি নামিয়ে এনেছে লোকটি। বাচ্চা মেয়েটির করোটি কেটে ফ্লোরে বাড়ি খেয়েছে কুড়ালটি। নাদিয়া চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল। যদিও হালকাভাবে গোঙানি ছাড়া অন্য কোন শব্দ শোনা গেল না। লোকটি সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ করলো না। কুড়াল আবার পিছনে নিয়ে আসলো। আগের বারেব মত গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে বাচ্চার কণ্ঠ বরাবর কোপ দিলো। কোপ দেওয়ার সাথে সাথে মাথাটা ছিটকে দূরে চলে গেল। লোকটি হাতের কুড়াল ফ্লোরে রেখে দিলো একপাশে রাখা একটা মাঝারি আকারের স্টিলের চেয়ার টেনে নাদিয়ার সামনে নিয়ে আসলো। টেবিলের উপর কয়েক ধরনের ছুরি, চাপাতি, কাচি, বড়সর কিছু লোহার পেরেক আর হাতুড়ি গুছিয়ে রাখলো। এরমধ্যে নাদিয়ার জ্ঞান ফিরে এসেছে। সে তাকিয়ে তার মাথাহীন বাচ্চার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।

নাদিয়ায় জ্ঞান ফিরে আসায় সবথেকে বেশি খুশি হয়েছে লোকটি। রুমের এক কোণায় পড়ে থাকা নাদিয়ার বাচ্চার মাথা সে তুলে নিলো। আর সেটা তুলে নিয়ে ঠিক নাদিয়ার সামনে রাখা স্টিলের টেবিলের উপর রাখলো। নিঃশব্দ অট্টহাসি হাসছে লোকটি। পরিস্থিতি খুব মজার লাগছে কিনা তার কাছে। বাচ্চার মুখটা ঘুরিয়ে নাদিয়ার দিকে ফিরিয়ে দিলো সে। মাথার করোটি কাটার কারণে মস্তিষ্ক বের হয়ে আছে। অবশ্য ফ্লোরে ছিটকে পড়ার কারণে কিছু অংশ নষ্ট হয়ে মস্তিষ্কের আসল আকার হারিয়ে ফেলছে। বাচ্চাটা চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে রয়েছে। মুখে টেপ পেঁচানোর কারণে নিচের অংশের কোন পরিবর্তন নেই। শুধু রক্তাক্ত কণ্ঠনালী বাদে।

—বাবু স্মাইল দেও তোমার আম্মুকে। ওহো তোমার মুখ তো বাধা। সরি ভুল হইছে আমার। কথা বলে এই প্রথম জোরেশোরে হাসতে শুরু করলো লোকটি। ভয়ানক এক হাসি। মাথাটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে তাক করলো লোকটি। বাচ্চার মাথা নিয়ে তার প্ল্যানটা বাস্তবায়ন করতে হবে। হাতে একটা স্ক্রু ড্রাইভার তুলে নিলো সে। খচ করে বাচ্চার ডান চোখে সেটা গেথে দিলো। হালকা মোচড় দিতেই চোখের অক্ষিগোলক সহ স্ক্র ড্রাইভার চলে আসলো। নাদিয়ার কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তার কান্নাও বহু আগে থেমে গিয়েছে। সে শুধু তাকিয়ে দেখছে। কারণ এছাড়া তার করার কিছু নেই। এই অল্প সময়ের মধ্যে সে এই নির্মম সত্য বুঝতে পেরেছে। স্ক্রু ড্রাইভারের মাথা দিয়ে চোখটা হাতে নিলো লোকটি। একবার নাদিয়ার দিকে তাকালো তারপর হাতের চোখের দিকে। গপ করে মুখে সেটা পুরে দিলো সে। কোন কথা না বলে পাঁচ মিনিট চাবিয়ে সে গিলে ফেললো চোখটি। আবার কথা বললো লোকটি, বাচ্চাটা দেখতে কত সুইট কিন্তু ওর চোখ এত বাজে স্বাদের কেন? কথাটা নাদিয়ার উদ্দেশে বলছিলো যদিও লোকটি। তবে কোন উত্তর আশা করেনি। কয়েকবার ভাবার পর সে সিদ্ধান্ত নিলো না অপর চোখ খাবে না। তবে হাতে সে একটা চামচ তুলে নিয়েছে এবার। মিডিয়াম সাইজের চা চামচ। চামচটা বাচ্চা মস্তিষ্কের মধ্যে ডুবিয়ে দিলো সে। চামচটা যখন তুললো তখন সেখানে মস্তিষ্ক উঠি এসেছিলো। কয়েক চামচ খাওয়া পর লোকটি বুঝতে পারলো এটাও মজার না। একটা পলিথিন আর মোটা কাগজের বক্স সে নিয়ে আসলো। টেবিলে রাখলো না সেগুলো। একটু দূরে ফ্লোরে রাখলো। কারণ সে কোনভাবেই চায় না রক্ত প্যাকেটে লেগে থাকুক। হাতে ছুরি নিয়ে বাচ্চার বাম গালে কাটাকাটি শুরু করলো সে। গভীর করে কাঁটতে শুরু করলো সে। হাতে দুইটা ছোট সাইজের মোটামুটি চিকন স্টিলের রড বাচ্চার ডান চোখের গর্তের মধ্যে গেঁথে দিলো।

—পারফেক্ট। উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল লোকটির কণ্ঠ থেকে। কিছুক্ষণের জন্য অন্যরুমে গিয়ে ক্যানভাস, কালার আর ছবি আঁকার অন্য সরঞ্জাম নিয়ে আসলো সে। প্রথমে ফ্লোরে একটা পেন্টাগ্রাম আঁকলো। তিনটা কালো রংয়ের মোম সেট করলো সেখানে। প্রতিটি মোম অন্যটা থেকে সমান দূরে অবস্থিত। পেন্টাগ্রামের ঠিক মাঝে নাদিয়ার বাচ্চার মাথাটা সে রাখলো। লোকটি ব্ল্যাক মাজিকে বিশ্বাস করে না। তবে এমন একটা মডেল সবসময়ই তৈরি করা যায় না। তাছাড়া তার ছবি আঁকার অভ্যাস আছে। তো সে কীভাবে এরকম দূর্লভ মডেলের ছবি না আর্ট করে পারে?

চার

রোকন নিজের সামনে রাখা পেপারগুলো পড়ে যাচ্ছে। ভিকটিম অর্থাৎ এ পর্যন্ত খুন হওয়া তথ্য সেখানে রয়েছে। যতটুকু আর কী মিডিয়াতে ফ্ল্যাশ হয়েছিলো। প্রথম রোকন পেপারগুলোকে আলাদা করতে শুরু করলো। আলাদা করার নিয়মটা সহজ। তাদের খুন হওয়া নিউজগুলো আলাদা করতে শুরু করলো। মিডিয়া আসলেই ভালো না। খুনের ভয়াবহ বর্ণনা কী সুন্দরভাবে রসিয়ে রসিয়ে বর্ণনা দিয়েছে। খুন হওয়া নিউজগুলোই ভরা। সেগুলো আলাদা করার পর বাকি পত্রিকার দিকে নজর দিলো। এগুলোও কম না। এগুলো মূলত ভিকটিম খুন হওয়ার আগে তাদের সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন সাক্ষাৎকার। এটা অবশ্য স্বাভাবিক। মিডিয়ার লোক, এদের সম্পর্কে নিউজ থাকাই স্বাভাবিক। এখন কাজের দ্বিতীয় স্টেপে যাওয়া যেতে পারে। পত্রিকার নাম অনুসারে আলাদা করতে হবে। নাম অনুসারে আলাদা করার পর কাজ অনেকটা সহজ হয়ে গেল রোকনের। মোট দুইটা পত্রিকায় সব কয়জন ভিকটিম সম্পর্কে লেখা রয়েছে। প্রথমটা হচ্ছে দৈনিক প্রথম আলো দ্বিতীয়টা দৈনিক কালের কণ্ঠ। তারিখ মিলাতে শুরু করলো রোকন। তার এখন কোন সন্দেহ নেই খুনি ভিকটিমের তথ্য পত্রিকা থেকে নিচ্ছে। তবে সে নিশ্চয়ই দুইটা পত্রিকা ব্যবহার করছে না। কারণ সাধারণত মানুষ দুইটা পত্রিকা কিনে না। সুতরাং এ দুইটা পত্রিকার মধ্যে সে যে কোন একটা ব্যবহার করছে। কিন্তু কোনটা? সমস্যা হচ্ছে দুইটা পত্রিকাতেই ভিকটিমের তথ্য তাদের কিডন্যাপ হওয়ার কিছুদিন আগে প্রকাশিত হয়েছিলো। সুতরাং বোঝা কঠিন আসলেই কোনটা ব্যবহার করা হয়েছে। পত্রিকা নড়াচড়া করতে করতে রোকনের ক্লিয়ার হয়ে গেল কোন পত্রিকা ব্যবহার করছে খুনি। নিশ্চিত কালের কণ্ঠ। কারণ প্রথম আলোতে পাঁচ নম্বর ভিকটিমের তথ্য যেদিন ছাপা হয়েছিলো সেদিনই ভিকটিম কিডন্যাপ হয়। খুনি নিশ্চয়ই পত্রিকা পড়ার সাথে সাথে কিডন্যাপ করেনি। কিছুদিন সময় নিয়েছে, প্ল্যান করেছে তারপর না হয় খুন করেছে। আর কালের কণ্ঠে ভিকটিমদের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার সাত আটদিন পর তারা খুন হয়েছে। সুতরাং খুনি কালের কণ্ঠ নিশ্চিত পড়ে। টেলিফোন নিজের কাছে টেনে নিলো রোকন। কয়েকটা বোতাম টিপ দিয়ে রাসেলের কাছে কল দিলো সে,

—হ্যালো রাসেল গত দশদিনে যে কয়জন নারী মডেলের ছবি কালের কণ্ঠে এসেছে সেগুলো আমি চাই। সাথে সাথে মডেলদের সম্পূর্ণ বায়োডাটা। বুঝছো?

—জ্বি স্যার।

—গুড। আর হ্যাঁ এখন থেকে যে কয়জন মডেলের ছবি ওই পত্রিকায় আসবে তাদের সম্পর্কে প্রতিদিন ভালোভাবে আমাকে ডাটা দিবে। কোন অলসতা যেন না করা হয়। বুঝছো?

—জ্বি স্যার। পত্রিকা আপনার কখন লাগবে? আর বায়োডাটা কখন দিবো?

—কালকে দুপুরের মধ্যে চাই।

—আচ্ছা স্যার। আর কিছু?

—আপাতত না। ওকে শুভ রাত্রি।

কথা শেষ করে টেলিফোনটা জায়গামতো রেখে দিলো রোকন। এই মাত্র লিংক পাওয়া গিয়েছে। আপাতত তারা পরবর্তী সম্ভাব্য ভিকটিমদের লিষ্ট করতে পারবে। যদি প্রতিজনের উপর নজরদারি করা হয় তাহলে হয়তো খুনিকে ধরা সম্ভব হতে পারে। তবে সেটা সম্ভব না এটা ভালোভাবেই জানে রোকন। কারণ এতজনের উপর নজরদারি করা সম্ভব না। তাছাড়া তারা যদি বুঝতে পারে তাদের উপর নজরদারি করা হচ্ছে তারা অবশ্যই আপত্তি জানাবে। এবং নজরদারি করার কারণ জানতে চাইবে। আর কোনভাবে যদি বুঝতে পারে তাদের উপর আক্রমণ হতে পারে তাহলে সেটা পাবলিক ফ্ল্যাশ হতে সময় লাগবে না। আর এসব তথ্য যদি পাবলিক জানে তাহলে সাথে সাথে খুনিও জানতে পারবে। সে সতর্ক হয়ে যাবে। এ ভুল কোনভাবেই করা যাবে না।

দুপুর দেড়টা। লাঞ্চ করার প্ল্যান ছিলো রোকনের। কিন্তু ভাগ্য তার বরাবরই খারাপ। কিছুক্ষণ আগের নিউজ শুনে খাওয়া বাদ দিয়ে নাদিয়া নামের একজন মডেলের বাসায় ছুটছে সে। ছোটার অবশ্য কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমত নাদিয়া আর তার বাচ্চা দুইদিন ধরে অদৃশ্য বা কিডন্যাপ হয়েছে বলা যায়। আজ সকালে নাকি নাদিয়ার বাসায় একটা বক্স কুরিয়ার করা হয়েছে। নাদিয়ার হাজব্যান্ড বক্স খোলার পর তার বাচ্চার কাটা মাথা পেয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে সকালে রাসেলের থেকে পাওয়া পেপারের নিউজে নাদিয়ার ছবি ছিলো। প্রায় নয়দিন আগে নাদিয়ার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো। সুতরাং খুনি যে একই এতে কোন সন্দেহ নেই রোকনের। নাদিয়ার বাসার সামনে আসতেই মানুষের ভিড় দেখলো রোকন। কোন সন্দেহ নেই তারা এরমধ্যে খবর পেয়েছে এখানে খুন হয়েছে। আর এসব খবর বাতাসের আগে ছড়ায়। তবে পুলিশের কারণে তারা ভিতরে যেতে পারছে না। উৎসুক জনতার মধ্যে দিয়ে নাদিয়ার বাসায় প্রবেশ করলো রোকন। পুলিশের কাছে পরিচয় দিয়ে লাশ দেখতে চাইলো সে। আর তেমন কোন কথা না বলে তার সামনে থাকা পুলিশকে অনুসরণ করলো রোকন। ডাইনিং টেবিলের উপর মোটা কাগজের বক্স দেখা যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না বাচ্চার মাথাটা সেখানেই রাখা হয়েছে। কাছাকাছি আসতেই রক্ত আর লাশের বাজে গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিলো। পুলিশের লোক আর কাছাকাছি আসলো না। হাতে গ্লাভস পরে নিয়ে প্যাকেটটার মুখ ভালোভাবে খুললো রোকন। বাচ্চার মাথাটা শুধু দেখা যাচ্ছে। খুব যত্নের সাথে সেখানে রাখা হয়েছে। যেন সামান্য এদিকে সেদিকে না নড়াচড়া করে সে বিষয়ে খুনি খুব সচেতন। হাত দিতে মাথার দুপাশে ধরলো রোকন। হালকা টান দিয়ে তোলার চেষ্টা করলো। উঠলো না। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না আরেকজনের সাহায্য দরকার মাথাটা বের করতে। রোকন পুলিশ কর্মকর্তার দিকে তাকালো। বুঝতে পারছে পুলিশের এ জিনিসটা ধরার কোন ইচ্ছে নেই। তবে ওই পুলিশ ছাড়া অন্য কেউ এ মুহূর্তে তাকে সাহায্য করতে পারবে না।

—আপানার কাছে গ্লাভস আছে?

—না স্যার।

—তাহলে এক কাজ করেন। ফ্লোরে রাখা আমার ব্যাগ থেকে একজোড়া গ্লাভস বের করে এই বক্সটা ধরেন।

—ইয়ে মানে...

—সময় নষ্ট করবেন না। কী ব্যাপার তাড়াতাড়ি।

ধমকের সুরে কথা বলার সাথে পুলিশ কর্মকর্তা যেন লাইনে চলে আসলো। দুইজনের চেষ্টায় কিছুক্ষণের মধ্যে রোকন বাচ্চার লাশের মাথাটা বক্স থেকে বের করে আনতে পারলো। বের করে টেবিলের উপর রাখলো। পুলিশের লোকটির বয়স কম। আর হয়তো বেশিদিন হয়নি পুলিশে জয়েন করেছে। তাই এ রকম রক্তারক্তি সে দেখেনি। আর চাকুরীর বয়স বেশিদিন হলেও তেমন কোন লাভ হতো না। কারণ এ রকম দৃশ্য দেখা যায় না। হড়হড় করে রুমের মধ্যেই বমি করে দিলো পুলিশের লোকটি। তবে সেদিকে রোকনের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। এক দৃষ্টিতে সে বাচ্চার মাথার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার নিজের পেটের মধ্যেও গুলিয়ে উঠছে। এ মুহূর্তে ইচ্ছে করছে বমি করতে। তবে সেটা রোকন অনেক কষ্টে দমন করে রেখেছে। লাশের মাথাটা কণ্ঠনালী থেকে আলাদা করা হয়েছে। মুখে টেপ পেঁচানো হয়েছে। একটা গালে গভীর করে কিছু কাটা দাগ। হাড় আর মাড়ি দেখা যাচ্ছে ওই অংশ দিয়ে। একটা চোখ তুলে নেওয়া হয়েছে আর সেখানে লোহা জাতীয় কিছু রড গেঁথে রাখা হয়েছে। মাথার উপরের অংশ কাটা। আর কাটা অংশ দিয়ে মস্তিষ্ক দেখা যাচ্ছে। পুরো মাথাটায় রক্তে চপচপ করছে। তবে রক্ত শুকিয়ে গিয়েছে বহু আগে। প্যাকেটের দিকে তাকালো রোকন। মাথাটা পলিমার জাতীয় কিছু দিয়ে ভালোভাবে পেঁচানো ছিলো। তাই প্যাকেটে কোন রক্তের দাগ নেই।

কুরিয়ার কোথায় থেকে করা হয়েছে জানতে হবে। কে বক্সটা পাঠিয়েছে জানা দরকার। যদিও খুনি সব তথ্য ভুয়া দিয়েছে আর সেটাই স্বাভাবিক। খুনি এত বোকা না যে নিজের নামে প্যাকেট কুরিয়ার করবে। সুতরাং সেখান থেকে আর কিছু আশা করা যায় না। লাশটা পোস্টমর্টেম করার জন্য বলে রুম থেকে বেরিয়ে আসলো রোকন। আচ্ছা আসলেই কি খুনিকে ধরা সম্ভব হবে? ভাবছে রোকন। ধরার মত তেমন কিছুই সে জানে না। সব খুনেই এক রকম। কোন ক্লু নেই। না প্রথম দুইটা খুন একটু ভিন্ন। কারণ ও দুইজন ভিকটিম সাধারণ মানুষ ছিলো। হতে পারে খুনির সাথে তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় ছিলো। সূক্ষ্ণ একটা সম্ভবনা থেকে যায় এখানে। প্রথম দুইজন ভিকটিম সম্পর্কে আরো জানার দরকার। মোবাইল হাতে নিয়ে রোকন দ্রুত কয়েকটা টিপে কোন একজনকে কল করলো।

পাঁচ

নাদিয়া চিন্তার বোধশক্তি বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে। তার জগৎ এখন এই ছোট রুম জুড়ে। রুমে কোন জানালা নেই। সিলিং থেকে একটা ষাট ওয়াটের লাইট প্রথম থেকেই ঝুলে রয়েছে। সেটা সারাক্ষণ হলদে এক আলো ছড়াচ্ছে দুই তিন দিন ধরে। রুমের আসবাবপত্র তেমন একটা নেই। তাকে যে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে সেটা আর অন্য একটা স্টিলের চেয়ার এবং একটা স্টিলের টেবিল। এই হচ্ছে রুমের আসবাবপত্র। যখন নাদিয়া কে ধরে আনা হয়েছিলো তখন সে আশা করেছিলো কেউ হয়তো আসবে। আর এসে তাকে এইখানে থেকে মুক্ত করবে। কিন্তু সে এখন ভালোভাবেই জানে এখানে থেকে তার কখনো বের হওয়া সম্ভব হবে না। অন্তত জীবিত না। হয়তো টুকরো টুকরো লাশ হয়ে বের হবে সে। কতক্ষণ এখানে বন্দী রয়েছে সে? ভাবছে নাদিয়া। দুই দিন নাকি তিনদিন? আচ্ছা এখন কি দিন না রাত? বোঝার কোন উপায় নেই। যতদূর বোঝা যাচ্ছে সে আন্ডারগ্রাউন্ডের কোন রুমে বন্দী রয়েছে। তার মুখ এখানের আসার পর থেকেই বাধা। এমনকি এই কয়েকদিন কোন খাবার তো দেয়নি তাকে। খুব সামান্য পানি পেয়েছিলো। চিৎকার করে সাহায্য চাওয়ার কোন সুযোগ নেই। নাদিয়া চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। রুমের দরজা খোলার আওয়াজ শুনলো নাদিয়া। মনে মনে সে আশা করছে কেউ হয়তো তাকে বাঁচাতে এসেছে। কিন্তু একই সাথে সে জানে আসলে তাকে কেউ বাঁচাতে আসেনি। অন্য কেউ না, তার বাচ্চার খুনি এসেছে। একবার মাথা তুলে তাকানোর কথা ভেবেও তাকালো না নাদিয়া। কী হবে তাকিয়ে?

জুতোর আওয়াজ তুলে রুমে প্রবেশ করলো লোকটি। লোকটি একহাতে একটি ব্যাগ আরেক হাতে একটি লম্বা বাটের কুড়াল নিয়ে রুমে প্রবেশ করেছে। স্টিলের টেবিলের কাছে গিয়ে তার উপর ব্যাগটা রাখলো। এরপর টেবিলটা টেনে নাদিয়ার কাছাকাছি নিয়ে আসলো। হাতের কুড়াল নিয়েই রুমে থাকা অন্য চেয়ারটা টেনে নিয়ে আসলো। এনে ঠিক নাদিয়ার সামনাসামনি রাখলো। অত্যাচার করার জন্য তো ঠিক সামনা সামনি বসতেই হবে তাই না? হাত খালি করার দরকার তাই কুড়ালটা চেয়ারের সাথে হেলান দিলো সে। টেবিলের উপরে রাখা ব্যাগটি খুলে আস্তে আস্তে ব্যাগের ভিতরে রাখা কয়েক ধরনের ছুরি, প্লায়ার আর হাতুড়িসহ অন্য জিনিসগুলো টেবিলের উপর যত্নের সাথে সাজিয়ে রাখতে শুরু করলো সে। ড্রিলমেশিনের তারটি কারেন্টের লাইনের সাথে সংযুক্ত করে নাদিয়ার হাতের তালুতে চেপে ধরলো লোকটি। নাদিয়া নিজের হাত নাড়াচাড়া করার কোন চেষ্টা করছে না। এতে লোকটি খুব বিরক্ত বোধ করছে। ভিকটিম ভয় না পেলে খুন করে মজা পাওয়া যায় নাকি? ড্রিলমেশিনের পাওয়ার সুইচ চেপে ধরলো লোকটি। কয়েক মুহূর্তের বিরতিতে হাতে একাধিক ছিদ্র হয়ে গেল। নাদিয়ার ডান হাতের তালু ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছে। লোকটি একবার তাকালো নাদিয়ার দিকে। নাদিয়ার চোখে কোন ভয় নেই। নির্লিপ্ত চোখে শূন্য দৃষ্টিতে সোজা তাকিয়ে রয়েছে। শুধু চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়ছে। লোকটির রোখ চেপে গেল। বড় সাইজের একটা স্ক্রু ড্রাইভার হাতে নিয়ে নাদিয়ার বাম হাতের তালুর উপর ধরলো। হাতুড়ি দিয়ে কয়েকবার আঘাত করার পর সেটা নাদিয়ার বাম হাতের অপর প্রান্ত দিয়ে বের হয়ে আসলো। টানাটানি করে সেটা বের করে নিলো লোকটি। আবার গেঁথে দিলো একইভাবে। কোন প্রতিক্রিয়া নেই নাদিয়ার। এবার লোকটি এতটাই রেগে গেল যে নাদিয়াকে এখনই মার্ডার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। চেয়ারের পাশে হেলান দিয়ে রাখা কুড়ালটি তুলে নিলো সে। হাতে নিয়েই গায়ের জোরে কোপ দিতে শুরু করলো। প্রথম কোপটা পরলো নাদিয়ার কাঁধের উপর। দ্বিতীয় কোপটা প্রথম কোপের একটু পাশে পড়ল। লোকটি একের পর এক কোপ দিয়ে যাচ্ছে নাদিয়ার শরীরের বিভিন্ন অংশের উপর। নাদিয়া অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। গোঁ গোঁ এক অমানুষিক আওয়াজ করছে সে। লোকটি তাতে আরো উৎসাহিত হচ্ছে সম্ভবত। সে থামলো না। কোপ দিয়ে যেতে থাকলো। এক পর্যায়ে একটা কোপ নাদিয়ার হৃদপিণ্ড বরাবর পড়ল। শেষ একটা খিচুনি দিয়ে নাদিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। তবে লোকটি থামেনি। নাদিয়ার লাশের উপর পনের মিনিটের মত এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকলো। নাদিয়ার শরীর অসংখ্য টুকরো হওয়ার পর থামলো সে।

নিজেকে সুস্থির করতে কিছুক্ষণ লাগলো লোকটির। সমস্ত শরীর ঘেমে একাকার। তার মেজাজ এ মুহূর্তে মারাত্মক খারাপ। পুরো মজাটাই নষ্ট হয়েছে। তার কত প্ল্যান ছিলো এই খুনটা নিয়ে। সব ভেস্তে গিয়েছে। আচ্ছা যাই হোক সমস্যা নেই। পরবর্তী টার্গেটের উপর প্ল্যানগুলো বাস্তবায়ন করবে। আপাতত লাশটাকে একটা কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে এখন এটার উপর আরেকটু কাটাকুটি চালাতে হবে। যেটা বিরক্তিকর। কারণ জীবিতদের যন্ত্রণা দিয়ে মজা আছে। মৃতদের যন্ত্রণা দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। সুতরাং উপভোগ করারও কোন ব্যাপার নেই। ধুর! শুধু একটা শব্দই লোকটির মুখ থেকে বেরিয়ে আসলো।

ছয়

রাসেলের মনটা হালকা খারাপ। না হালকা নয় বলা যায় বেশ খারাপ। আর খারাপ থাকার কারণ আছে। যদিও সেটা খুব গুরুতর কিছু না। মূল ব্যাপার হচ্ছে সে তার চাকুরী নিয়ে অসন্তুষ্ট। এভাবে কি জীবন চালানো যায়? সারাক্ষণ কাজ আর কাজ। বস বলে এই কাজটা করো সেই কাজটা করে দেও। কার ভালো লাগে এত কাজ? তার উপর এত রক্তারক্তি দেখলে কোন সুস্থ মানুষ ঠিক থাকতে পারে! প্রতিটা খুনের লাশ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি তারই করতে হয়েছিলো। আর জোবায়ের স্যার তাকে পেয়েছে কী? সব জায়গায় তাকে পাঠানো লাগে? এই যে দুইদিন আগে বাচ্চার মাথা নিয়ে কত ঝামেলা তার পোহাতে হয়েছে। এইখানে যাও ওইখানে যাও। তার উপর ওইরকম রক্তাক্ত মাথা দেখলে মানুষের মাথা ঠিক থাকে? অন্যান্য মানুষ হলে তো মাসখানেক ঘুমাতে পারতো না। কথাগুলো ভাবছিলো রাসেল। তবে তার ঘুম ভালোই হয়েছে। আর এ জন্য নিজে কিছুটা লজ্জাবোধ করছে। কিছুক্ষণের জন্য সে ফ্রী আছে। তাই আপাতত একটু ঘোরাঘুরি করছে সে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে জনমানুষের ভিড়ে নিজেকে আবিষ্কার করলো রাসেল। কয়েক মিনিট তার বুঝতে লাগলো এখানে এত মানুষজন কী করছে। কিছুটা সামনে ছবির প্রদর্শনী হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেখানে যাচ্ছে। তাই এত ভিড় এখানে। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ছবি দেখতে সেখানে প্রবেশ করলো রাসেল। হাতে আঁকা ছবির প্রদর্শনী। একসময় এসবের প্রতি তার খুব আগ্রহ ছিলো। তাই আজকে সুযোগ পেয়ে ঘুরাঘুরির সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইছে না সে। ছবিগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলো রাসেল এমন সময় একটা ছবি তার দৃষ্টি কেড়ে নিলো। খুব পরিচিত মনে হচ্ছে ছবিটাকে। একটা ব্লাক ম্যাজিকের ছবি। একটা পেন্টাগ্রামে তিনটা মোমে জ্বালানো আর তার মাঝখানে একটা মানুষের বাচ্চার মাথা। মাথাটার এক চোখ তুলে নেওয়া হয়েছে। সেখানে গেঁথে রয়েছে রক্তাক্ত কিছু একটা। যেগুলো অনেকটা রডের মত দেখতে। এটা আসলে কীসের ছবি এটা বোঝার সাথে সাথে কয়েক মুহূর্তে জন্য রাসেলের শরীর জমে গিয়েছে। তার কোন সন্দেহ নেই এটা স্বপ্ন না। পুরোপুরি বাস্তব।

মানুষের ধাক্কা লাগাতে রাসেলের ধ্যান ভাঙলো। ছবিটার সামনে বহু মানুষের ভিড়। ছবিটি যেন জীবন্ত আর সেটাই মানুষ পছন্দ করেছে। নিজের কাজ ঠিক করে নিতে দেরি হল না রাসেলের। ছবির নিচে থাকা ছবির আর্টিস্টের নাম দেখে নিলো সে। জাকারিয়া তপন নামের একজন আর্টিস্টের আঁকা এটা। দ্রুত হেঁটে আয়োজক কমিটির লোকেদের খুঁজে নিলো সে। তাদের থেকে ইনচার্জকে এটা খুঁজে নিলে কথা বলতে শুরু করলো। যাকে রাসেল কথা বলার জন্য পেয়েছে সে এই আয়োজনের ম্যানেজার। নাম ইসতিয়াক হাসান।

—আপনাদের ৩২ নং ছবিটা দেখলাম।

—কোনটা?

—ওই যে ব্লাক আর্ট নামে যে ছবিটা আছে।

—ও আচ্ছা আচ্ছা। তো আপনি কি ওটা কিনতে চাচ্ছেন? তাহলে আমার কাছে আসার প্রয়োজন ছিলো না। এ কাজের জন্য অন্য লোক আছে।

—কেনার ইচ্ছে আছে তবে এখনই না। আচ্ছা জাকারিয়া তপনের এটা কত নম্বর ছবি? মানে আপনাদের থেকে কত নম্বর ছবি এটা প্রদর্শনীর জন্য এসেছে?

—আসলে তো উনি তো বহু পুরানো আর্টিস্ট। ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে আমাদের কাছে থেকে গত দুই বছরে নিম্নে পঁচিশটার মত ছবি বিক্রি হয়েছে। তার ছবির বাজারদরও বেশ ভালো বলা যায়। তাই এত সেল হয়েছে।

—আচ্ছা যেগুলো বিক্রি হয়েছে আমি সেগুলোর ছবি আমি দেখতে চাচ্ছি।

—আসলে হয়েছে কি আমরা তো ছবির কোন কপি রাখি না। আর তার ছবি খুব দ্রুত সেল হয়ে যায়। এই দেখেন আধা ঘন্টা আগে ছবিটা আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন তিনি। এর মধ্যেই আপনি চলে এসেছেন। আপনি যদি না ডিল করেন তাহলে হয়তো তিন চার ঘন্টা মধ্যে সেল হয়ে যাবে। আর আপনি যদি আগের ছবিগুলো দেখতে ইচ্ছুক হয়ে থাকেন তাহলে কাষ্টমারের সাথে যোগাযোগ করা ছাড়া সেগুলো দেখা সম্ভব না।

—আমাকে কাষ্টমারদের বাসার ঠিকানা দিন তো। সাথে জাকারিয়া তপনের বাসার ঠিকানা।

—দুঃখিত কোনটাই আপনাকে দিতে পারবো না। আমাদের রুলসে এটা নেই।

রাসেল বুঝতে পারছে এখানে পরিচয় দেওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। পকেট থেকে তার ডিবির কার্ড বের করে ম্যানেজারের সামনে ধরলো। আইডি কার্ড দেখার সাথে সাথে ম্যানেজার ইসতিয়াক হাসানের চোখে ভয়ের প্রকাশ বোঝা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চকে জমের মত ভয় পায়। নাম শুনলেই তাদের মনে হয় যে অযথাই কোন কেসে তাদের ফাঁসিয়ে দিয়ে টাকা খাবে। কাজ যাতে আরো সহজ হয় তাই খুনের কথাটা তুললো রাসেল।

—বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা ছেলেখেলা না। এর সাথে একাধিক মার্ডার কেস সংযুক্ত। সুতরাং দ্রুত আমি যা চেয়েছি তাই দিয়ে দিন। আধা ঘন্টার মধ্যে। নাহলে আপনাকে এই অসহযোগিতার জন্য বহুত ঝামেলা পোহাতে হবে।

—এত কাষ্টমারের তথ্য থেকে তাদের তথ্য আলাদা করতে অন্তত দুইদিন লাগবে। কীভাবে সম্ভব আপানাকে এ মুহূর্তে আধা ঘন্টার মধ্যে দেওয়া?

—আচ্ছা আপনার একদিন সময় দেওয়া হল। আপাতত আর্টিস্টের ঠিকানা দিন। নাকি এটা করতেও দুইদিন লাগবে?

—পাঁচ দশ মিনিট অপেক্ষা করেন। ব্যবস্থা করছি। শুকনো মুখে কথাটা বললো ম্যানেজার ইসতিয়াক হাসান।

—গুড। আর এ ছবিটা যেন বিক্রি না হয়। এটা আমাদের লাগবে। আপনি বাসায় কল দিলে বলে দিন আগামী বারো ঘন্টা আপনি আমাদের সাথে থাকবেন। আমি চাই না জাকারিয়া তপন কোনভাবে সতর্ক হবার সুযোগ পেয়ে যাক।

রোকন কিছুক্ষণ ধরে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে ভেবে দেখছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে কয়েক ঘন্টা আগে রাসেল মেইল করা ছবিটা একাধিকবার দেখছে সে। রাসেলের মতই রোকনের কোন সন্দেহ নেই বাচ্চার মাথাটি ছবি আঁকার মডেল হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যতবার ছবি দেখছে ততটাই সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত হচ্ছে। তবে রোকনের খটকা লাগছে বারবার। কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা মিস। তবে মিস হওয়ার মত কোনকিছু খুঁজে পাচ্ছে না সে। রাত এগারোটা বাজছে প্রায়। হাতে কিছু কাগজপত্র তুলে নিলো সে। আপাতত একটা মাইক্রোর মধ্যে বসে রয়েছে রোকন। মাইক্রোর মধ্যে তার সাথে শুধু ড্রাইভার রয়েছে। তাদের গাড়ির সামনে অবশ্য পুলিশের গাড়ি আছে আর পিছনে আরেকটা মাইক্রোতে কয়েকজন ডিবির কর্মকর্তা রয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য আর্টিস্ট জাকারিয়া তপনের বাসা। এরেস্ট ওয়ারেন্ট আর সার্চ ওয়ারেন্ট দুটোই নেওয়া হয়েছে। সুতরাং জাকারিয়াকে গ্রেফতার করতে কোন বাধা নেই। হাতের কাগজগুলোর দিকে মনযোগ দিলো রোকন। জাকারিয়া তপন সম্পর্কে লেখা রয়েছে সেখানে। জাকারিয়া তপন মোটামুটি নামকরা একজন আর্টিস্ট। তার ছবিগুলো দামও অনেক বেশি। আর চাহিদা? তার ছবি কালেকশন করাই কঠিন। তার বয়স ত্রিশ। মোটামুটি আট বছর ধরে ছবি আঁকার সাথে সম্পর্কযুক্ত। পরিবার বলতে বৃদ্ধ বাবা মা। অবশ্য তার পিতামাতা তার সাথে থাকে না। গ্রামে থাকে। এখন পর্যন্ত তিনি অবিবাহিত। বেশিরভাগ সময়ে তিনি তার নিকুঞ্জের বাড়িতে সময় কাটান। পেশাগতভাবে ছবি আঁকা শুরু করার আগে তিনি একটা ভার্সিটির লেকচারার ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে ছবি আঁকাটাকেই তিনি পেশা হিসাবে নেন। তার বন্ধুবান্ধব খুব কম। হাতে গোনা দুই তিনজন হবে। তার কোন গার্লফ্রেন্ড আছে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। পুরোপুরি সিঙ্গেল একটা মানুষ তিনি। তবে তার এক দূর সম্পর্কের চাচা রেল প্রতিমন্ত্রী। যথেষ্ঠ ক্ষমতাবান লোক সে।

এগুলোই মোটামুটি কাগজগুলোতে লেখা রয়েছে। তবে সবথেকে ইন্টারেস্টিং কথা হচ্ছে প্রথম ভিকটিম লিসা জাকারিয়া তপনের দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিলো। তাদের মধ্যে এক দুইবার দেখা হয়েছিলো। যদিও শেষবার লিসা মার্ডার হওয়ার প্রায় একবছর আগে। সুতরাং তপন যে খুনি এটার সম্ভাবনা অনেক। কতটুকু প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবে এটা নিয়ে রোকন অবশ্য কিছুটা সন্দিহান। তবে খুব বেশি না হলেও সমস্যা নেই। কারণ রিমান্ডে নিয়ে ভালোমতো যত্ন করলে তপন সব স্বীকার করবে এটা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। গাড়ি থামার সাথে সাথে রোকনের চিন্তার সুতা ছিন্ন হয়ে গেল। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো তারা। তার কিছু বলতে হচ্ছে না কাউকে। কার কী কাজ এটা তারা ভালোভাবে জানে। জাকারিয়া তপনের বাড়ির গেটের কাছে এগিয়ে যেতে লাগলো রোকন। অবশ্য পুলিশ আরো আগেই গেটের দারোয়ানের সাথে কথা বলে ভিতরে প্রবেশ করেছে। তাই তাদের কোন কথা বলতে হলো না। দ্রুত বাড়ির মধ্যে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের মানুষজন প্রবেশ করলো। তারা সবাই তপনের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করলো। পুলিশ আগেই প্রবেশ করেছে তাই দরজা খোলার ঝামেলায় যেতে হয়নি তাদের। চার পাঁচজন সশস্ত্র পুলিশ জাকারিয়া তপনের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে বোঝার চেষ্টা করছে কী হচ্ছে এখানে! তার চোখে একরাশ বিস্ময় দেখা যাচ্ছে। তবে বিস্ময়টা এতটাই বেশি সেটা দেখে রোকন নিজেও কিছুটা অবাক হয়ে যাচ্ছে। এতটা অবাক হওয়া মানায় না তপনকে, ভাবছিলো রোকন। এতগুলো খুন করেছে তপন আর কোনদিন ধরা পড়বে না, এটা আশা করা উচিত হয়নি। অপরাধ করলে একদিন ঠিকেই ধরা পড়তে হবে। সেটা আজ হোক আর কাল হোক। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চকে পুরো বাড়ি সার্চ করার নির্দেশ দিলো রোকন। ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের এই লোকগুলো সার্চ করার জন্য স্পেশাল ট্রেনিং প্রাপ্ত। সুতরাং এ বাড়িতে খুনের একটি আলামতও কোনভাবেই তাদের চোখ এড়িয়ে যাবে না। এটা সম্ভব না। জাকারিয়া তপনকে গ্রেফতার করতে বলে সোফাতে বসলো রোকন।

সাত

আয়নায় নিজের মুখটা এদিক ওদিক করে ঘুরিয়ে দেখছে তপন। গালভরা দাড়ি তার চেহারা পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে কয়েক বছর সে দাড়ি কাটেনি। দাড়িগুলো কাটতে হবে কথাটা আস্তে আস্তে নিজের উদ্দেশে বললো তপন। অবশ্য না কাটলেও কিছু আসে যায় না। কারো কাছে নিজেকে সুন্দর পরিপাটি করে উপস্থাপন করতে হবে এমন কোন ব্যাপার নেই। সুতরাং না শেভ হলেও চলবে। কথাটা ভাবতে ভাবতে হাতের লবণাক্ত গরম পানিতে চুমুক দিলো তপন। গরগর আওয়াজ তুলে কুলি করে সেটা বেসিনে ফেললো। দুইদিন ধরে টনসিলের মারাত্মক যন্ত্রণায় ভুগছে সে। খাওয়া দাওয়া তো প্রায় বন্ধের পর্যায়ে। তাছাড়া এমন কেউ নেই যে তাকে জোর করে খাওয়াবে। বাবা মা কাছে থাকলে ভালো হত একবার ভাবলো তপন। পরক্ষণেই না করে দিলো চিন্তাটাকে। এখানে তাদের ঠিকমতো যত্ন করা হবে না। গ্রামে আছে অনেক ভালো আছে তারা। হাতের গ্লাসটা জায়গামতো রেখে নিজের রুমে যাচ্ছে এমন সময় দরজায় আঘাতের শব্দ শুনলো তপন। মেজাজটা সাথে সাথে খারাপ হয়ে গেল তার। এখন রাত কত বাজে এটা কি মানুষের হুঁশ নেই? তাছাড়া দারোয়ান কেন তাকে না বলে বাড়িতে মানুষ ঢুকালো? দরজায় যে আঘাত করছে সে যে দারোয়ান না এটা তপন শিওর। কারণ দারোয়ান কখনো দরজায় আঘাত করবে না। কলিং বেল টিপ দিবে অথবা ইন্টারকমে কথা বলবে। কোন গাধাটা এভাবে দরজায় আঘাত করছে? ভাবতে ভাবতে দরজাটা খুলে অবাক না হয়ে পারলো না তপন। বেশ কয়েকজন পুলিশ দরজায় সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

—তপন সাহেব আমরা কি ভিতরে আসতে পারি? আর ধীরেসুস্থে পিছিয়ে যেতে থাকেন। দৌড় দেওয়ার চিন্তাটাও বাদ দিন। গুলি খাবেন তাহলে। যদিও দৌড়ে যাবেন আর কই!

—আমার কাছে কী দরকার আপনাদের। আর এভাবে কথা বলার সাহস কীভাবে পাচ্ছেন? আপনি জানেন আমি আপনার কী করতে পারি? ঝাঁঝালো কণ্ঠে জবাব দিলো তপন। তার বাড়িতে পুলিশ এসে এসব কথা বলে! সাহস তো কম না।

—এত বেশি কথা বলেন কেন? কথাটা বলার সাথে সাথে সঙ্গী পুলিশদের ইশারা দিলো ওসি ফয়সাল। সেন্ট্রি দুইজন তপনের দু হাত ধরে তার ফ্ল্যাটের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল। তপন বুঝতে পারছে না তার রেগে যাওয়া উচিত নাকি ভয় পাওয়া উচিত। পুলিশের ভাবভঙ্গি সুবিধার মনে হচ্ছে না। এরা অবশ্যই জানে তাদের বিপদে ফেলানোর মত তার যথেষ্ঠ ক্ষমতা আছে। তবে পুলিশের ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে তারা কেয়ার করে না। এতটা সাহস পুলিশের কখনোই ছিলো না। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে খুব বড় ধরনের ঝামেলা হতে যাচ্ছে। তার সামনে হয়তো বড়সড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কয়েক মিনিট পর তপন তার ফ্ল্যাটে আরো সাত আটজন মানুষ প্রবেশ করতে দেখলো। নরমাল সিভিল ড্রেসে কিছু মানুষ। এরা হয় সাদা পোশাকের পুলিশ অথবা ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের লোক। তবে তপনের মনে হচ্ছে এরা ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চেরই হবে। কারণ এখানে সাদা পোশাকের পুলিশ আসার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের লোক তার বাসায় কেন আসবে? সে কী অপরাধ করছে? দ্রুত মনে করার চেষ্টা করলো তপন। আপাতত তার নিজের একটা অপরাধের কথা মনে পড়ছে শুধু , ক্লাস ফাইভে থাকতে তার এক ক্লাসমেটকে ইট দিয়ে আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলো। প্রায় অর্ধমাস ওই ছেলে হাসপাতালে ছিলো এই কারণে। তারা নিশ্চয়ই ওই আঘাত করার জন্য তাকে ধরতে আসেনি। এলোমেলোভাবে চিন্তা করে যাচ্ছিলো তপন। গম্ভীর চেহারার একজন লোক তার সামনে এসে দাঁড়ালো। শুধু একবার লোকটা ইশারা দিয়ে বললো বাড়ি সার্চ করতে। সাথে সাথেই তারা তাদের কাজ শুরু করে দিলো। তপন লোকটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। অপেক্ষা করছে কখন তাকে কিছু বলবে। কিন্তু তাকে হতাশ হতে হলো। লোকটা যেন তার ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। শুধু একবার বললো তপনকে থানায় নিয়ে যেতে। হাতকড়া পরিয়ে তাকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে এমন সময় ফুঁসে উঠলো তপন।

—আপনরা পেয়েছেন কী? রাত দুপুরে আমার বাসায় এসে আমাকে কোন কারণ ছাড়া গ্রেফতার করছেন আর আমার বাসা সার্চ করার নামে তছনছ করছেন। আপনি জানেন আমি আপনার কী করতে পারি?

—আপনি কী করতে পারবেন আমাদের এটা না বলে আগে ভাবুন আপনার কী হবে? টোটাল সাতটা মার্ডারের, না না আটটা মার্ডারের আসামী আপনি। তাই না? নাদিয়াকে এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন এটা আমি আশা করি না অবশ্য। তাই আটটা মার্ডার হিসাব করাই বেটার।

তপন অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। আটটা মার্ডার! কী বলতাছে এসব! তারা কি পাগল হয়ে গেল নাকি? কয়েক মুহূর্ত কোন কথা বের হলো না তপনের মুখ থেকে। হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে তপন। কিছুক্ষণ আগে কথা বলা লোকটির ওয়্যারলেস খরখর করে উঠলো। হাতে সেটা ঠিকমতো তুলে নিয়ে অপর প্রান্তে সাড়া দিলো লোকটা। সাথে সাথে ওয়্যারলেসে কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

—স্যার নাদিয়ার ডেডবডি পাওয়া গিয়েছে।

—কনগ্রাটস। সার্চ চালাতে থাকো। দেখো আর কী পাওয়া যায়।

তপন এই প্রথম ভয় পেতে শুরু করলো। লাশ পাওয়া গিয়েছে মানে কী? তার বাড়িতে মানুষের লাশ কোথায় থেকে আসবে! এটা অসম্ভব। সে নিশ্চয় কোন দুঃস্বপ্ন দেখছে। কিছুক্ষণ পর ঘুম থেকে উঠে দেখবে সবকিছু স্বাভাবিক। সে তার বেডে শুয়ে আছে। তবে সাথে সাথে টনসিলের ব্যাথা তপনকে জানান দিচ্ছে পুরো ঘটনাটাই বাস্তব। স্বপ্ন হওয়ার কোন সম্ভবনাই নেই। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে শক্তি সঞ্চয় করে তপন কথা বললো,

—আমি কোন খুন করিনি। আমি জানি না ডেডবডি আমার বাড়িতে কীভাবে আসলো।

—সেটা পরেই প্রমাণ হবে জাকারিয়া তপন। ওসি ফয়সাল ওকে নিয়ে যাও। প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এখন বুঝবে কত ধানে কত চাল।

—ইয়েস স্যার। বলেই তপনকে পুলিশের দুজনের লোকের সাথে পাঠিয়ে দিলো ওসি ফয়সাল।

তপনের প্রচন্ড ভয় লাগছে। বোঝার চেষ্টা করছে কী হচ্ছে তার সাথে। এখন একটা শক্ত চেয়ারে সে বসে রয়েছে। সামনে বড়সড় একটা টেবিল। আর টেবিলের অপর প্রান্তে দুজন লোক বসে রয়েছে। তার তাদের চেহারা দেখেই তলপেটে একটা চাপ অনুভব করছে তপন। কথা বলবে কি না ভাবছে সে। তবে সাহস পাচ্ছে না। কোন অদ্ভুত কারণে গ্রেফতার হওয়ার পর তার সাহস একবারেই হাওয়া হয়ে গিয়েছে। কিন্তু লোক দুটো কিছু বলছে না। একজন চুপচাপ তার মোবাইল টিপছে আরেকজন একটা কাগজের ইনভেলাপ থেকে কিছু একটা বের করে দেখছে। থমথমে পরিবেশ রুমে। মাথাটা ঘুরিয়ে রুমটা দেখছে তপন। যদিও শতাধিকবার সে রুমটা দেখেছে এই সময়ের মধ্যে। রুমটা সাধারণত একটা সাদামাটা রুম হয়েও হতে পারেনি ঠিকভাবে। রুমে কোন জানালা নেই। শুধু যাতায়াত করার জন্য একটা দরজা। আসবাবপত্র বলতে কয়েকটা চেয়ার আর টেবিল। আর সিলিং-এ ঘরঘর আওয়াজ তোলা একটি ফ্যান ও টিউব লাইট। কয়েক ঘন্টা ধরে এখানে সে বসে রয়েছে হিসাব করার চেষ্টা করছে তপন। এখন দিন নাকি রাত সেটাও বোঝার কোন উপায় নেই। গ্রেফতার হওয়ার পর তপন তার চাচা রেলমন্ত্রীর কাছে ফোন করেছিলো। সে বললো তাকে ছুটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে। কিন্তু কিছুই তো হচ্ছে না। না হলেও ছয় ঘন্টা সে এখানে রয়েছে। এত সময় লাগছে কেন! তাকে ছুটিয়ে নিতে পারবে তো? পারার তো কথা। শত হলেও একজন মন্ত্রী। কম ক্ষমতা তো তার নেই। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল তপন। মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে কণ্ঠের অধিকারীর দিকে তাকালো তপন।

—হ্যালো তপন সাহেব কেমন আছেন?

—একটা নিরপরাধ লোককে এভাবে বন্দী করে রেখে তাকে একথা বলার কোন মানে নেই।

—বাহ্ এ অবস্থায়ও আপনার কথার জোর কমেনি। অবশ্য আমি এটাই আশা করছি। নাহলে আপনার সাথে কথা বলে মজা পাওয়া যাবে না। ও আমাদের পরিচয় দেওয়া হয়নি। আমি জোবায়ের আহামেদ রোকন। ইন চার্জ অফ স্পেশাল ফোর্স অফ ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ। আপনার এই কেসে আমি প্রায় পাঁচ মাস ধরে নিযুক্ত আছি।

তপন অবাক হয়ে রোকন নামের লোকটিকে দেখছে। তার এভাবে কথা বলার জন্য হিসাবে এদের রাগ করার কথা। তা না হয়ে উল্টো মজা পাচ্ছে তারা। তপনের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না এই লোকগুলো অত্যন্ত বিপদজনক। তবে তার পিছনে কেন এরা লাগলো? তপনের মনে পড়ে না ব্যক্তি জীবনে সে কারো ক্ষতি করেছে। তো তার উপর এমন বিপদ মেনে নেওয়া যায় না।

—রেল মন্ত্রী আপানাদের সাথে যোগাযোগ করেনি? তপন কথাটা বললো।

—আপনার চাচার কথা বলছেন?

—হ্যাঁ। রেল মন্ত্রী তো একজনই। কথা ঘুরাচ্ছেন কেন?

—চার পাঁচ ঘন্টা আগে করেছিলো। কিছু না জেনেই ছেড়ে দিতে বলেছিলো। আর বললেই আমি আপনাকে ছেড়ে দেবো এটা মনে করার কোন মানে নেই। প্রমাণসহ গ্রেফতার করেছি আপানাকে। সো স্বয়ং প্রেসিডেন্ট কল করে বললেও আমি ছাড়ছি না। সোজা বলে দিছি তাকে আপনি আট খুনের আসামী। আর যেভাবে খুনগুলো করেছেন আপনি তো তাতে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। তাই সব শুনে আপনার চাচা পিছিয়ে গিয়েছে। তার জনপ্রিয়তা ঠিক রাখতে তো হবে। আপনার মত সাইকোপ্যাথকে সাপোর্ট দিলে তো তার নির্বাচনে ভরাডুবি হবে। তাছাড়া...

—তাছাড়া কী? পুরো ব্যাপার হজম করার চেষ্টা করছে তপন।

—আপনার ব্যাপারটা মিডিয়া ফ্ল্যাশ হয়ে গেল কি না। সব চ্যানেলে এখন আপনার খবর। সুতরাং আপনাকে সাহায্য করা বুদ্ধিমানের কাজ না। আপনার সাহায্যের জন্য কেউ নেই।

তপনের মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। মিডিয়ায় অলরেডী ফাঁস হয়েছে। অর্থাৎ এখন তাকে সাহায্য করার জন্য কেউ নেই। আর এদের ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে তার স্বীকার করা, না করাতে কিছু আসে যায় না। তারা এ খুনগুলোর জন্য তাকে দ্বায়ী করে ফাঁসি দিবে। তবে তপন এখনো একটা বিষয় ভেবে মিলাতে পারছে না। তার বাড়িতে কীভাবে একটা লাশ আসলো! এমন না তার বাড়িতে কেউ প্রবেশ করে লাশ রেখে যাবে। বাড়িতে দারোয়ান আছে। এখন একটা সম্ভাবনা থাকে তার পরিচিত কেউ লাশ রেখে গিয়েছে। কিন্তু তার পরিচিত কেউ তার বাড়িতে লাশ রেখে যাবে এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব। হাতে গোনা কয়েকজন তার বাড়িতে আসে।

—তপন সাহেব আপনি বুঝতেই পারছেন আপনার আর কোন অপশন নেই। সব যদি এখনই স্বীকার করেন তাহলে আমাদের ঝামেলা কমবে। আপনারও কমবে। এই কাগজটায় আপনি আপনার স্টেটমেন্ট দিন।

—আমি খুন করিনি। সো আমার স্বীকার করার কথা ভুলে যান। এটা হচ্ছে না।

—আপনি মারাত্মক বোকা লোক। নিজের অবস্থানের কথা ভুলে যাচ্ছেন। রাসেল একটু ট্রিটমেন্ট দেও তো তপনকে। কথাটা শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলো রাসেল। নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো সে। প্রায় সাথে সাথে টেবিলের অপর পাশে থাকা তপনের শার্টের কলার ধরে টান দিয়ে নিচে নামিয়ে অন্য হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে টেবিলের সাথে জোরে আঘাত করলো। চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে তপনের। চোখে লাল নীল দেখছে সে। মাথা ঝাড়ি দিয়ে নিজেকে ঠিক করতে যাবে এমন সময় রাসেল আবার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে টেবিলের সাথে তপনের মাথা ঠুকে দিলো।

মুখে পানির ঝাপটা এসে লাগাতে জ্ঞান ফিরে আসলো তপনের। কয়েক মুহূর্ত লাগলো বুঝতে সে কোথায় আছে। কী হচ্ছে তার চারদিকে। মাথা হাত দিয়ে তপন বুঝতে পারলো মাথা অনেকখানি ফুলে উঠেছে আর মারাত্মক যন্ত্রণা হচ্ছে সেখানে।

—তপন সাহেব, যেটা হলো এটা মাত্র ভূমিকা। অপেক্ষা করেন আপনার জন্য আরো ভালো কিছু জমা রয়েছে। তো কাগজটায় ভালোমতো স্টেটমেন্ট দিবেন নাকি সব রিমান্ডে স্বীকার করবেন। এদেশি রিমান্ড কী জিনিস জানেনই তো। শুধু সিদ্ধ গরম ডিম ব্যবহার হবে। এখন আপনি সিদ্ধান্ত নিন কী করবেন।

ডিটেকটিভ রোকনের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তপন তাকিয়ে রয়েছে। বোঝার চেষ্টা করছে লোকটা মজা করছে নাকি। মজা করছে এমনটা মনে হচ্ছে না। সামনে একটা কাগজ আর কলম রাখা আছে। তপন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কী করবে সে।

আট

—খাবারটা গরম করে নিয়ে আসতে পারবি? কথাটা রোকন তার ছোট বোন রিমার উদ্দেশে বলছিলো।

—আনছি। রান্নাঘর থেকে আওয়াজ ভেসে আসলো।

রোকনের পরিবার বলতে সে, তার নয় বছরের ছোট বোন আর তার বাবা। তাদের মা রিমার জন্মের চার বছর পরে মারা গিয়েছিলো। রোকন আর তার বাবাই দেখাশোনা করে রিমাকে বড় করেছে। আর এখন রিমাই তাদের দেখাশোনা করে। বাঙালি মেয়ে, জন্মগতভাবে পরিবারের হাল ধরার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। রিমার বর্তমান বয়স বাইশ। কয়েক মাস আগে বিবিএ পাস করে বের হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন নাটকের সাথে যুক্ত। বর্তমানে মিডিয়াতে মোটামুটি পরিচিত মুখ সে।

—তোকে বলেছিলাম কিছুদিনের জন্য পত্রিকায় সাক্ষাৎকার বন্ধ রাখতে। একটা কথা বললে শুনিস না কেন?

—ভাইয়া আমি বলছিলাম তাদের। কথা শুনেনি। তাদের ভাষ্যমতে পনের দিন আগে সাক্ষাৎকার নিয়েও প্রকাশ করেনি। আর কতদিন অপেক্ষা করবে? তাছাড়া পাবলিশ করলে সমস্যা কী? এতে তো আমারই লাভ। মিডিয়ার লাইনে পাবলিসিটি বেশি ইমপর্টেন্ট এটা তো বুঝো।

—সমস্যা কী, এটা তো তোকে বিস্তারিত বলতে পারবো না। যা বলি সেটা করলে সমস্যা কী?

রিমা কোন কথা বললো না। পত্রিকার লোকদের পুরোপুরি দোষ দেওয়া যায় না। কারণ রিয়া নিজেই হ্যাঁ বলে দিয়েছিলো। এতদিন পত্রিকা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখা পাগালামী ছাড়া কিছু না। কোন কারণ আছে এসবের। তাই সব ভেবেচিন্তে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলো রিমা। তবে এখন মনে হচ্ছে কাজটা করা ঠিক হয়নি। ভাইয়া খুব রাগ করেছে। তবে এখন আর কী করার? কথাগুলো ভাবছিলো রিমা।

—ওই শোন রিমা। যদি কোন চিঠি তোর নামে আসে তাহলে আমাকে বলবি কিন্তু। বুঝছিস?

—আচ্ছা। রিমা ভিতরে ভিতরে কিছুটা চমকে গেলেও বাহিরে সেটা প্রকাশ করলো না। তার ভাই হঠাৎ চিঠির কথা তুললো কেন। সে অবশ্য গতকাল একটা চিঠি পেয়েছে। সাদা খামের ভিতরে একটা লাল রংয়ের কাগজ। কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখেছিলো রিমা। কিছু লেখা ছিলো না সেখানে। তাছাড়া চিঠিটা তার নামে এসেছিলো। যদি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতো তাহলে নিশ্চয়ই তার ভাইয়ের নামেই আসতো। হয়তো কেউ তার সাথে মজা করার জন্য একাজ করছে। এটা নিশ্চয়ই বলার মত কিছু না। তাই না বলার সিদ্ধান্ত নিলো রিমা।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘর থেকে বের হলো রোকন। গরম পড়া শুরু হয়ে গিয়েছে। রোদে শরীর পুড়ে যাওয়ার মত না হলেও যথেষ্ট যন্ত্রণাদায়ক। হাতের মোবাইলটার দিকে একপলক তাকিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো সে। আপাতত উদ্দেশ্য জাকারিয়া তপনের সাথে দেখা করা। প্রায় দশ দিন হয়েছে তপন গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে তাকে আদালতে তোলা হয়েছে এবং ছয়দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। এখন অবশ্য সব স্বীকার করেছে তপন। আটটা মার্ডারের আসামি এখন সে। তার ফাঁসিতে ঝোলা হয়তো কেউ ঠেকাতে পারবে না। কারণ ডক্টর ঘোষণা দিয়েছে সে মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ। যদি সে মানসিকভাবে অসুস্থ হতো তাহলে হয়তো তার ফাঁসিতে ঝোলার সম্ভবনা থাকতো না। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে তার গন্তব্য স্থানে চলে আসলো রোকন। তপনের সাথে দেখা করতে করতে আরো দশ মিনিট নষ্ট হলো। এখন তপন চুপচাপ বসে আছে রোকনের সামনে। ছয়দিনের রিমান্ডে তপনের অবস্থা কতটা ভয়াবহ এটা না দেখলে বোঝা সম্ভব না। শুকিয়ে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে তপন। চাপার হাড় উঁচু হয়ে আছে। কুঁজো ভঙ্গিতে বসে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে সে। দৃষ্টি নিজের পায়ের আঙুলের দিকে।

—কেমন আছেন তপন সাহেব? কোন প্রতিউত্তর আসলো না তপনের পক্ষ থেকে। অবশ্য উত্তর আশা করেনি রোকন। সে কথা থামালো না। শেষপর্যন্ত আপনি খুনের দায়বদ্ধতা স্বীকার করছেন। ভালো কথা। অবশ্য স্বীকার না করে যাবেন কোথায়? হাতেনাতে ধরা খেয়েছেন কি না। তবে কীভাবে খুন করেছেন এটা ঠিকমতো বললে সমস্যা কী? উল্টোপাল্টা জবাব দিয়ে অকারণেই আমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন কেন?

কথাগুলো চুপচাপ শুনছিলো তপন। উত্তর দেওয়ার কোন মানে নেই। কয়েক মাসের মধ্যে তার ফাঁসি হবে এটা জানা কথা। শুধু শুধু কথা বলে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয়? তপনের কয়েকদিন ধরে নীল আকাশটা দেখতে ইচ্ছে করছে। খালি পায়ে মাটির রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করছে। সে জানে হয়তো এগুলো কোনদিন আর সম্ভব হবে না। আজকাল সে পুরানো দিনগুলো খুব মিস করে। বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজির কথাগুলো মনে পড়ে। বুঝে সে আর কখনো আড্ডা দেওয়া হবে না। তবে এখন হয়তো মিস করা ছাড়া কোন উপায় নেই। তপন বুঝতে পারছে রোকন নামের লোকটি উঠে দাঁড়িয়েছে। লোকটা তার উপর বিরক্ত এটা যে কেউ বুঝতে পারবে। এতক্ষণ এত কথা বললো আর সে কোন সাড়া দিচ্ছে না এটাতে যে কেউ বিরক্ত হবে। রুম থেকে রোকন বের হয়ে যাবে এমন সময় কথা বললো তপন,

—আমি এখনো বলবো আমি কোন খুন করিনি। আমি নির্দোষ।

—কিন্তু এটা বলে কোন লাভ নেই। রিমান্ডে তো আপনি সব স্বীকার করেছেন।

—স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছি। কারণ আপনারা আমাকে স্বীকার করতে বাধ্য করেছেন।

—আপনার আঁকা ছবি আর নাদিয়ার ডেডবডি ভিন্ন কথা বলে। ওগুলো কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

—ওই ছবিটা আমি আঁকিনি আগেও বলেছি এখনো বলবো। আর ডেডবডি কীভাবে আমার বাড়িতে এসেছে এটা আমি বলতে পারবো না। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে এটা কি আপনি বুঝতে পারছেন না?

—ছবিতে আপনার সাক্ষর আছে। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি ওটা আপনারই সাক্ষর। অন্য কেউ যদি আর্ট করে থাকে তারপরও আপনার সাইন কীভাবে দেয়? একথা বলবেন না যে, সাইনটাও দক্ষ লোক নকল করেছে। তপন সাহেব আপনি যত যা-ই বলেন আপনার বিরুদ্ধে জোরালো প্রমাণ আছে। সুতরাং এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। তার থেকে জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো উপভোগ করুন।

কোন জবাব দিলো না তপন। এসব কথা বলা অযথা। সে ভালোভাবেই জানে তার বিরুদ্ধের প্রমাণগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। সুতরাং কোনভাবেই তার বেঁচে যাওয়ার সম্ভবনা নেই। তার থেকে চুপ থাকা ভালো।

—আপনার শেষ কোন ইচ্ছে থাকলে আমাকে বলতে পারেন।

—আমার বাসায় আমার আর্ট করার ইন্সট্রুমন্টগুলো দিয়ে যেতে পারেন। কিছু চাইবে না ভেবেও কথাটা বললো তপন।

—আচ্ছা আমি নিজ দায়িত্বে এটা করে দিবো। কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দিলো রোকন। সে একটু অবাক হয়েছে। অবশ্য অবাক হওয়াটা মানায় না। এ লোক জাত আর্টিস্ট। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও এ লোক আর্ট করবে জানা কথা।

—ধন্যবাদ।

তপন এবার একেবারে চুপ হয়ে গেল। তাকে রোকন দেখেই বুঝতে পারছে এ লোক আর কথা বলবে না। রোকন রাস্তায় বেরিয়ে আসলো। হালকা বাতাসের মধ্যে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বুকভরা ধোঁয়া টেনে নিলো সে। রোকন পুরো কেসটা নিয়ে বারবার ভেবে যাচ্ছে। তপনের আচরণ এখনো সে মেনে নিতে পারছে না। প্রমাণ অনুসারে এ লোকের উপর খুনের সব দায়বদ্ধতা পড়ে। কিন্তু লোকটার কথা শুনে মনে হয় সে নিতান্তই বাধ্য হয়ে সবকিছু স্বীকার করেছে। আচ্ছা আসলেই যদি খুনের দায়বদ্ধতা তপনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়? কিন্তু তপনের বাড়িতে কেউ প্রবেশ করে লাশের টুকরো টুকরো বক্স করে রেখে যাবে এটা মানা যায় না। কারণ বলা যায় এ কাজটা কিছুটা অসম্ভবই বটে। উঁচু দেয়াল বাড়ির চারদিকে সাথে সাথে সব সময়ই দারোয়ান থাকে। মানা গেল কোনভাবে এটা ম্যানেজ করেছে আসল খুনি। কিন্তু ছবির ব্যাপাটার কী হবে? কীভাবে তার ছবির পরিবর্তে মার্ডারের ছবি পাঠিয়েছে খুনি। এত ভালো সাইন নকলটা না হয় মেনে নেওয়া যায়। কোনভাবে সেটা ম্যানেজ করছে খুনি। কিন্তু তপনের ছবির জায়গায় তার ছবি চেঞ্জ করাটা একটু অসম্ভব বটে। ছবি সাধারণত হাতে হাতে যায়। এক কাজ করা যেতে পারে তপনের বন্ধু আসিফ রেজওয়ানকে আবার প্রশ্ন করে দেখা যেতে পারে। তপনের ভাষ্যমতে সেদিন তার বন্ধুকে দিয়েই পাঠানো হয়েছিলো ছবিটা। অবশ্য আসিফ রেজওয়ান সেটা স্বীকার করেছে যে তাকে দিয়েই ছবিটা পাঠানো হয়েছিলো। তবে কী ছবি পাঠানো হয়েছে এটা সে দেখেনি। কারণ কাগজ দিয়ে মোড়া ছিলো ছবিটা। তাই দেখার কোন সুযোগ ছিলো না। ছবিটা জায়গামতো পৌঁছে দিয়েই সে চলে গিয়েছিলো। তাই বলতে পারছে না কী ছবি সেখানে ছিলো। উত্তরগুলো এতটা স্বাভাবিক ছিলো যে তাকে আর প্রশ্ন করার কোন কিছু ছিলো না।

জোবায়ের রোকন গাড়ি থেকে তপনের বাড়ির সামনে নামলো। ঘন্টাখানেক সময় লেগেছে তার এখানে আসতে। যদিও এত সময় লাগার কথা না। রাস্তার যানজট আর এ বাড়ির চাবি সংগ্রহ করতে দেরি হয়ে গিয়েছে আর কী। দারোয়ান নেই এখন বাড়িতে। তাই গেট নিজেই খুলে ভিতরে ঢুকলো রোকন। বাড়িতে কোন সাড়াশব্দ নেই। আর থাকার কথাও না। বাড়ির প্রতিটি রুমে ঘুরেফিরে দেখছে রোকন। ক্লু খুঁজছে যেটা দিয়ে বোঝা যায় তপন খুন করেনি। না তেমন কিছুই চোখে বাধছে না। অবশ্য কিছু পাবে এমনটা আশা করে না রোকন। কারণ একদল দক্ষ লোক দিয়ে এ বাড়ি সার্চ করানো হয়েছে। তাই তপনের আর্টস এর রুমে চলে আসলো সে। একটা ব্যাগ এর মধ্যেই জোগাড় করে নিয়েছে। সেটার মধ্যে তপনের কালার, তুলি,পেপারসহ অন্যান্য জিনিস গুছিয়ে রাখতে লাগলো। পেপার রাখতে গিয়ে রোকন বুঝতে পারলো পেপারগুলো এভাবে রাখার প্রয়োজন নেই। পেপার কন্টেনার নিশ্চয়ই আছে তপনের। তাছাড়া সব পেপারগুলো নিয়ে যাওয়াটাই বেটার হবে। কয়েকটা রুম খোঁজার পর পেপার বক্স পাওয়া গেল। অনেকগুলো খবরের কাগজের উপর পেপার বক্সটা পড়ে আছে। বক্সটা হাতে নিয়ে অন্য রুমে চলে যাবে এমন সময় থমকে গেল রোকন। বক্সটা পাশে রেখে সব পেপার নিজের দিকে টেনে নিলো সে। সবার উপরের পত্রিকার নাম দৈনিক প্রথম আলো। বক্সটা তুলে নেওয়ার সময় এটাই তার চোখে বেধেছিলো। উপরের পেপারটা সরিয়ে রোকন নিচের পেপারগুলো একটার পর একটা দেখতে লাগলো। সব পত্রিকা প্রথম আলোর। পেপারগুলো দেখে রোকন গভীর টেনশনে পড়ে যাচ্ছে। গত এক মাসের পত্রিকা এখানে আছে। সব প্রথম আলো। কিন্তু তার হিসাবে বলছিলো যে খুনি প্রথম আলো পড়ে না। সে কালের কণ্ঠ ব্যবহার করতো টার্গেট খুঁজে নিতে। কিন্তু এখানে তো তার ধারণা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। নাকি তার সন্দেহ ঠিক, আসল খুনি তপন না? আরো কোন সূত্র দরকার প্রমাণ করার জন্য যে খুনটা তপন করেনি। কী কী খোঁজা যায় ভাবতে ভাবতে এক রুম থেকে অন্য রুমে হাঁটাহাঁটি করছিলো রোকন। তপনের পিসিতে কিছু নেই ভালোভাবেই জানে। কারণ সেটা ঘেঁটে দেখা হয়েছিলো। একটা ডিএসএলআর এর ব্যাগের উপর চোখ পড়ল রোকনের। ব্যাগ খুলে ক্যামেরাটা অন করে ছবি দেখতে লাগলো রোকন। তেমন কিছু নেই এখানে। তপনের আঁকা বিভিন্ন আর্টের ছবি তুলে রাখা হয়েছে। সাথে সাথে সেগুলো প্যাক করার ছবিও দেখা যাচ্ছে। প্রথম থেকে দ্বিতীয় বারের মত ছবিগুলো দেখতে শুরু করলো আবার। প্রথম চারটি পিকচার তপনের একটা আর্টের অবশ্য। খোলা আর কাগজে প্যাঁচানো অবস্থায় ছবিগুলো তোলা। রোকন পরের ছবিগুলো দেখে যেতে লাগলো। প্রতিটা আর্টের পাঁচ ছয়টা ছবি তোলা হয়েছে। প্রথম ছবিটা বাদে বাকি সব ছবি দেখেছে আগে তপন। তার মনে হচ্ছে প্রথম আর্টের জায়গায় খুনি তার স্কেচ প্রতিস্থাপন করেছে। তাই এ ছবিটা সে দেখেনি। ছবির ডিটেইলস দেখে রোকন নিশ্চিত হলো যে তার ধারণাই সঠিক। তবে একটা ভিন্নতা এখানে রয়েছে। এখনই পরীক্ষা করে সিউর হওয়া যাবে না। তবে তপনের বন্ধু আসিফ রেজাউনের সাথে কথা বলার দরকার। কারণ সে হয়তো তপনকে মুক্ত করতে সাহায্য করতে পারবে। ডিএসএলআর আর আর্টের ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে গাড়িতে চেপে বসলো রোকন।

নয়

রিমা খাট থেকে উঠে বসলো। হাত আর ঘাড় নড়াচড়া করে ঝিমানো ভাবটা দূর করার চেষ্টা করছে। খাটের পাশের টেবিলে রাখা টেবিল ক্লক এর দিকে তাকালো রিমা। ঘড়িতে সময় সকাল ছয়টা আঠারো। এতো সকালে রিমা সাধারণত ঘুম থেকে ওঠে না। তবে আজ উঠতে বাধ্য হয়েছে। কলিং বেল অনেকক্ষণ ধরে বেজে যাচ্ছে। রিমা অত্যন্ত বিরক্ত মেজাজ নিয়ে খাট থেকে নেমে দরজা খোলার জন্য উঠে দাঁড়ালো। আজ তার বড়ভাই বাসায় নেই। গতকাল রাতে কল দিয়ে বলেছে আসতে পারবে না। কী একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে নাকি ঢাকার বাইরে যেতে হবে। আর আজ রাতে দশটার আগে নাকি ফিরতে পারবে না। ভাইয়া থাকলে দরজা খোলার জন্য রিমার অন্তত ঘুম থেকে ওঠা লাগতো না। তবে এখন কী আর করার? সে ছাড়া এ মুহূর্তে বাসায় কেউ নেই। তার বাবা গিয়েছে রিমার ফুপুর বাসায়। সম্ভবত তিন চারদিনের আগে আসবে না। দরজা খুলে রিমা একজন ত্রিশ বত্রিশ বয়সী মানুষকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো। পরিপাটি পোশাক পরে হাতে বড়সর একটা ব্যাগ নিয়ে দাড়িয়ে আছে লোকটি। কথা না বলেও রিমা বুঝতে পারছে এ লোক তার ভাইয়ের কাছে এসেছে। তবে এত সকালে কেন? নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু হবে।

—কাকে চাই? আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না। রিমা প্রশ্ন করলো।

—রোকন সাহেব বাসায় আছে? তিনি আজ সকালে সাতটার দিকে আসতে বলেছিলেন। তবে আমার কাজ থাকায় আগে আগে এসেছি। তাকে একটু ডেকে দিবেন?

—ভাইয়া তো বাসায় নেই?

—তাহলে আমি কি অপেক্ষা করবো? তিনি আসবেন কখন?

—রাতে আসার কথা। এক কাজ করুন আপনি চলে যান। পরে যোগাযোগ করেন ভাইয়ার সাথে।

—আমি অনেক দূর থেকে এসেছি। আবার আসা অনেক সমস্যা। তার থেকে আমি ব্যাগটা রেখে যাই। এটার জন্যই সে আমাকে আসতে বলেছে।

—আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলে নেই আগে। আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আর হ্যাঁ ভিতরে এসে বসেন।

কথাটা বলার পর রিয়ার পিছন পিছন এসে গেস্টরুমে বসলো লোকটা। রিমা তাকে অপেক্ষা করতে বলে নিজের রুমে এসে মোবাইল তুলে নিলো। ভাইয়াকে কল করতে যাবে এমন সময় রিমার মনে হয় লোকটার নামই তো তার জানা হয়নি। নাম জানার জন্য লোকটার কাছে যাওয়ার জন্য ঘুরে অবাক হয়ে গেল রিমা। লোকটা তার পিছনে এসে দাড়িয়েছে। বিস্ময়টুকু কাটিয়ে লোকটাকে ধমকের সুরে বললো এখানে সে কী করছে। কোন উত্তর দিলো না লোকটা। রিমা আর কিছু বলতে যাবে এমন সময় মুগুর জাতীয় কিছু তার মাথার উপর আছড়ে পড়লো। তবে রিমা সাথে সাথে জ্ঞান হারালো না। মাথা ঝাড়ি দিয়ে সোজা করতে যাবে এমন সময় আরেকটা আঘাত হলো রিমার মাথা লক্ষ করে করলো। রিমা এ আঘাতটি সহ্য করতে পারলো না। অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। তবে লোকটি এখনো থামেনি। রিমার মাথায় আরো দু তিনটা আঘাত করে নিশ্চিত করলো কিছুক্ষণের জন্য রিমার জ্ঞান ফিরবে না। হেঁটে হেঁটে নিজের সাথে নিয়ে আসা ব্যাগের কাছে চলে আসলো লোকটি। ব্যাগ থেকে প্রথমে গ্লাভস, দড়ি বের করলো সে। এরপর লোকটি একে একে কুড়াল আর কয়েক ধরনের ছুরি বের করলো। রিমার কাছে চলে আসলো সে। ভালো করে হাত আর পা বেঁধে নিলো। এরপর রিমার মুখটা খুলে সেখানে মোটা কাপড় গুঁজে দিলো। তারপর হাতে গ্লাভস পরে রিমার অচেতন শরীর টেনে নিয়ে আসলো ডাইনিং রুমে। ব্যাগের মধ্যে দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একটা পোশাক বের করে নিয়ে পরতে লাগলো সে। প্লাস্টিক টাইপের পোশাকটাতে শার্ট পান্ট একসাথে বানানো। লোকটি পোশাকটা শরীরে চড়িয়ে চেইন দিয়ে ভালোভাবে সেটা আটকে নিলো। হাতে এবার সে তার কুড়াল তুলে নিলো। রিমার জ্ঞান ফিরে আসতে শুরু করেছে। সে যখন লোকটার দিকে তাকালো দেখলো তার গলা লক্ষ করে কোপ দেওয়ার জন্য লোকটি কুড়াল মাথার উপর তুলে নিয়েছে। লোকটি কুড়াল নামিয়ে আনলো রিমার গলা লক্ষ করে। তবে মিস হয়েছে। রিমা গড়িয়ে সরে গিয়েছে তার অবস্থান থেকে। রিমার এ কাজের জন্য লোকটি মারাত্মক বিরক্ত হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। কোন লাভ আছে এভাবে সরে গিয়ে? রিমার তো মরতে হবেই। রিমার কাছে এসে তাকে পা দিয়ে চেপে ধরলো লোকটি। এবার আর দেরি করলো না সে। কুড়ালটি মাথার উপর তুলেই কোপ বসিয়ে দিলো রিমার কণ্ঠনালী বরাবর। এড়ানোর কোন সুযোগ ছিলো না রিমার। কুড়াল এর আঘাতে কণ্ঠনালী প্রায় অর্ধেক কেটে গিয়েছে। ঘড়ঘড় একটা আওয়াজ বের হচ্ছে কাটা কণ্ঠ থেকে। রিমা মৃত্যু যন্ত্রণায় লাফালাফি করছে। এতটাই লাফাচ্ছিলো যে পা দিয়ে চেপে রাখা সম্ভব হলো না লোকটার। কিছুক্ষণ মৃত্যু যন্ত্রণার নিয়ে লাফালাফি করে থেমে গেল রিমা। পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছে সে।

রিমা থেমে যাওয়ার পর রিমার গলায় গেঁথে থাকা কুড়ালটি টেনে তুললো লোকটি। মাথাটা পুরোপুরি আলাদা করার জন্য আরো কয়েকটা কোপ বসালো। মাথাটা আলাদা হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে রিমার হাতের আর পায়ের দড়ি খুলে নিলো সে। হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে লোকটি সেগুলোতে কোপাতে শুরু করলো। দশ মিনিটের মধ্যে সেগুলো রিমার শরীর থেকে আলাদা করে ফেললো। কুড়াল রেখে লোকটি এবার হাতে ছুরি তুলে নিলো। রিমার সব পোশাক কেটে খুলে ফেললো লোকটি। পেটের মাঝ বরাবর কাটতে শুরু করলো। পেটের কাটা অংশের সাইজ বড়সড় হতে রিমার নাড়িভুড়ি টেনে বের করতে লাগলো লোকটি। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় উপর এলোমেলোভাবে ছুরি চালালো কিছুক্ষণ। শরীরের বিভিন্ন জায়গার মাংস কেটে আলাদা করতে লাগলো সে। আধঘন্টা পর যখন লোকটির মনে হলো শরীরের আর কোন জায়গা খালি নেই কাটাকুটি করার জন্য তখন সে থেমে গেল। মাথাটা তুলে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের উপর একটা প্লেটের মধ্যে রাখলো সে। তবে লোকটার সাজানো হয়তো এখনো পুরোপুরি হয়নি। একটা টেবিল চামচ ,কাটা চামচ প্লেটের দুপাশে রেখে দিলো সে। এরপর একে একে হাত পায়ের একাধিক ছোট ছোট টুকরো করা অংশ একটা বড় গামলার মধ্যে রাখলো সে। সাথে রিমার কেটে নেওয়া নাড়িভুড়ি। হালকা হাসি ফুটে উঠলো লোকটার মুখে। রোকন যখন বাসায় এসে তার আদরের বোনের এ অবস্থা দেখবে তখন তার মুখার কী অবস্থা হবে ভেবে হাসি পাচ্ছে তার। লোকটির খুব ইচ্ছে করছে তখন রোকনের চেহারার অভিব্যক্তি দেখতে। কিন্তু সেটা তো সম্ভব না। ওয়াশ রুমের মধ্যে এসে গায়ের প্লাস্টিকের পোশাকের উপর একরাশ পানি ঢেলে রক্ত পরিষ্কার করলো লোকটি। এরপর একে একে সবকিছু পরিষ্কার করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল সে। তবে যাওয়ার সময় কলিং বেলে নিজের ফিঙ্গার প্রিন্ট মুছে দেওয়ার কথা ভুললো না সে।

দশ

রুমে চোখটা বারবার ঘুরিয়ে আনছে রোকন। সিঙ্গেল মানুষের ঘর যেমন হওয়া উচিত তার থেকে ভিন্ন কিছু না। এ মুহূর্তে রোকন তপনের বন্ধু আসিফ রেজাউনের বাসায় বসে রয়েছে। তপনের কেস নিয়ে হালকা আলাপ আলোচনায়ই মূল উদ্দেশ্য। সামনে থাকা টি-টেবিলে একটা সিগারেটের ছাইদানী রয়েছে। কয়েকটা সিগারেটের গোড়াও সেখানে দেখা যাচ্ছে। সিগারেট দেখলে বা সিগারেটের গন্ধ নাকে আসলে সব স্মোকারদের ধূমপানের তৃষ্ণা জাগে। তবে ইচ্ছে থাকলেও রোকন এখন সিগারেট ধরাতে পারছে না। কারণ এ মুহূর্তে তার কাছে একটা সিগারেটও নেই। ট্রেতে দু কাপ চা নিয়ে আসিফ রুমে প্রবেশ করলো। ট্রে টেবিলের উপর রেখে এক কাপ চা রোকনের দিকে এগিয়ে দিলো।

—সিগারেট চলবে? কথাটা বলার সাথে সাথে আসিফ বেন্সনের খোলা প্যাকেট রোকনের দিকে এগিয়ে দিলো। রোকন কোন কথা না বলে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিলো।

—ছবিগুলো কার আঁকা? দেয়ালে ঝুলানো ছবিগুলোকে ইঙ্গিত করে বললো রোকন।

—বেশিরভাগই আমার আঁকা। তবে একটা তপনের আঁকা। আমার জন্মদিনে গিফট করেছিলো ও।

—আপনার আঁকার হাত আপনার বন্ধুর মত ভালো দেখা যাচ্ছে।

—উহুঁ আমার হাতে ওর থেকে ভালো।

—আপনি আঁকাআকি ছেড়ে দিয়েছিলেন কেন? আপনি আর তপন সাহেব তো এক সাথে চারুকলায় ভর্তি হয়েছিলেন তাই না?

—এ লাইনে ইনকাম কম। খুব অল্প মানুষ কিছু করতে পারে। বেঁচে থাকার জন্য আমার টাকার দরকার ছিলো। মা মারা গিয়েছিলো তখন। আর আমাদের জমানো টাকা তেমন একটা ছিলো না। তখন দিন আনি দিন খাই অবস্থা। তবে থাকার মধ্যে ছিলো এ বাড়িটা। তাই খুব বেশি ঝামেলা হয়নি। তবে যদি আমাদের এ বাড়ি ভাড়াটিয়া তোলার মত হতো ভিন্ন কিছু হতে পারতো। কিন্তু দাদা খুব শখ করে প্রাচীন ডিজাইনে বাড়িটা করেছে। যাই হোক মা মারা যাবার পর নিজের থাকার জায়গা থাকলেও অন্য সবকিছুর খরচ নিয়ে সমস্যায় পড়ে যাই। প্রথম বাস্তবতা অনুভব করি যে টাকাই সব আর আমার মত পরিবারের ছেলেদের আর্টের মত বিলাসিতা মানায় না। তাই বাধ্য হয়ে চাকুরী নেই। তপন যদিও তখন অনেক সাহায্য করেছে। আস্তে আস্তে বিবিএ শেষ করি। আর এখন ব্যাংকের ম্যানেজার।

—হু সবারই জীবনের খুব কঠিন সময় কেটেছে। আচ্ছা আপনার মায়ের বিষয় নিয়ে কখনো কোন কথা কাটাকাটি হয়েছিলো আপনার আর তপনের মাঝে?

—এ কথাটা কেন বলছেন?

—আপনি জানেন আমি কেন বলছি তাই না? আমি ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের লোক আমার জানাটাই স্বাভাবিক তাই নয়কি?

—আমার মা কীভাবে টাকা উপার্জন করতো এটা বুঝি যখন ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। তবে কখনো তাকে বুঝতে দেইনি আমি জানি। আপনিই বলুন আমার মা যে বেশ্যা ছিলো, এটা কীভাবে আমি বুঝতে দেই তাকে যে আমি জানি? না আমি তাকে কোন দোষ দেই না। সে নিজের জীবন , আমার জীবন টিকিয়ে রাখতে দেহ বিক্রি করেছে। এছাড়া তার কোন উপায় ছিলো না। সম্বল বলতে ছিলো আমাদের এই বাড়িটা। কিন্তু এটা বিক্রি করলে হয়তো অল্প কিছুদিন ভালোভাবে থাকতে পারতাম। কিন্তু তারপর? থাকতাম কোথায়? মা বাধ্য হয়ে দেহ বিক্রি করে আমাকে লালন পালন করেছে।

—আচ্ছা তপন কি জানতো এসব?

—হ্যাঁ শুরু থেকেই। আমি যেদিন জানতে পারি তার কিছুদিন পর ও জানতে পারে। আস্তে আস্তে অনেকেই জেনে যায় আর আমাকে এড়াতে শুরু করে। তবে তপন একমাত্র লোক যে কখনো আমাকে ছেড়ে যায়নি। সব সময়ই মেন্টালি সাপোর্ট দিয়েছিলো। আমার একমাত্র বন্ধু।

—আচ্ছা এসব ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য দুঃখিত। আসলে বুঝেনই তো আমি আমার কাজ করছি। আর কিছু না।

—আচ্ছা অসুবিধা নেই। আপনার আর কোন প্রশ্ন থাকলে বলে ফেলুন।

—হ্যাঁ আছে। আপনার কি কিছু বলার আছে, তপন সাহেবের ছবি দিয়ে আসার গুরুত্বপূর্ণ কিছু?

—তেমন কিছু না বলার মত।

—আচ্ছা তপন সাহেবের ছবি কী কাগজে দিয়ে প্যাকেট করা ছিলো?

—সাদা কাগজ। সাধারণ খাকি কালারের পেপার দিয়ে আর্ট প্যাকেট করে দেওয়া হয়। তবে সেদিন ওই কাগজ ওর বাসায় ছিলো না। তাই বাধ্য হয়ে সাদা কাগজ দিয়ে প্যাকেট করে দিয়েছিলো তপন।

—তপন তাহলে সম্ভবত নির্দোষ।

—আমি আগেই বলেছিলাম ও নির্দোষ।

—আসলে বললেই তো হয় না প্রমাণ লাগে। তপন সাহেবের বাসায় নাদিয়ার লাশ আর ছবিটা খুব বড় শক্তিশালী প্রমাণ ছিলো। তবে হয়তো এখন এ বিষয়টা ট্রায়ালে উঠাতে হবে।

—আচ্ছা কী প্রমাণ পেয়েছেন বলবেন?

—তপনে সাহেবের একটা হ্যাবিট হচ্ছে ছবি আঁকার পর ক্যামেরাবন্দি করার। সেখানে দেখেছি তার শেষ ছবিটা সাদা কাগজ দিয়ে প্যাকেটিং করে। আমি আর্ট প্রদর্শনীর ভিডিও দেখেছিলাম। সেখানে তাদের মোড়ক উন্মোচন করার একটা ভিডিও ছিলো। সেখানে দেখি খাকি পেপার দিয়ে তপন সাহেবের আর্ট প্যাকেট করা। অতএব ছবিটা তার আঁকা না। তবে এখনো একটা সমস্যা থাকে তার বাসায় লাশ এসেছে কী ভাবে?

—মাঝেমধ্যেই তার বাসায় বিভিন্ন লোক আসে তার আর্টের ব্যাপারে কথা বলতে। সেখানে কেউ হতে পারে।

—বিষয়টা আমিও ভেবে দেখছি। যাই হোক আমার উঠতে হবে।

—অনেক রাত হয়েছে। আপনি আমার সাথে অল্প কয়টা খেয়ে যাবেন?

—আজ না আরেকদিন।

কথাটা বলে অবশ্য কোন লাভ হয়নি। জোর করে আসিফ রেজাউন রোকন সাহেবকে ডাইনিং টেবিলে নিয়ে যায়। অগত্যা বাধ্য হয়েই ডিনারটা একসাথে সেরে নেয় সে। খাবারের মেনু খুব বড় কিছু ছিলো না। খাসির মাংস ,সাদা ভাত আর আর তরকারি। খাওয়া দাওয়া করতে করতে কথা বললো আসিফ।

—আপনার পরিবারে কে কে আছে রোকন সাহেব?

—আমি, বাবা আর আমার ছোটবোন রিমা। এই আমার পরিবার।

—আপনার মা...? কথাটা শেষ করলো না আসিফ।

—এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। যখন আমার ছোটবোন রিমার বয়স চার।

—কীভাবে? রোকনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে আসিফ রেজাউন। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে জবাব দিলো রোকন।

—ছাদ থেকে পিছলে পড়ে গিয়ে।

—কে কে ছিলো সেখানে? আর আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

—আমি ছাড়া কেউ ছিলো না তখন। আমি মায়ের পাশেই দাঁড়িয়েছিলাম।

—আচ্ছা রোকন সাহেব আপনি শিওর তো আপানার ধাক্কা লেগে আপনার মা ছাদ থেকে পড়ে যায়নি?

রোকনের খাওয়দাওয়া শেষ। হাত পরিষ্কার করে উঠতে যাবে এমন সময় আসিফ কথাটা বললো। অবাক হয়ে রোকন তাকিয়ে রয়েছে। এটা কী ধরনের প্রশ্ন! রোকন কয়েক মুহূর্ত জবাব দিতে পারলো না। সে আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ভয়ঙ্কর এক দৃষ্টিতে সে রোকনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রোকনের মনে হচ্ছে তার ভিতরের সবকিছু ছিঁড়েখুড়ে দেখছে আসিফ রেজাউন। মনে হচ্ছে তার সবকিছুই লোকটা জানে। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে আসিফ অন্য প্রসঙ্গে চলে গেল।

—আচ্ছা মাংসটা কেমন হয়েছে?

—ভালো। বেশ ভালো। আপনার রান্নার হাত অসাধারণ কারণ এটা যে কিসের মাংস এটা বুঝতে আমার বেশ অসুবিধা হয়েছে। এটা কি শুকুরের মাংস নাকি?

—না খাসির মাংস। আমি মুসলিম ভুল গেলে চলবে নাকি? আমার ধারণা আপনি শূকরের মাংস আগে খেয়েছেন। তাই না?

—হু খেয়েছিলাম। একটা মার্ডার কেস সলভ করার জন্য অনেকগুলো শূকরের মাংস খেয়ে পরীক্ষা করা লেগেছিলো। আর এই মাংসের স্বাদ অনেকটা সে রকম।

—শূকরের মাংস হলেও খুব বেশি আপত্তি হওয়ার কথা না আপনার। যদিও এটা ওই ধরনের কিছু না।

—আচ্ছা ভালো থাকবেন। এখন আমার যেতে হবে।

কিছুক্ষণের মধ্যে বিদায় নিয়ে বাসার উদ্দেশে রওয়ানা দিলো রোকন। দ্রুতগতিতে গাড়ি সা সা করে ছুটে চলছে। আধা ঘন্টার মধ্যে রোকন বাসায় এসে পৌঁছলো। কয়েকবার কলিং বেল টিপ দিয়েও যখন সাড়া পাওয়া গেল না তখন বেশ চিন্তিত অনুভব করলো সে। পকেটে থেকে এক্সট্রা চাবি বের করে দরজা খুলে রোকন ভিতরে প্রবেশ করলো। বাসায় প্রবেশ করে রোকন অনুভব করলো কিছু একটা ঠিক নেই। সামনে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় খেয়াল করলো ফ্লোরে রক্তের দাগ। ডাইনিং থেকে রক্ত গড়াতে গড়াতে এসেছে। রোকন বুঝতে পারছে তার পায়ের জোর পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও সে এগিয়ে যেতে থাকলো। তবে সামনে যে দৃশ্যটি দেখলো রোকন সেটার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। রোকন হাটু ভেঙে বসে পড়ল। অন্য কেউ হলে অজ্ঞান হয়ে যেত। তবে হয়তো রোকনের প্রফেশনের জন্যই সে নিজেকে অচেতন হওয়া থেকে থামিয়ে রাখতে পেরেছে। ফ্লোরে হাত পা মাথা বিহীন রিমার শরীর পরে আছে। রিমার দেহটা দেখে মনে হচ্ছে না এটা কখনো মানুষের শরীর ছিলো। পেটের কাছে থেকে কাটা হয়েছে। বিশাল হাঁ হয়ে রয়েছে সেখানে। বুকের স্তন কেটে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাম পাশের কাটা অংশ দেখে বোঝা যাচ্ছে হৃদপিণ্ড কেটে নেওয়া হয়েছে। টেবিলের উপর রিমার মাথা রাখা হয়েছে। সাথে সাথে রিমার চোখ দুটো তুলে নেওয়া হয়েছে। টেবিলের একপাশে বড় গামলা রক্তমাখা অবস্থায় রিমার টুকরো টুকরো করা হাত দেখা যাচ্ছে।

রোকন পুরোপুরি নিঃস্তব্ধ অবস্থায় এভাবে কতক্ষণ বসেছিলো সে নিজে বলতে পারবে না। হঠাৎ তার মনে পড়ল কয়েকদিন আগের সে দরজায় গোপনভাবে সিসি টিভি ক্যামেরা সেট করেছিলো। অর্থাৎ তার বাসায় কে এসেছে সেটার ভিডিও অবশ্যই আছে। নিজের মন শক্ত করে জোবায়ের আহামেদ রোকন উঠে দাঁড়ালো।

এগারো

রান্নাঘর থেকে টগবগ করে পানি ফোটানোর শব্দ ভেসে আসছে। সাথে চপিংবোর্ড আর ছুরির পরস্পর সংঘর্ষের শব্দ। সকালের রান্নার জন্য মাংস কাটা আর পরিষ্কার করা দুটোই সেরে রাখছে আসিফ রেজাউন। মাংস একটি নির্দিষ্ট সাইজে কেটে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিলো সে। আসিফ সাহেব অবশ্য এখনই মাংস রান্না করতে যাচ্ছে না। এটা কালকে করবে। আপাতত ভাত চুলায় চড়িয়ে দিয়েছে সে। সকালে সে রুটির থেকে ভাতই বেশী পছন্দ করে। হালকা গুনগুন করতে করতে ভাতের অবস্থা যখন পরীক্ষা করতে যাবে তখন কলিং বেলের টুংটাং শব্দ ভেসে আসলো। এতো রাতে কে আসলো বাসায়? অবাক হয়ে ভাবছে আসিফ সাহেব। আবার কলিং বেলের শব্দ ভেসে আসলো। হাত পানিতে ধুয়েমুছে আসিফ দরজা খুললো। রাত এগারোটার কম না ঘড়িতে। তবে এতো রাতে পুলিশ তার বাসায় কেন এসেছে! কিছুটা অবাক না হয়ে পারলো না আসিফ। সে কোন কিছু বলার আগে দুইজন সেন্ট্রি তার দুই হাত চেপে ধরলো। কয়েক মুহূর্তে মধ্যে তার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে দেওয়া হলো। বিস্ময়ের ধাক্কা সামলে কথা বললো আসিফ,

—কী হচ্ছে এসব?

—তুই জানোস ভালোভাবে কী হচ্ছে। নয়টা খুন করেছোস আবার জোর গলায় কথা বলিস। তোর সাহস তো কম না। কথাটার ভঙ্গি দেখে আবার অবাক হয়ে গেল আসিফ। কী বলছে এই ওসি? তার মাথার ঠিক আছে? আর তুই তুই করছে কেন?

—কোন প্রমাণ আছে এসবের?

—রিমাকে খুন করতে গিয়ে তো ধরা খাইছোস। নয় নম্বরে ধরা। দরজায় ভিডিও ক্যামেরা ছিলো সেটা তুই জানতি না।

—আচ্ছা আমি একটা কল করি রোকন সাহেব কে?

কোন জবাব আসলো না পুলিশের পক্ষ থেকে। এটাকে সম্মতি হিসাবে ধরে নিলো আসিফ। পকেটে রাখা মোবাইল হাতে নিয়ে ফোন করলো ডিটেকটিভ রোকনকে। দুইবার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ করলো রোকন।

—হ্যালো, কে বলছেন?

—রোকন সাহেবের গলার জোর তো এখন আছে।

—তুমি আমার কাছে কী চাও আর আসিফ? আমার আদরের বোনটাকে খুন না করলে হতো না? ও কী দোষ করছে?

—কেন খুন করেছি? এটা না জানলেও আপনার চলবে। যাই হোক আমি কেন কল করলাম এটা নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে আপনার। একটা বিশেষ কথা জানানোর জন্য।

—কী কথা?

—আপনি যে মাংস খেয়েছেন সেটা খাসির মাংস না।

—তাহলে কীসের মাংস?

—মানুষের মাংস আর শূকরের মাংসের স্বাদ অনেকটা একই রকম জানেন? ওটা মানুষের মাংসের ছিলো। আর মাংসটা অন্য কারো না আপনার নিজের বোনের। নিজের বোনের মাংস দিয়ে ভরপেট খেয়েছেন। এখনও তো খাবার পুরোপুরি হজম হয়নি তাই না?

কোন কথা বের হচ্ছে না রোকনের গলা দিয়ে। রোকনের মোবাইলটা হাত দিয়ে পড়ে গেল। তার শরীর গুলিয়ে আসছে। হরহর করে বমি করে দিলো সে। বমি থেমে যাওয়ার সাথে সাথে নিজের মুখের ভিতরে আঙুল ভরে দিলো সে। তার বমি করতে হবে। যে ভাবেই হোক সব মাংস বের করতে হবে। সে তার তার বোনের মাংস দিয়ে খেয়েছে! কথাটা ভাবার সাথে সাথে আবার বমি করে দিলো রোকন।

মোবাইলে বমির শব্দ শোনা যাচ্ছে। জোরে শব্দ করে হাসছে আসিফ রেজাউন। খুব আনন্দ লাগছে তার। রোকনকে সে উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে। তার মা বেশ্যা ছিলো এটা তার মায়ের কোন দোষ ছিলো না। সমাজ তাকে বাধ্য করেছে এ কাজ করার জন্য। লিসা যাকে সে প্রথম মার্ডার করেছে। তাকে মার্ডার করার একটাই কারণ ছিলো। আসিফের মা কে নিয়ে খারাপ কথা বলছে। বেশ্যার ছেলে বলার সাথে সাথে যা তা কথা বলছে। তার দোষ ছিলো আসিফ লিসাকে ভালোবাসার কথা বলেছিলো। এসব কথা সহ্য করা সম্ভব ছিলো না আসিফের। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে যায় তার। প্রতিশোধের নেশা পেয়ে বসে। দুইদিন প্ল্যান করে খুন করে লিসাকে। পুলিশ বিষয়টা জানতেই পারেনি। কারণ লিসার সাথে তো তার কিছু হয়নি। দ্বিতীয় ভিকটিমের ও দোষ একই ছিলো। তাই তাকেও সরিয়ে দিয়েছে আসিফ। এরপর চোখ বাধলো বিভিন্ন অভিনেত্রী আর মডেলের উপর। যারা বেশ্যাদের নির্মূল করা ও খারাপ কথা বলতো। আরে ওই সব মেয়েরা তো বাধ্য হয়ে দেহব্যবসা করে আর তোরা তো মডেলিং অভিনয়ের নামে সব কাজ করিস, ভাবছিলো আসিফ। সহ্য করা সম্ভব হয়নি আর তার। একে একে টার্গেট নিয়ে খুন করা শুরু করে সে। পঞ্চম ভিক্টিম যদিও ছিলো বাচ্চা। ওর তেমন কোন দোষ ছিলো না। দোষ ছিলো তার বাবা মায়ের। তাদের দুজনকে একসাথে শাস্তি দেওয়া যাবে তাদের বাচ্চা দিয়ে। তো সেই কাজটাই করলো আসিফ। আর নিজের বন্ধু তপনকেও একই কারণে ফাসিয়ে দিয়েছিলো আসিফ। তবে তপনকে ফাঁসিতে ঝোলানো কোন ইচ্ছে ছিলো না তার। শুধু কিছু যন্ত্রণা দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো। যদি ফাঁসিতে ঝোলানোর ইচ্ছে থাকতো তাহলে নিজের হাতেই খুন করতো। তবে এই ছেলেটা তার জীবনে অনেক সাহায্য করেছে। তাই মাফ করার কথা ভেবেছে আসিফ। তবে তো কিছু একটা শাস্তি হিসাবে দিতে হয়। আর রোকনের বোনকে খুন করে তাকে তার বোনের মাংস খাওয়ানোর কোন ইচ্ছে ছিলো না। তবে তার মায়ের প্রসঙ্গ তোলাতে নিজেকে সামলিয়ে নিতে পারেনি আসিফ। তাই রেগে এ কাজ করেছে। তবে এটা নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই আসিফের।

আসিফ রেজাউনের অট্টহাসি শুনে যাচ্ছে ওসি আব্দুল্লাহ আর তার সাথে পুলিশ। আসিফের কথা শুনে সবাই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। মানুষের মাংস খাওয়া! বিশ্বাস করা কঠিন। সবার আগে ওসি আব্দুল্লাহ নিজেকে সামলে নিলো। গায়ের শক্তি দিয়ে কয়েকটি ঘুসি লাথি ঝেড়ে দিলো আসিফের উপর। তবে একটা ভুল করে ফেললো সে। গালাগালি করতে করতে আসিফকে বেশ্যার ছেলে বলে ফেললো। এটা হয়তো তার জীবনের শেষ ভুল ছিলো। চোখ জ্বলে উঠলো আসিফের। আসিফ লাফ দিয়ে ওসি আব্দুল্লাহ এর ঘাড়ে কামড় দিয়ে মাংস ছিঁড়ে নিলো। পাশে থাকা সেন্ট্রিরা আসিফকে টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করলো। তবে পারলো না। অসুরের শক্তি যেন ভর করছে তার উপর। রান্নাঘর থেকে আসার সময় ছুরিটা পিছনের পকেটে করে নিয়ে এসেছিলো আসিফ। সেটা হাতে নিয়ে এক কোপ বসিয়ে দিলো ওসি আব্দুল্লাহ এর হৃদপিণ্ড বরাবর। এক এক আঘাতই ওসির মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট ছিলো। মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল সে। ওসি মারা যাবার সাথে সাথে শান্ত হয়ে গেল আসিফ। তবে অন্য পুলিশরা রিস্ক নিলো না। আসিফের মাথার পিছনে সাথে সাথে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করলো। আঘাত যথেষ্ট জোরে ছিলো। আসিফ অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

পরিশিষ্ট

আসিফ রেজাউন পুরোপুরি উন্মাদ হিসাবে প্রমাণিত হয় তাই তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়নি। বর্তমান সে একটা হাসপাতালে কঠোর নিরাপত্তার মাঝে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তপনের ফাঁসি হয়ে গিয়েছে। কারণ আসিফ সাক্ষী দেয় তপন তার প্রতিটি কাজে সাহায্য করেছে। প্রথমে আসিফের ইচ্ছে ছিলো না তপনকে এভাবে ফাঁসানোর। তবে গ্রেফতার হওয়ার পর সিদ্ধান্ত পাল্টায় সে। কাউকে সে মাফ করবে না।

সাইকিয়াট্রিস্ট সুজন শহিদুল নতুন নার্সকে তন্দ্রাকে ব্রিফ দিচ্ছে। হাসপাতালে বিভিন্ন সেলে বন্দি থাকা রুগীদের সম্পর্কে জানাচ্ছে আর সতর্ক করে দিচ্ছে।

—এই লোকটার নাম আসিফ রেজাউন। তুমি এর থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখবে।

—এই লোক আর বন্ধু মিলে না তিন বছর আগে নয়টা খুন করেছিলো?

—হ্যাঁ এই লোকই। আর যাই করো আসিফের মা কে নিয়ে কিছু বলবে না। ভুলেও না। এ ভুলের কারণে গতবছর একজন নার্স ওর হাতে খুন হয়েছে। ও সবগুলো খুন একই কারণে করেছে জানোই তো। পত্রিকাতে বেশ ভালোভাবে এ সম্পর্কে লেখালেখি হয়েছিলো।

—হ্যাঁ আমি পড়েছিলাম। আর আসিফের বিপরীত সেলের লোকটি কে?

—এটা জোবায়ের আহামেদ রোকন। আসিফ রেজাউনের কেসে নিযুক্ত ছিলো। এখন সম্পূর্ণ পাগল। সাথে বিপদজনক। এর থেকেও সাবধান।

—আচ্ছা।

কথা বলতে বলতে সামনে যাচ্ছে তারা। এমন সময় আসিফের সেল থেকে কথা ভেসে আসলো। কান পেতে শুনলো তন্দ্রা।

—কি রোকন মাংস খাবা? আমার কাছে তাজা মাংস আছে।

গোঁ গোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে রোকনের সেল থেকে। কী কারণ বলতে পারবে না তন্দ্রা। তার শরীর শিরশিরিয়ে উঠলো।