জুলাই ২০১৯



প্রচ্ছদশিল্পী - প্রতিম দাস ও মিশন মন্ডল


(প্রতিটি লেখা Hyperlink করা আছে। লেখার ওপর ক্লিক করে পড়ুন।)


গল্প


লাভক্রফটিয়ান হরর


সাইকোলজিকাল হরর

আশ্রয়ের আঁধার তানজিরুল ইসলাম
নিশি-যাপন সম্বুদ্ধ সান্যাল
পুতুল বিভাবসু দে
কুয়াশার আড়ালে সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
বাতাসিয়ার পরীরা সায়নদীপা পলমল
দ্য ক্যাট ফ্রম হেল স্টিফেন কিং অপরেশ পাল
কালো বিড়াল এডগার অ্যালান পো প্রতিম দাস
পুতুল আগাথা ক্রিস্টি মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
খাদ ডরোথি কুইক কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রবন্ধ


অনুবাদ কমিকস




সম্পাদকের কথা

প্রিয় পাঠকবন্ধুরা,

প্রথমেই আপনাদের সবাইকে জানাই নতুন বাংলা বছরের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। শারদ সংখ্যার পর আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম সাহিত্যের আলাদা আলাদা গোত্র নিয়ে এক একটি সংখ্যা করার, যাতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার বিস্তর সুযোগ থাকে। সেই মত গত জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছিল কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসি সংখ্যা, আর নতুন বাংলা বছরের শুরুতে আমাদের নিবেদন ছিল বিশেষ অপরাধ ও রহস্য সংখ্যা। বেশ কয়েকটি জনরা ফিকশনের ওপর সংখ্যা করার পর এবার আমাদের পরিকল্পনা বিভিন্ন সাবজনরা নিয়ে চর্চা করার। সেই মতো প্রকাশিত হলো ‘লাভক্রফটিয়ান হরর’ ও ‘সাইকোলজিকাল হরর’ নিয়ে ‘পরবাসিয়া পাঁচালী’র বর্ষা ২০১৯ সংখ্যা।

“মানুষের সবচেয়ে পুরাতন এবং শক্তিশালী আবেগ হলো ভয়।

আর, সবচেয়ে প্রাচীন এবং অদম্য ভয় হলো, অজানা-র থেকে আতঙ্ক।”

সাধারণত হরর বলতে আমরা বুঝি ভূত, রাক্ষস বা দানবের গল্প। কিন্তু লাভক্রাফটের দুনিয়াতে “অশুভ, বিকটদর্শন, ভয়ানক সব জীবেরা ঘোরাফেরা করে, অবহেলাভরে কৃমিকীটের মতো “উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে” চেয়ে থাকে মানুষের মতো নগণ্য জীবদের প্রতি। আর মানুষ সেখানে অসহায় – পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোই তার কাজ, এইসব অতি ভয়ানক বিভীষিকাকে এড়িয়ে কিভাবে বাঁচা যায়, সেই আতঙ্কেই সে আধখানা হয়ে আছে!” (সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, এইচ পি লাভক্র্যাফট - জীবন ও সাহিত্য) সেরকমই এক ভিন্নধর্মী হররের সাবজনরা হলো সাইকোলজিকাল হরর, যেখানে ভূতের অস্তিত্বের থেকে বড় হয়ে ওঠে ভয়। এমন এক আতঙ্কময় পরিবেশ তৈরী হয়, যা মানসিকভাবে পাঠকদের অবশ করে দেয়।

প্রতিটি লেখাকে ‘লাভক্রফটিয়ান হরর’ বা ‘সাইকোলজিকাল হরর’ আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়েছে পাঠকের সুবিধার্থে। পাঠকদের মতামত এক্ষেত্রে যে খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলাই বাহুল্য। কাজেই ভালো লেগেছে, খারাপ লেগেছে বা মনে দাগ কাটেনি, যে কোনো ধরণের মতামত আমাদের জানাতে ভুলবেন না। আমরা ধন্যবাদ জানাই সমস্ত লেখক ও শিল্পীকে, যাঁদের একের পর এক অসাধারণ কাজে এই সংখ্যা সেজে উঠেছে।

তাহলে আর দেরি কীসের, আতঙ্কের সমুদ্রে ডুব দিন। যাত্রা শুভ হোক!

ধন্যবাদান্তে,

অ্যাপোক্যালিপ্স - লুৎফুল কায়সার

স্বপ্ন

ছোট্ট একটা নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে ফারহান। চারদিকে অথৈ সাগর। কালো রাতের আকাশটাকে খুবই বিষণ্ণ লাগছে।

ফারহান জানে না সে এখানে কী করে এলো! আর এসব চিন্তা করার মতো শক্তিও ওর নেই।

শুধুই চেয়ে আছে সে। সামনের দিকে, নিঃসীম আকাশের দিকে...

গাছপাথর - দেবলীনা চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ - প্রতিম দাস

বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসেছিলেন অনন্তবাবু, “আরে মশাই হয় হয়! এ দুনিয়ায় সবই হয়।” আর ঝট করে আমার মনে পড়ে গেছিল ঝুরিদিদার কথা।

আমার ঝুরিদিদা। বাতাসের গায়ে আঁকিবুকি কেটে,কখনো বা খলখল করে হেসে গড়িয়ে পড়ত,কখনো বা মেয়েদের ইস্কুলের বড়দিদিমণির মতো কোমরে হাত দিয়ে কাদের যেন বকাঝকাও করত। আশেপাশের যত অদেখা, অজানা জিনিসের হদিশ ছিল ঝুরিদিদার কাছে। লোকে অবশ্য আড়ালে পাগলী বলত।

প্রত্যাবর্তন - জাকিউল অন্তু

অলংকরণ - প্রতিম দাস

প্রচণ্ড মিউ মিউ শব্দে আমার চটকা ভাঙলো৷ গাড়ির পেছনের সিটে আমার কোলের ওপর বসে আছে ফেলিক্স৷ আমার পোষা বেড়াল৷ বয়স তিন মাস৷ ভীষণ আদুরে আর বেশ ভীতু৷

গাড়ি চালাচ্ছিলো আমার অফিসের বন্ধু তন্ময়৷ গাড়িতে যাত্রী মাত্র তিনজন৷ আমি, তন্ময় আর ফেলিক্স৷ আমি ফেলিক্সকে কোলে নিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসেছিলাম কিন্তু ঘুমে চোখ লেগে আসায় একটু পেছনে এসেছি ঘন্টাখানেক হলো৷

আশ্রয়ের আঁধার - তানজিরুল ইসলাম

অলংকরণ - পার্থ মুখার্জী

ভয়...

ভয় মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি। ভয় একটা মানুষকে ভেতরে ভেতরে মেরে ফেলতে পারে। মানুষটার অস্তিত্বকে করে তুলতে পারে দুর্বিষহ।

দুর্ভাগ্য যে, নিউ কলকাতা চাইল্ড হোমের বাচ্চাগুলোর নিত্যসঙ্গী এই অনুভূতিটাই।

নিশি-যাপন - সম্বুদ্ধ সান্যাল

অলংকরণ - মিশন মন্ডল

সন্ধ্যেবেলায় হেঁটে ফেরার পথে পাড়ার মুখে হরেনদার চায়ের দোকানের সামনেটা বড়ই থমথমে লাগলো অম্বিকার। একেবারে ফাঁকা নয়, তবে অন্যদিন জমজমাট হৈচৈ অনেক বেশি থাকে। দোকানের ভিতরে একটা টিভি সেটকে নিয়ে বেশিরভাগ জটলা।

পুতুল - বিভাবসু দে

অলংকরণ - প্রতিম দাস
বি. দ্র.- এই লেখার কিছু অংশের বিবরণ ও ভাষা সব ধরণের পাঠকের উপযুক্ত নয়।

আমার আর রাস্তা নেই। আমি জানি, আমি চাইলেও পালাতে পারব না। ওই অশুভ অলীক মায়াজাল কেটে বেরোবার কোনও পথ নেই। বড় ভয় হয়। ওর ঠান্ডা শরীরটা যখন অক্টপাসের মতো আস্তে আস্তে জড়িয়ে ধরে আমার বিবস্ত্র শরীরটাকে, আতঙ্কে কুঁকড়ে যাই।

কুয়াশার আড়ালে - সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

অলংকরণ - মিশন মন্ডল

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সূঁচের মত চোখে-মুখে এসে ফুটছে। হাতের কালো ছাতাটা খুলেই ফেললাম। কালো রংটা আমার ভীষণ পছন্দের। এই যে মেঘলা বিকেলটা আস্তে আস্তে রাতের কালো আঁধারে ঢুবে যাবে একটু পরে আমার তখন বেশ আরামবোধ হবে। রাত যত ঘন হয়ে আসে প্রকৃতি রাতের চাদরে আরও এক পোঁচ করে আলকাতরা মাখায় তখন আমার মনে বেশ শান্তি আসে। অথচ বেশিরভাগ মানুষকে দেখো অন্ধকারকে ভয় পায় যেন রূপকথার গল্পের সেই দাঁতওয়ালা বিশাল দৈত্য যে হাঁ করে গিলে খেতে আসছে। অন্ধকারের তো অনেক সুবিধা। কেউ আমাকে দেখতে পাবে না, আমি কাউকে দেখতে পাবো না বেশ একটা লুকোচুরি খেলা। এই যেমন সেই লোকটা আজ কদিন ধরে আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি সে আমাকে অনুসরণ করছে প্রতি মুহূর্তে কিন্তু আমাকে দেখা দিচ্ছে না। আমার সামনে আসছে না। বৃষ্টির গতি বাড়ছে পাল্লা দিয়ে আমিও হাঁটার গতি বাড়ালাম। সামনের ওই ইউয়ের মত বাঁকটা পেরিয়ে আর একটু এগিয়ে গেলেই পাহাড়ের ঢালে আমার ছোট্ট আস্তানা। বাঁকটা পেরোতেই ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে এল। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই আমার ইন্দ্রিয়গুলো আজকাল ছটফট করে উঠছে। অন্ধকার যত বাড়তে থাকে ওরা যেন শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। আমাকে ইশারায় অনেককিছু বোঝাতে চায়, অনেক অনেক কিছু বুঝতে পারে ওরা। ওরা আমাকে বলছে সেই লোকটা আবার এসেছে। বাঁকটা পেরনোর পর থেকেই আমার পেছনে পেছনে আসছে। তাকিয়ে লাভ নেই বৃষ্টির সন্ধ্যায় এইসব পাহাড়ী এলাকায় দৃশ্যমানতা প্রায় শূন্যের নিচে নেমে যায়।

 

ঘরে ঢোকার আগে একবার পেছনে তাকালাম। অন্ধকারের মধ্যেও অনুভব করলাম লোকটা ওই রাস্তার উল্টো দিকে যে বড় পাইন গাছটা আকাশের পানে হাত বাড়াচ্ছে তার নীচে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার তালাটা খুলে ভেতরে ঢুকে আলোটা জ্বালালাম। জামাকাপড় ছেড়ে এককাপ চা বানালাম। আয়েশ করে চায়ে প্রথম চুমুকটা দেবার সঙ্গে সঙ্গে দপ করে আলোটা নিভে গেল। লোডশেডিং এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এই ক'বছরে অভ্যেস হয়ে গেছে তাই মোমবাতিটা জ্বালাতে বেশিসময় লাগলো না আমার। রুটি কিনে নিয়ে চলে এসেছি তাই আর ঝুট-ঝামেলা নেই। এমনিতেই এই শহরটা খুব ছোট তারওপর আমার আস্তানাটা শহর ছাড়িয়ে একটু ফাঁকার দিকে তাই অকারণ কোলাহল কোনও সময়ই নেই আর এই মুহূর্তে তো হাফ কিলোমিটারের মধ্যে ছায়া-আবছায়া মাখা পাইনবন, কালো আকাশের বুক চিরে নেমে আসা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ আর আলো-আঁধারীর মধ্যে চুপচাপ বসে থাকা আমি ছাড়া আর কেউ নেই। একটু ভুল বললাম আছে আরেকজন আছে। প্রবল ভাবে তার অস্তিত্ব অনুভব করছি আমি। একটু আগে বললাম না আমার ইন্দ্রিয়গুলো আস্তে আস্তে জেগে ওঠে। ওরাই আমাকে বলছে লোকটা এখন আমার কাঠের বারান্দার নীচ থেকে যে পাথুরে ধাপগুলো বড়রাস্তায় নেমে গেছে তার ঠিক পাঁচ নম্বর ধাপটায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘটনাটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে ঠিক দশ দিন আগে। সেদিন দুপুরের পর থেকে আমার কোনও কাজ ছিল না। সকালে একটা পর্যটকদের দলকে লেক আর ছোটি পাহাড়ীর ঝর্ণা থেকে ঘুরিয়ে এনেই আমার ডিউটি শেষ হয়ে গিয়েছিল। বুড়ো নরেশ তামাং আমার পাওনা টাকাটাও দিয়ে দিয়েছিল। আমার কোনও বন্ধু-বান্ধব নেই, বস্তুত প্রয়োজন ছাড়া আমি কারুর সাথে কথাবার্তা খুব একটা বলি না। একলা থাকাই আমার বেশি পছন্দের তাই বিকেলের দিকে আপন মনে হাঁটতে হাঁটতে ওপরের জঙ্গলের দিকে চলে গিয়েছিলাম। এদিকটা অন্যরা এড়িয়েই চলে। জঙ্গলের একটু ভেতরে একটা ভাঙ্গা বাংলো মতন বাড়ি আছে। মালিক কে বা কে ছিল তা সকলের অজানা। স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস ওর ভেতরে নাকি পাতালপুরীতে যাবার রাস্তা আছে। আমি একটা ব্যাপার বেশ বুঝতে পারি ভয় জিনিসটার আমার শরীরে-মনে কোথাও স্থান নেই। যা কিছু ভয়ানক, নিষিদ্ধ তা আমার মধ্যে দুর্নিবার আকর্ষণের সৃষ্টি করে। অনেকদিন ধরেই ওই বাংলোয় যাব ভাবছিলাম কিন্তু গ্রাসচ্ছাদনের ব্যবস্থা করতে করতে সময় হচ্ছিল না। বাংলোর সামনে পৌঁছতে খুব একটা কষ্ট হলো না। একবার চোখ তুলে বাংলোটা দেখলাম। গায়ে জমে থাকা পুরু শ্যওলার আস্তরণ তার প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য বহন করছে। এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। ঠিক তখনই দুর্ঘটনাটা ঘটল। অসাবধানতাবশত একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়লাম। মাথাটা জোরে ঠুকে গেল বাংলোর সামনের একটা ভাঙা সিমেন্টের বেঞ্চিতে। চোখে অন্ধকার নেমে এল। যখন জ্ঞান ফিরলো প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। সাহসের অভাব না থাকলেও যখন দেখলাম হাতের টর্চটা ছিটকে পড়ে ভেঙে গেছে, ফিরে আসা মনস্থ করলাম। তখনও মাথাটা টনটন করছিল। ফিরতি পথে কিছুদূর আসার পরই প্রথম ওই লোকটার অস্তিত্ব অনুভুত হয়। কালো প্যান্ট আর বড় কালো হুডওয়ালা হাঁটু নিচ পর্যন্ত ঝোলা একটা বর্ষাতি পরে থাকে। মুখটা দেখা যায় না। আমি পেছন ফিরলেই চকিতে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেদিনের কথা আমি কাউকে বলিনি আর বলতামই বা কাকে। ওইখানে মরে পড়ে থাকলেও কেউ জানতে পারতো না। কাজে না গেলে বুড়ো তামাং হয়ত খোঁজ করতো আর তার কাছ থেকে ফাদার জোসের কাছে খবর গেলে তিনি হয়ত একটু ভাবতেন আমাকে নিয়ে এই যা। যাই হোক মূল কথা হলো তারপর থেকে লোকটা আমাকে ক্রমাগত অনুসরণ করছে।

 

বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো আমার বর্ষাতির গায়ে পিছলে যাচ্ছে। রাত প্রায় দেড়টা। সারা শহর ঘরের কোণে ঘুমিয়ে আছে। শুধু আমি বেরিয়ে পড়েছি বিশেষ এক উদ্দেশ্যে আর হ্যাঁ সেও আসছে ঠিক আমার পেছন পেছন। আগেই বলেছি ভয় জিনিসটা আমি ঠিক অনুভব করতে পারি না, তাই তো পেরেছি এই দুর্যোগের রাতে পিচ্ছিল পাহাড়ী পথে একলা নিজের অভীষ্ট সিদ্ধ করতে বেরিয়ে পড়তে। প্রায় এক কিলোমিটার মত হেঁটে এসে দাঁড়ালাম ‘টিউলিপ ভিলা’র সামনে। নামে ভিলা হলেও আদপে সামনে অনেকখানি বাগান ঘেরা ছোট্ট একতলা বাড়ি। বাগানের একধারে নতুন কনস্ট্রাকশনের কাজ চলছে। নিঃসন্তান বিধবা মিসেস পল গরীব ছাত্রছাত্রীদের জন্য কী একটা যেন বানাবে। এখানে কেউ বাগানের গেটে তালা দিয়ে রাখে না তাই অতি সহজেই ঢুকে গেলাম ভেতরে। আমার থেকে একটু দূরে সেও দাঁড়িয়ে আছে। এবার আমাকে ভেতরে ঢুকতে হবে।

 

মিসেস পলের শোবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। ঘরের মধ্যে নাইট ল্যাম্পের মৃদু আলো। সত্যিই আমি ভাবতে পারিনি এত সহজে পেছনের দরজার লকটা নষ্ট করে আমি ঢুকে পড়তে পারবো। আমার ইন্দ্রিয়গুলোর সাথে সাথে আমার মস্তিষ্ক আর বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোও সময় বিশেষে অতি সক্রিয় হয়ে উঠছে। আমাকে মুহূর্তে মুহূর্তে সংকেত পাঠাচ্ছে আমার করণীয় সম্বন্ধে। এখন যেমন পাঠালো। বুড়িটার ঘুম বোধহয় খুব পাতলা। আমি এসে দাঁড়ানোর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসেছে। চশমা ছাড়া বুড়ি চোখে ভালো না দেখলেও দরজায় আমার দীর্ঘ অবয়বটা ওর দৃষ্টি এড়ায়নি। শুধু একবার “কে ওখানে?” বলে চিৎকার করার সুযোগ পেয়েছিল তারপরই আমি সংকেত পেয়ে গেলাম। সত্যিই সেদিনের পর থেকে আমি অসাধারণ হয়ে উঠছি। বুড়িটাকে শেষ করে ফেললাম অতি সহজেই তারপর আলমারীর চাবি খুঁজে এক লাখ টাকার বান্ডিলটা নিয়ে বেরিয়ে এলাম।

চাবি খুলে ঘরে ঢোকার আগে পেছন ফিরে তাকালাম। নাহ, আজ সে সরে গেল না। পাথুরে ধাপগুলোয় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠলো। বিদ্যুতের চকিত আলোয় দেখলাম তার মাথার হুডটা খোলা, হাতে বিশেষ মুদ্রা ভঙ্গি সাইন অফ হর্নস, শয়তানের চিহ্ন। তার মুখটা ভীষণ চেনা লাগছে আমার। মাথার মধ্যে একটা নাম আছড়ে পড়ল, নাগেশ ত্রিপাঠি। কিন্তু এই নামটা তো মুছে গেছে। মাথাটা ভারী হয়ে আসছে আর কিছু মনে পড়ছে না। সেও কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে গেল। টলতে টলতে ঘরে ঢুকে পড়লাম।

সারা শহর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। গতরাতে মিসেস পলকে কেউ নৃশংসভাবে হত্যা করে আলমারী খুলে টাকা লুঠ করেছে। বিল্ডিং কন্ট্রাক্টরকে দেওয়ার জন্য একলাখ টাকা রাখা ছিল বাড়িতে। কাল বিকেলে পেমেন্ট করার কথা কিন্তু ওই লোকটি অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে সমতলে নেমে যাওয়ায় পেমেন্ট করা হয়নি। এই কথাটা জানতে পেরেই তো…। আমার অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের মত আমার কানটাও আজকাল সজাগ হয়ে উঠেছে। ঠিক সময়ে লোকজনের কথাবার্তার মধ্য থেকে দরকারি কথাটা শুষে নিয়ে আমার মস্তিষ্কে চালান করে দেয়। গতকাল ফিরে আসার পর বাকি রাতটা বেশ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। বুঝতে পারছিলাম ও চলে গিয়েছিল। একটু বেলা করে উঠে জলখাবার খেয়ে অন্যান্য দিনের মতই কাজে চলে গেলাম। সারাদিন আমার বেশ আনন্দেই কাটলো। মিসেস পলের মৃত্যুর বীভৎসতা দেখে সারা শহর আতঙ্কিত। বুড়ির গলা কেটেই ক্ষান্ত হয়নি আততায়ী। পেটের মধ্যে ছুরি ঢুকিয়ে প্রায় বার দশেক কুপিয়েছে। তারপর বুড়ির রক্ত দিয়েই মেঝেতে লিখে দিয়েছে ‘666’, দি নাম্বার অফ বিস্ট। পুলিশ কোনও কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। সবাই বলছে এমন পাশবিক ঘটনা স্মরণাতীত কালে এ শহর দেখেনি। বিছানাটা সারারাত ধরে বুড়ির রক্ত চুষে লাল হয়ে শুয়েছিল।

বুড়ো তামাংকে গাড়ির চাবি ফেরত দেবার সময় বুড়ো আমাকে সাবধান করল। একা নির্জন জায়গায় থাকি তো তাই। সন্ধ্যে নেমে আসছে। হঠাৎ করে একটা মেঘ এসে পরিবেশটাকে এক রহস্যময়ী নারীর রূপ দিয়েছে। বাঁকটা পেরনোর একটু আগে আমি নতুন আগন্তুকের দেখা পেলাম। গাঢ় লাল রঙের প্যান্ট আর রক্ত লাল হুড তোলা জ্যাকেট। অবশ্যই আগের জনের মত ক্ষণিক তার উপস্থিতি যেন আমাকে শুধু বুঝিয়ে দেওয়া, সে আছে ঠিক আমার পেছনে। আগের জনের বেলায় মনের মধ্যে একটা চিন্তা ঘুরপাক খেতো কিন্তু আজ আমি বোধহয় একটু খুশিই হলাম। নতুন আগন্তুকের আবির্ভাবটাই যেন ভবিতব্য ছিল। আমার নিজের প্রতি একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। আমি যেন একটা শীতঘুম ভেঙে জেগে ওঠা অজগর যে আস্তে আস্তে খোলস ছাড়ছে।

 

মিসেস পলের ঘটনার পর দিন পনের কেটে গেছে। পুলিশ কোনও কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। হত্যাকারী নাকি খুব বুদ্ধিমান। নিজের পেছনে একটাও সূত্র ফেলে যায়নি। আমি নিশ্চিন্তেই আছি আর সেও আছে প্রতি মুহূর্তে--- কখনও ওই পাইনবনের আড়ালে, কখনও পাহাড়ের বাঁকে, কখনও আমার ঠিক পেছনে হেঁটে আসে। আবার আমি যখন ঘরে ঢুকে যাই দাঁড়িয়ে থাকে ওই পাথুরে ধাপে। সে নির্বাক, তার উপস্থিতি নীরব, কুয়াশার আড়ালে তার অস্তিত্ব তবুও সে আছে। প্রবলভাবে আছে।

মেয়েটা আমার চেয়ে বয়সে একটু বড়ই হবে। ওর বন্ধু-বান্ধবীদের দলটার আলোচনা থেকেই শুনলাম নিজের শর্তে বাঁচে তাই বিয়ে-থা করেনি। মোটা মাইনের চাকরী করে। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। নিঃসন্দেহে দুঃসাহসী। ওর বন্ধুরা যখন যুগলে যুগলে ফটো তুলতে কিংবা বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ঝর্নার জলে হাত ভেজাতে ব্যস্ত তখন চুপিচুপি আমার কাছে এসে ওপরের জঙ্গলের ভাঙা বাংলোর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিচ্ছিল। হোটেলের কোনও বেয়ারার কাছে শুনেছে। আমিও বেশ গুছিয়ে পাতালপুরীর মিথটা শুনিয়ে দিলাম। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছিল এ মেয়ে এবার আমার হাতের পুতুল। বাস্তবে ঘটলও তাই। লুকিয়ে আমার হাতে একটা নোট ধরিয়ে আবদার করল তাকে ভাঙা বাংলোয় নিয়ে যেতে হবে। যাওয়ার সময় আরো পার্স খালি করবে। ব্যস তৈরী হয়ে গেল আমাদের গোপন অভিযানের প্ল্যান। আমার শর্ত হলো কাউকে জানানো চলবে না। ওদিকে তো কেউ যায় না তাই। সেও বলল তার বন্ধুরা যেন না জানে তাহলে যেতে দেবে না।

 

দূর থেকেই দেখতে পেলাম নির্দিষ্ট জায়গায় সে মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকটা কুয়াশায় ঢাকা। কুয়াশাকে সঙ্গী করেই আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম। একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে আমার অনুসরণকারী যথারীতি আমার পেছনে পেছনে চলেছে। মেয়েটা কিন্তু ওর উপস্থিতি সম্বন্ধে অজ্ঞ। এসে পৌঁছলাম ভাঙা বাংলো চত্বরে। মেয়েটা এমন ভাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো যেন সামনে তাজমহল দেখছে। অবশ্য যারা ছকভাঙা হয় তাদের উপলব্ধিগুলোও অন্যরকম হয়। মেয়েটা আমার দিকে ঘুরে বলল, “চল ভেতরে ঢুকি।”

“চলুন।”

বাংলোর প্রথম ঘরটাই বড় একটা হলঘরের মত। ভাঙা জানালা দিয়ে হালকা হালকা কুয়াশা ঢুকছে। ঘরের মধ্যে বিশেষ কিছু নেই। পশ্চিম দিকের দেওয়ালে মাকড়শার জালে আর ঝুলে বন্দি ছবির মত কিছু একটা। মেয়েটা এগিয়ে গেল সেদিকে। পেছনে আমি।

“আঁক।” ধপ করে একটা শব্দ তারপর আবার অখণ্ড নিস্তব্ধতা।

ও ভাবতেই পারেনি আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে যে লাঠিটা এনেছিলাম সেটার প্রয়োগ ওর মাথার খুলির ওপর করব। ওর পার্স, দামী ফোন, হাতঘড়ি এসবের চেয়েও মূল্যবান জিনিসে আমার লক্ষ্য। এই মুহূর্তে আমার সামনে শায়িত জীবন্ত কিংবা মৃত খাজুরাহ। বেঁচে আছে কি মারা গেছে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। শেষ পর্যন্ত তো ওকে পৃথিবীর মায়া কাটাতেই হবে। আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বহুদিন অভুক্ত আছি। আমার দাঁত-নখের আঘাতে পর্বত থেকে গড়িয়ে পড়ল শোনিত ধারা। পাহাড়-পর্বত, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমি পৌঁছলাম সুড়ঙ্গ মুখে। নিজের ক্ষুধা নিবৃত্তির মধ্যেও আমি লক্ষ্য রেখেছি টকটকে লাল জ্যাকেট পরে সে দাঁড়িয়ে আছে বাইরের ভাঙা সিমেন্টের বেঞ্চিটার কাছে। সমস্ত কাজ শেষ করতে সন্ধ্যে নেমে গেল। দীর্ঘদিন উপবাসের পর আজ পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত করলাম নিজেকে। একটু একটু ক্লান্তি গ্রাস করছে তাই পাতালপুরীর পথের সন্ধান এবারও অসমাপ্ত রেখে ফিরতি রাস্তা ধরলাম।

 

দরজার চাবিটা খুলে পেছন ফিরে তাকালাম। কে যেন আমায় সংকেত পাঠাচ্ছিল আজ সে তার পরিচয় দেবে। কুয়াশার মধ্যেও আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম তার হুড খোলা চেহারাটা। হাতে সেই একই মুদ্রা, সাইন অফ হর্নস। ফ্রাঙ্কো ডিসুজা, ফ্রাঙ্কো ডিসুজা। মাথার মধ্যে নামটা ঘুরপাক খেতে লাগলো কিন্তু তার অস্তিত্বও তো শেষ হয়ে গেছে। সেদিনের মত মাথাটা ভারী হয়ে গেল। স্মৃতির পাতা আবার কুয়াশার চাদরে ঢেকে গেল। ভেতরে ঢুকে বিছানায় শুতেই নিশ্চিন্ত ঘুম নেমে এল দুচোখে।

 

পুরো শহর আতঙ্কে কাঁপছে। মহিলা পর্যটক রাহী দেবের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে ভাঙা বাংলো থেকে। রাহী হঠাৎই দুপুরের দিকে কাউকে কিছু না বলে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ওর দলের বাকিরা তখন যে যার মত বিশ্রাম নিচ্ছিল ঘরে। তারপর থেকে তিনদিন রাহী নিখোঁজ ছিল। কোথাও তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পুলিশ এসে কত জিজ্ঞাসাবাদ করল। আমাকেও ডেকেছিল। সকালে গাড়ি নিয়ে ওদের সাথে আমিই গিয়েছিলাম কিনা। তবে আমাকে বেশি কিছু বলেনি। রাহীর দলের কেউ খেয়ালই করেনি যে রাহী আমার সাথে চুপিচুপি কথা বলেছে। তাছাড়া ওদের নিয়ে এসে আমি বুড়ো তামাংকে চাবি ফেরত দিয়ে শান্তশিষ্ট ছেলের মত বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিলাম ,এঘটনার সাক্ষী অনেক। প্রথমে সবাই ভাবছিল নিজের ইচ্ছেয় কোথাও গেছে কিন্তু তিনদিনেও না ফিরতে আর ফোন নট রিচরবল বলছে তখন জোরদার তল্লাসী শুরু হতে ভাঙা বাংলো থেকে রাহীর সম্পূর্ণ নগ্ন দেহ আবিষ্কৃত হল। ফোনটা শুধু ভাঙা ছিল বাকি সব জিনিস পত্র অক্ষত। ফরেনসিক রিপোর্ট অনুযায়ী আগে মাথায় আঘাত করে খুন করে মৃতদেহের ওপর অকথ্য যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে। সবশেষে রাহীর বুক থেকে নাভী পর্যন্ত ধারালো কোনও অস্ত্র দিয়ে লম্বালম্বি চিরে আবার পেটের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্ত পর্যন্ত চিরেছে। দেখতে অনেকটা উল্টানো ক্রুশের মত। উল্টানো ক্রুশ শয়তানের চিহ্ন। পুলিশের ধারণা মিসেস পলের হত্যাকারী আর রাহীর হত্যাকারী একই ব্যক্তি কারণ সে শয়তানের চিহ্ন ছেড়ে যায় আর নিপুণ দক্ষতায় নিজের অপরাধের প্রমাণ লোপাট করে দেয়। পুলিশ এবারেরও আততায়ীর সম্বন্ধে সামান্যতম আভাষটুকু পেতে ব্যর্থ। আমি মাঝে মাঝেই নিজের মধ্যে একটা তুরীয় আনন্দ অনুভব করছি। শহরবাসী ভাবছে ভাঙা বাংলোর পাতালপুরীর রাস্তা দিয়ে শয়তান উঠে এসে এসব নারকীয় ঘটনা ঘটাচ্ছে। একটা কথা বলা হয়নি, সেদিনের পর থেকে সে আর আসেনি। আমি এখন নতুন আগন্তুকের অপেক্ষায় আছি।

 

প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বিছানা ছেড়ে জানালা বন্ধ করতে যেতেই দেখতে পেলাম তাকে। দাঁড়িয়ে আছে জানালা থেকে একটু দূরে। ঝলসানো বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম হাতকাটা কালো জ্যাকেট আর কালো ট্রাউজার পরনে। চেহারাটা হুড দিয়ে আড়াল করা। হাতের বলিষ্ঠ পেশীর ওপর একটা শিংওয়ালা ছাগলের মাথার ট্যাটু করা। শয়তানের নিদর্শন। নিঃশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমি নিশ্চিন্ত হলাম। আমার ইন্দ্রিয়গুলো অস্থির হয়ে উঠছিল এ কদিন। তারাও শান্ত হয়ে গেল।

 

দূর থেকেই দেখতে পেলাম ফাদার জোসকে। একলা বসে আছেন। দৃষ্টি আকাশের দিকে নিবদ্ধ। রাহীর মৃত্যুর পর পর্যটক আসা একটু কমে গেছে তাই সবসময় কাজ থাকে না। আমিও আপন মনে এদিক সেদিক ঘুরি আর আমাকে অনুসরণ করে ট্যাটুধারী। আমার বেশ মজা লাগে। আজকাল ওর অস্তিত্ব আমি উপভোগ করি। যদিও কোনও মানুষের প্রতিই আমি কোনওরকম টান অনুভব করি না তাও ফাদারের দিকে এগিয়ে গেলাম। হাজার হলেও আমাকে এশহরে ঠাঁই দেওয়া, কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া, আস্তানা জোগাড় করে দেওয়া সবেতেই ফাদারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

“হ্যালো, ফাদার।”

“আঁ, হ্যালো, হ্যালো।” ফাদার আমাকে দেখে চমকে উঠলেন।

“এনি প্রবলেম ফাদার? আপনাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে।”

ফাদার আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আস্তে করে বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোমায়?”

“কী ফাদার?”

“তোমার সাথে কি সেদিন রাহী নামের মেয়েটির দেখা হয়েছিল?” বুকের ভেতরে অশনি সংকেত কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশ করা চলবে না তাই স্বাভাবিকভাবে উত্তর দিলাম, “হ্যাঁ, দেখা হয়েছিল তো। ওদের দলটা আমার গাড়িতেই তো সকালে ঘুরতে গিয়েছিল।” ফাদার সন্দিগ্ধ চোখে একবার আমাকে জরিপ করে বললেন, “সে কথা আমি জানি। আমি বলছি সেদিন বিকেলের কথা।” ফাদার একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। অস্বস্তি করছে তাও নিজেকে যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বললাম, “না, ফাদার আর ওই মেয়েটির সাথে আমার দেখা হয়নি।”

“সত্যি বলছ?” ফাদারের এমন কড়া গলা আমি এ কবছরে একবারও শুনিনি।

“আপনি কি আমায় অবিশ্বাস করছেন ফাদার?”

আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ফাদার পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “সেদিন বিকেলে জিন্স আর ব্লু সোয়েটার পরা মেয়েটি কে ছিল তোমার সাথে?” আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ফাদার মোক্ষম অস্ত্রটা প্রয়োগ করলেন, “সেদিন আমি ডিমনা বস্তিতে কিছু ওষুধপত্র দিতে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় ওখান থেকে পাহাড়ের ওপর দিকে যে পায়ে হাঁটা শর্টকার্ট রাস্তাটা আছে সেটা ধরেছিলাম। তখনই আমি নীচে তোমায় দেখি সাথে একটি মেয়ে। তোমরা অন্য রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলে তাই আর আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। মেয়েটি আমার অচেনা কিন্তু তোমায় চিনতে আমার ভুল হয়নি।” আমার ভীষণ জিগ্যেস করতে ইচ্ছে করছিল যে পেছনে আর একজন ছিল, তাকে কি ফাদার দেখতে পেয়েছিলেন কিন্তু এখনকার মত সে প্রশ্ন মুলতুবি রেখে করুণ গলা করে বললাম,”সেই দেখার জন্য আপনি আমায় সন্দেহ করছেন ফাদার? আপনি?”

“সন্দেহ করার যে অনেক কারণ আছে মাই চাইল্ড। আমার জানায় এ শহরে একজনই আছে যে ভাঙ্গা বাংলোর মিথটা বিশ্বাস করে না। তুমি আমার কাছে ওখানে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলে। রাহীর সাথে সেদিন সকালেই তোমার আলাপ হয়। আমি যতদূর জানি তুমি নির্বান্ধব। কারুর সাথে বিশেষ মেশো না। সেই তুমিই অকারণে একটি মেয়ের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছ এটা কি খুব স্বাভাবিক? ওই রাস্তা যে ওপরের জঙ্গলে যায় সেটা তোমারও অজানা নয়। তাছাড়া…।”

“তাছাড়া কি ফাদার?” আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠছে। আমার মস্তিষ্ক সংকেত পাঠাচ্ছে বিপদ আসন্ন।

“তোমার হাতের পেশীতে যেখানের চামড়াটা এক্সিডেন্টের সময় গাড়ির কাঁচ ঢুকে ফালা ফালা হয়ে গিয়েছিল সেখানে কি ছিল তোমার মনে আছে?”

“নাহ।” আস্তে করে ঘাড় নাড়ি আমি।

“সাইন অফ হর্নস। শিং ওয়ালা ছাগলের মাথার ট্যাটু। শয়তানের চিহ্ন। আর মিসেস পল আর রুহী দুজনের খুনীই অকুস্থলে শয়তানের চিহ্ন রেখে গেছে।” চমকে উঠলাম আমি। চোখের কোণা দিয়ে দেখলাম একটু দূরে বড় পাথরটার পাশে দাঁড়ানো তার হাতের মুদ্রায় সাইন অফ হর্নস। যেন সে কিছু বলতে চায়। ফাদার আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। ফাদার আবার মুখ খুললেন,”রূপেশ, আমি চাইলে পুলিশকে বলতে পারতাম কিন্তু কেন বলিনি জানো কারণ এটা শুধুই আমার সন্দেহ। আমি তো নিশ্চিত নই। আমি ভুলও হতে পারি। ভুল হলেই আমি খুশি হব। তুমি আমাকে বল মেয়েটি কে ছিল? আমি একবার মুখ খুললেই পুলিশ নিশ্চিতভাবে ধরে নেবে তুমিই খুনি কারণ তোমার অতীতটা কুয়াশায় ঢাকা। মাই চাইল্ড প্লীজ টেল মী দ্য ট্রুথ।”

আমার মধ্যেকার অজগরটা জেগে উঠছে। সে বুঝতে পারছে নিজে শিকার হবার আগেই শিকারীকে গিলে ফেলতে হবে। ফাদার গলায় ঝোলানো ক্রুশটা মুঠোয় নিয়ে আবেগ ভরা কণ্ঠে বলে চলেছেন,” যদি তুমি অপরাধী হও। নিজেকে আইনের হাতে সমর্পণ কর। ঈশ্বর তোমার সহায় হবেন।” আমার মস্তিষ্ক সংকেত দিচ্ছে, পাশেই অতল স্পর্শী খাদ, চারিদিক নির্জন, কুয়াশাচ্ছন্ন। ওই খাদের গহ্বরে কেউ একবার হারিয়ে গেলে আর...।

“কী করছ রূপেশ! নাহ।”

উফফ! শেষ মুহূর্তে ফাদার বুঝতে পেরে যাবেন ভাবিনি। ভেবেছিলাম আচমকা ধাক্কা দিয়ে দেব তার বদলে এখন ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে হচ্ছে। মৃত্যুকে সবাই ভয় পায়। ফাদারের মত পিছুটানহীন সন্ন্যাসী, সেও মরতে চায় না।

“ আ আ আ…।” চিৎকারটা পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার কানে ফিরে আসছে। এ কণ্ঠস্বর ফাদারের নয় আমার নিজের। কোথা থেকে একটা গুলি এসে আমার পিঠে লাগলো। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। ফাদার মুখ থুবড়ে পড়ে গেছেন। অনেক কষ্টে পেছন ফিরে তাকালাম। পিস্তল হাতে একটা লোক। তার পেছনে পুলিশ আর সেই সময়ই ট্যাটুধারীর হুডটা খুলে দিল।

দানিশ, দানিশ শেট্টি ওর নাম। কিন্তু ওই নাম তো শেষ হয়ে গেছে পঞ্চগনির পাহাড়ে। জন্ম নিয়েছে ডেভিল। ওই যে লোকটা পিস্তল হাতে এগিয়ে আসছে ওকেও ভীষণ চেনা লাগছে। ভীষণ। ওরা আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমাকে ধরতে। তার কাছ থেকে আমি ইশারা পেলাম।

 

অভিকর্ষজ বলের টানে আমার শরীরটা দ্রুত নেমে যাচ্ছে ওই খাদের নিঃসীম কালো অন্ধকারে। সেই সঙ্গে বিস্মৃতির কুয়াশা সরিয়ে আমার মাথার মধ্যে আঘাত করছে আমার অতীত। ওই পাতাল গহ্বরে নিঃশেষ হয়ে যাবার আগে আমি জেনে গেলাম কে আমি।

 

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ইকবাল খান। এখনও এ শহর ছাড়েননি তিনি। এখানে একটা ছোট সরকারি রেস্ট হাউস আছে সেখানেই আছেন। লোডশেডিং হয়ে গেছে। রেস্ট হাউসে বিকল্প কোনও ব্যবস্থা না থাকায় অগত্যা মোমবাতিই ভরসা। মোমবাতির শিখাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে স্মৃতি চারণ করে চলেছেন। মুম্বই পুলিশের দোর্দণ্ডপ্রতাপ অফিসার তিনি। সারাজীবনে তাঁর সাফল্যের হার প্রায় নিরানব্বই শতাংশ। বাকি এক শতাংশের কারণ ছিল দানিশ শেট্টি ওরফে ডেভিল। দানিশের জন্ম মুম্বাইয়ের এক বস্তিতে। বাবা ধীরু শেট্টি ছিল নামকরা পকেটমার। মাও তথৈবচ। ছোট থেকেই বিভিন্ন অপরাধে হাতেখড়ি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকে। একসময় সে কন্ট্রাক্ট কিলার হিসেবে কাজ শুরু করে। দানিশের প্রকৃতি ছিল ভয়ংকর। নৃশংসভাবে খুন করতে পছন্দ করত সে। মা-বাবার মত খুচরো পকেটমারীতে তার কোনও আগ্রহ ছিল না। তার লক্ষ্য ছিল অনেক বড়। একটা ব্যাপার ছিল, দানিশ বেশি লোকজন নিয়ে কোনও কাজ করত না। বস্তুত সে কাউকে খুব একটা ভরসা করত না। বিশেষ বন্ধু-বান্ধবও তার ছিল না। যে কারণে তার সম্বন্ধে তথ্য জোগাড় করতে বেশ বেগ পেতে হতো পুলিশকে। দানিশ মুম্বাইতে শেষ খুনটা করে এক ব্যবসায়ীকে। খুন করে পাঁচলাখ টাকা নিয়ে পালায়। ওই খুনের পর ওর খোঁজ পেতে ওর বাবাকে পুলিশ তুলে আনে কিন্তু লাভ কিছু হয়নি। ততদিনে ওর মা ক্যান্সারে মারা গেছে। দানিশ এতটাই হিংস্র মনের অধিকারী যে ও যখন বুঝতে পারে ওর বাবা ওর সমস্যার কারণ হতে পারে তখন পঞ্চগনির পাহাড়ে নিয়ে গিয়ে ওর বাবাকে খাদে ফেলে দেয় আর নিজের পিতৃদত্ত নাম ত্যাগ করে অপরাধ জগতে নিজের পরিচয় দিতে থাকে ডেভিল নামে। ক্ষুরধার বুদ্ধি আর উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাসের মিশেল ছিল ডেভিল। সেইসাথে ছিল আইনের রক্ষকদের প্রতি তাচ্ছিল্য। অপরাধের নতুন পন্থা নেয় ডেভিল। নতুন নতুন নাম নিয়ে নতুন নতুন শহরে গিয়ে অপরাধ করতে থাকে সে। এমন ভাবে সাধারণ মানুষের মত থাকত যে চট করে ভয়ঙ্কর অপরাধী হিসেবে তাকে শনাক্ত করা মুশকিল। একটা শহরে বছরখানেকের বেশি থাকতো না সে। ভয় জিনিসটা ডেভিলের রক্তে ছিটেফোঁটাও ছিল না। নাগেশ ত্রিপাঠি নাম নিয়ে ভূপাল শহরে কিছুদিন ছিল। যখন বুঝতে পারলো এই ছদ্মবেশ বেশিদিন চলবে না তখন এক ধনী বৃদ্ধকে খুন করে প্রায় কোটি টাকার গয়না নিয়ে সেখান থেকে কর্পূরের মত উবে যায়। ভূপালে এই শেষ অপরাধ করে সেই বৃদ্ধের মৃতদেহের পাশে 666 লিখে রেখে যায় ডেভিলের চিহ্নস্বরূপ। আসলে বারবার ডেভিল পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে কিন্তু পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। ফ্রাঙ্কো নাম নিয়ে গোয়ায় থাকাকালীন সর্বশেষ খুন করে এক বিদেশিনী মহিলাকে। খুন করে ধর্ষণ করে তার পেটে উল্টানো ক্রুশ এঁকে ফ্যাঙ্কোর ছদ্মবেশও শেষ করে ডেভিল। সে নিজের অপরাধ লুকোনোর বদলে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বারবার উধাও হয়ে গেছে। ইকবালের আর পাঁচবছর চাকরী আছে। অকৃতদার মানুষটার ধ্যানজ্ঞান হলো তাঁর ডিউটি। গত দশ বছরে বুনোহাঁসের মত ধাওয়া করেছেন ডেভিলকে কিন্তু বারবার সে ধোঁকা দিয়েছে ইকবালকে। ডেভিলের সর্বশেষ ছদ্মবেশ ছিল রূপেশ কুমার। বিদেশিনী হত্যাকাণ্ডের জের অনেক বেশি ছিল বলেই সে বোধহয় উত্তরবঙ্গের পাহাড়ে পালিয়ে এসেছিল। এন.জে. পি স্টেশন থেকে ফাদার জোসের সাথে শেয়ারের গাড়িতে চেপেছিল সে। গাড়িটার এক্সিডেন্ট হয়। সৌভাগ্যক্রমে ফাদার শুধু হাত ভেঙ্গে রক্ষা পান। ড্রাইভার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় আর ডেভিল ওরফে রূপেশ সারা শরীরে আর মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে হসপিটালে ভর্তি হয়। ফাদার জোসের কথা অনুযায়ী ডেভিল তার স্মৃতি হারিয়েছিল। তার একটা ব্যাগে রূপেশ কুমার নাম আর পাটনার একটা অনাথ আশ্রমের নাম পান ফাদার। সেখানে যোগাযোগ করে দেখেন সে আশ্রম উঠে গেছে। আসলে ডেভিল প্রতিবারই নিজের ছদ্মপরিচয় তৈরি করত খুব চালাকির সঙ্গে যাতে কেউ ধরতে না পারে। যাইহোক রূপেশ কুমারের পূর্ব পরিচয় কিছু জানতে না পেরে ফাদার ধরে নেন সে অনাথ। ফাদারের সাহায্যেই উত্তরবঙ্গের এই ছোট শহরটায় আস্তানা গাড়ে ডেভিল। তিন বছর সে চুপচাপ ছিল কিন্তু সম্প্রতি তার মধ্যেকার শয়তান আবার জেগে ওঠে। ইকবাল ঘটনাচক্রে রাহী দেবের ঘটনাটা জানতে পারেন। মোড অফ অপারেশন অনেকটা ডেভিলের মত বলে খোঁজখবর শুরু করেন তখনই মিসেস পলের খুনের কথা জানতে পারেন। ইকবালের গাট ফিলিংস বলছিল ডেভিল এখানেই আছে। মুম্বাই পুলিশের একটা দল ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশের সঙ্গে এখানে আসে। ইকবাল ভুল ছিলেন না। ডেভিলের চেহারা তাঁর চোখের সামনে সবসময় ভাসে। এখানে এসে গোপনে খোঁজখবর করে নরেশ তামাঙ্গের কাছে একটা গ্রুপ ফটোতে ছবি দেখেই চিনতে পারেন ইকবাল। তাঁরা সময় মত না পৌঁছলে নিজের জন্মদাতা পিতার মত দ্বিতীয় জন্মদাতা ফাদার জোসকেও ডেভিল ওই খাদের অতলে শেষ করে দিত। ফাদার জোস এখনও বিশ্বাস করেন ডেভিল সত্যিই তার স্মৃতি হারিয়েছিল নাহলে তিনটে বছর সে শান্ত একটা জীবনযাপন করছিল কেন। ইকবালের থিওরি অন্য। তাঁর মত ডেভিল বড় কিছু প্ল্যান করছিল তাই ঝড়ের আগে থমথমে হয়েছিল। কে ঠিক কে ভুল তা জানার আর সুযোগ রইল না। একটাই আফসোস রয়ে গেল ইকবালের দশ বছর ধরে ধাওয়া করেও ডেভিলকে জীবিত ধরতে পারলেন না। ধরা দেবে না বলে ডেভিল শেষ মুহূর্তে ওইভাবে খাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে ভাবতে পারেননি ইকবাল। সত্যিই সারাজীবন ডেভিল পুলিশকে নিজের পেছনে ছুটিয়ে গেল কিন্তু ধরা দিল না।

“ডেভিল কা কোই অন্ত নেহি অফিসার। মওত ভি উসে খতম নাহি কর সকতা।” হিমশীতল সে কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে পেছনে তাকালেন ইকবাল। লোডশেডিং-এর মধ্যে টেবিলের ওপর শুধু একটা মোমবাতি মৃত্যুর অপেক্ষায়। সেই আলো আঁধারীর মধ্যে দেখলেন চেনা একটা অবয়ব। বুকের নিচের দিকে একটা ফুটো থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে। গুলিটা পিঠ ভেদ করে সামনে দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল।

বাতাসিয়ার পরীরা - সায়নদীপা পলমল


অলংকরণ - মিশন মন্ডল

সারারাতের প্যাচপ্যাচে গরমের পর ভোর রাতের দিকে জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসতেই ঘুমটা গাঢ় হয়ে ধরেছিল প্রেরণার। আচমকা বুকের ওপর একটা অসহ্য চাপ… চমকে গিয়ে চোখ মেলে দেখল সমুদ্র কখন যেন চুপিসাড়ে চড়ে বসেছে ওর ওপর। অবাক গলায় প্রেরণা বলল, “কী করছটা কী?”

দ্য ক্যাট ফ্রম হেল - স্টিফেন কিং

হুইলচেয়ারে বসা বুড়োটাকে অসুস্থ আর আতঙ্কিত মনে হচ্ছিল হালস্টনের, যেন মরবার জন্য তৈরি হয়ে আছে।

এমনটা সে আগেও দেখেছে। হালস্টনের কারবারই মৃত্যু নিয়ে; এ পর্যন্ত তার খুনের তালিকায় যোগ হয়েছে আঠারোজন পুরুষ আর ছয়জন নারী। মৃত্যুমুখী দৃষ্টি কেমন হয়, সে জানতো।

কালো বিড়াল - এডগার অ্যালান পো

যে কাহিনী লেখার জন্য এখন হাতে কলম নিয়ে বসেছি সেরকম একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় বা বলা যেতে পারে এরকম জান্তব ঘটনার বিবরণী আমি আগে লিখিনি। কোনোদিন যে লিখবো এরকম কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না।

পুতুল - আগাথা ক্রিস্টি

ভেলভেটে মোড়ানো চেয়ারের উপর শুয়ে আছে পুতুলটা। আলো খুব একটা নেই ঘরে। লণ্ডনের আকাশ অন্ধকার হয়ে আছে। হালকা আলোয় একে-অন্যের মাঝে যেন ডুব দিয়েছে পর্দা, কার্পেট আর অন্যান্য আচ্ছাদন। পুতুলটাও ব্যতিক্রম নয়। সবুজ ভেলভেটের কাপড়, ভেলভেটের টুপি এবং রঙিন মুখোশ পরে শুয়ে আছে সে।

খাদ - ডরোথি কুইক

খাড়া পাহাড়টার একেবারে ধারে বসে ছিল মেয়েটা। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল নিচের দিকে, যেখানে এলোমেলো খাঁজকাটা পাথরগুলোর ওপর দিয়ে তীব্র গতিতে বয়ে চলেছিল জলের ধারা। সে দেখছিল, অস্তগামী সূর্যের আলো কেমন করে তার গোলাপী আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে সেই ঘুরে ঘুরে পাক খেয়ে ওঠা জলের ওপর। সব মিলিয়ে একটা অপার্থিব ভাললাগা, তবু সেদিকে তাকালেই মেয়েটা বারবার কেঁপে কেঁপে উঠছিল। কারণ তার চোখ কোন সৌন্দর্য দেখছিল না, সে শুধু দেখছিল অনেক নিচের সেই ভয়ংকর পাথর আর জলটুকু।

‘না, আমার সাহস নেই,’ বিড়বিড় করে মেয়েটা বলল, পরক্ষণেই তার কণ্ঠস্বর ডুবে গেল জলের আওয়াজে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে আবার স্থির বসে রইল, দুচোখে ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে। আর ঠিক এই সময় দূর থেকে ভেসে এল সাইরেনের শব্দ।

পলকে মাথা তুলল মেয়েটা, চুপ করে শব্দটা শুনল, তারপর ধীরে ধীরে তার মুখে ফুটে উঠল একটা নিষ্প্রাণ হাসি। তার এতক্ষণের চিন্তাগুলো যেন এতক্ষণে ডানা মেলল।

‘কারখানার বাঁশি। তার মানে জিম এবার ফিরবে। আর ফিরে আমায় না দেখতে পেলে কী ক্ষেপেই না যাবে! এখন আমি যদি ফিরে যাই, পিটিয়ে মেরেই ফেলবে আমায়। কিন্তু না, আমি ফিরব না। কিছুতেই ফিরব না। হা ঈশ্বর! দয়া করো আমায়, সাহস দাও।’

বলতে বলতে হঠাৎ তার দুটো হাত দুহাতে শক্ত করে ধরে সামনে পেছনে দুলতে শুরু করল মেয়েটা। সে এমন আনচান করছিল যে আচমকা তার জুতোটা খুলে গিয়ে পড়ল নিচের সেই উন্মত্ত জলরাশির মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে সেটা দেখার জন্যে সে ঝুঁকে পড়ে চোখ মেলল, কিন্তু ততক্ষণে সূর্য পাহাড়ের আড়ালে ডুবে গেছে। অন্ধকারে কিছুই তার চোখে পড়ল না। সুতরাং শব্দটা অন্তত যাতে শুনতে পায়, তাই সে উৎকর্ণ হয়ে কান পাতল।

কিন্তু কোন নতুন শব্দও সে শুনতে পেল না, শুধু নিচের পাথরে সেই জল বয়ে যাওয়ার শোঁ শোঁ ক্রুদ্ধ আওয়াজ। তার জুতোটা গেছে, এবার তার পেছন পেছন সে-ও যাবে। সাংঘাতিক চোট লাগবে, অবচেতনেই সে ভাবছিল। আর তখনই হঠাৎ যেন নিজেকে সে দেখতে পেল, পাথরের ওপর পড়ে থাকা তার থ্যাঁৎলানো দেহটা, হয়তো মরেনি, কিন্তু মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে।

আচমকা একটা ভয়ে সে টলমল করে পাথরের ওপর উঠে দাঁড়াল। পালিয়ে যেতে চাইল এই খাদের ধার থেকে, আবার সেই জিমের কাছেই— যদিও সেটা তার পক্ষে মারাত্মক, কিন্তু এই ভয়ংকর মৃত্যুর থেকে তো ভাল!

‘না, আমি পারব না,’ বিড়বিড় করল মেয়েটা, ‘সেই সাহসটুকু থাকলে কিছুতেই আমি ফিরে যেতাম না, কিছুতেই না।’ সহসা দুহাতে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে ফেলল সে।

আর তখনই তার মনে হল, কে যেন তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে, খুব কাছে। নিমেষে মুখ তুলে সে তাকাল। একটা অচেনা লোক দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে।

খুব নরম গলায় লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’ লোকটার গলায় কী ছিল কে জানে, অন্ধকারে তার মুখও ভাল করে দেখা যাচ্ছে না, তবু তার গলা শুনে মেয়েটার সব ভয় কেটে গেল।

বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মেয়েটা বলল, ‘আমি মরতে চাই।’ খাদের নিচে আঙুল দেখাল সে, ‘কিন্তু আমার ভয় করছে। আমার সাহস নেই।’

‘ও এই ব্যাপার?’ সামান্য হেসে লোকটা বলল, ‘তাহলে আমি তোমায় সাহায্য করতে পারি,’ লোকটার গলায় গাঢ় সহানুভূতির ছোঁয়া, ‘তবে তার আগে সবটা আমায় বলতে হবে।’

আশ্চর্য ব্যাপার, লোকটা তার কাজে বাধা দিচ্ছে না কিংবা তাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে না দেখেও মেয়েটা একটুও অবাক হল না, বরং তার দরদ মাখানো গলায় সে যেন এক অচেনা বন্ধুত্ব খুঁজে পেল, আর হড়বড় করে বলতে শুরু করল তার কথা।

‘আমি ববকে ভালবাসতাম— কিন্তু আমার বাড়ির লোকেরা আমার বিয়ে দিল জিমের সঙ্গে। জিমের প্রচুর টাকা ছিল— আর একটা বাড়ি। আমি ছিলাম সুন্দরী আর আকর্ষণীয়া, রান্না করতেও পারতাম। কিন্তু জিম আমায় ভালবাসত না, ব্যবহার করত— আমি— আমি— ঘৃণা করতাম ওকে।’ বলতে বলতে তার হাতগুলো পরস্পরকে আঁকড়ে ধরছিল, আঙুলগুলো চেপে বসছিল নরম মাংসের ভেতর, আর ধীরে ধীরে নখের আগায় জমা হচ্ছিল রক্তের ফোঁটা।

‘আচ্ছা?’ জিজ্ঞেস করল লোকটা। ‘তাই—’ বাকিটা অনুচ্চারিত রেখেই চুপ করে গেল সে।

মেয়েটা আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি জিমকে ভালবাসার অনেক চেষ্টা করেছি— কিন্তু পারিনি। ও ছিল একটা মত্ত পশু। আর সেইসব দিনে বব ছিল আমার কাছে মুক্তির হাওয়া। জিম যখন বাড়ি থাকত না, সে তখন আমার কাছে আসত, আমার জন্য নিয়ে আসত ছোটখাটো উপহার। একদিন সে এসে দেখল আমি কাঁদছি, দেখল আমার হাতে আর পিঠে কালসিটের দাগ। তখন সে আমায় তার বলিষ্ঠ দুহাতে তুলে নিয়ে—’ বলতে বলতে আবেশে মেয়েটার দুচোখ বুজে আসে। সে যেন স্পষ্ট অনুভব করতে পারে সেই সোনালি মুহূর্তগুলো।

‘সেদিনই আমরা ঠিক করলাম, বব একটু ভালমতো টাকাকড়ি পেলেই দুজনে একসঙ্গে পালিয়ে যাব,’ মেয়েটা তার স্মৃতির পাতায় আবার ডুবে যাচ্ছিল, ‘আর সেদিনই জিম বেশ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরল। আমি চটপট লুকিয়ে ফেললাম ববকে, কিন্তু জিম বেশ ভালমতো পান করেই বাড়ি ঢুকেছিল। কিছু একটা সন্দেহ করে সে পেটাতে শুরু করল আমাকে। আমি প্রথমে তড়পানোর চেষ্টা করলাম, তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু ঈশ্বর বোধহয় সেই রাত্রে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম, শুনে বব বেরিয়ে এল আমায় সাহায্য করতে— আর— আর সেই মুহূর্তেই জিম তাকে খুন করল!’

লোকটা চুপ।

মেয়েটা বলে যাচ্ছিল, ‘জিম ছাড়া পেয়ে গেল, কারণ সে নাকি প্রতারিত হয়েছে। জুরীরাও তার দিকেই ছিল। আর তারপর আমার আরও খারাপ দিন শুরু হল, যখন জিম আবার ফিরে এল। আমার কাছে সেই দিনগুলো ক্রমশ নরকের মতো হয়ে উঠল,আমি— আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না, আমি ববের কাছে, শুধুমাত্র ববের কাছে যেতে চাইছিলাম— কিন্তু আমার সে সাহস নেই।’

লোকটা মেয়েটির কাছ ঘেঁষে এল।

‘কোন চিন্তা নেই, মাত্র এক মিনিটের ব্যাপার,’ ফিসফিস করে লোকটা বলল, ‘এক সেকেন্ড, তারপরেই শেষ।’

রোগা চেহারাটা যেন সামান্য কেঁপে উঠল। অস্ফুটস্বরে মেয়েটা বলল, ‘আমি— আমি পারব না।’

লোকটা আর এক পা এগিয়ে এল।

আস্তে, খুব আস্তে সে উচ্চারণ করল, ‘ভয় কীসের? তুমি তো একা নও, আমিও তো যাব তোমার সঙ্গে।’

‘কিন্তু কেন?’ মেয়েটা অবাক হয়ে যাওয়া গলায় বলল বটে, কিন্তু সেইসঙ্গে তার হাতটা যেন আপনা থেকেই এগিয়ে গেল লোকটার আঙুলগুলো ধরার জন্যে।

লোকটা সেটা আমল না দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেল, ঠিক পাথরের প্রান্তে, খাদের ধারটায়। তারপর হাত বাড়িয়ে ডাকল, ‘কই এসো!’

মেয়েটা এবার মন্ত্রমুগ্ধের মতো সামনে পা বাড়াল। আর সেই মুহূর্তে চকিতে নিচের সেই ক্ষুরধার পাথরগুলোর ওপর জল আছড়ে পড়ার ভয়ংকর শব্দটা কানে আসতেই শিউরে উঠে পিছিয়ে গেল সে, ‘না, আমার ভয় করছে।’

‘তাহলে জিমের কাছেই ফিরে যাও আবার!’ তীব্র বিদ্রূপের স্বরে বলল লোকটা।

‘না, না।’ চিৎকার করে ওঠে মেয়েটা।

এবার লোকটা খানিকটা কড়া গলায় বলে উঠল, ‘তাহলে তোমাকে এই মুহূর্তে জিম আর ববের মধ্যে যে কোন একজনকে বেছে নিতে হবে।’ এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বাকিটা যোগ করল সে, ‘তোমার সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আর বেশি সময় নেই।’

‘কিন্তু— কিন্তু বব যদি আমায় খুঁজে না পায়?’ ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা।

লোকটার গলায় কোন উত্তাপ নেই, ‘মাত্র এক সেকেন্ড। আর তারপরেই— অনন্ত মুক্তি।’

আবার শিউরে ওঠে মেয়েটা, ‘ওখানে কী গভীর অন্ধকার!’

‘নিচে পৌঁছলেই দেখবে সেখানে আলোর বন্যা।’

‘কিন্তু— ভীষণ ঠান্ডা হবে জায়গাটা!’

লোকটা হাসল, ‘এসো, আমার হাতটা ধরো। একদম ঠান্ডা লাগবে না।’ মৃদু আর শান্ত গলায় কথাটা বলল সে, আর এতক্ষণে হাত বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে।

মেয়েটা আকুল হয়ে হাতটা জড়িয়ে ধরতে এগিয়ে গেল, কিন্তু পারল না। ততক্ষণে লোকটা হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে নিচে, অনেক নিচে— অন্ধকারের মধ্যে। কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার! লোকটার চারপাশ ঘিরে ও কীসের আলো! একটা আশ্চর্য উজ্জ্বল আলো যেন ঘিরে রেখেছে তাকে! অন্ধকার যেন কেটে গেছে সেই আলোর মায়ায়। এক নিমেষে মেয়েটার সমস্ত ভয় যেন কেটে গেল।

সে চিৎকার করে বলল, ‘দাঁড়াও। আমি আসছি।’

সেই মুহূর্তে অবাক হয়ে মেয়েটা লক্ষ্য করল, নিচে থেকে সেই লোকটা হাসছে, একদম ববের মতোই তার হাসিটা, আর তার দুটি বাহু দুদিকে প্রসারিত, যেন কাউকে আঁকড়ে ধরার প্রত্যাশায়। সে আর এখন অচেনা কেউ নয়, সে আসলে— সে আসলে— বব নিজেই! এক মুহূর্তও দ্বিধা না করে মেয়েটা নিচের দিকে ঝাঁপ দিল ববের দুই প্রসারিত বাহু লক্ষ্য করে।

ওরা দুজন একসঙ্গে চলে যাচ্ছিল নিচে, আরও নিচে, খাদের একেবারে শেষপ্রান্তে। ববের উষ্ণ ঠোঁটদুটি দৃঢ়বদ্ধ হয়ে বসে ছিল মেয়েটির ঠোঁটে, গরম করে দিচ্ছিল তাকে। এমনকি মেয়েটা জানতেও পারল না কোন মুহূর্তে সেই জলের স্রোত তাকে বরণ করে নিল চিরকালের মতো।

মন্দির - গোও তানাবে