বাতাসিয়ার পরীরা - সায়নদীপা পলমল

অলংকরণ - মিশন মন্ডল

সারারাতের প্যাচপ্যাচে গরমের পর ভোর রাতের দিকে জানালা দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসতেই ঘুমটা গাঢ় হয়ে ধরেছিল প্রেরণার। আচমকা বুকের ওপর একটা অসহ্য চাপ… চমকে গিয়ে চোখ মেলে দেখল সমুদ্র কখন যেন চুপিসাড়ে চড়ে বসেছে ওর ওপর। অবাক গলায় প্রেরণা বলল, “কী করছটা কী?”

উত্তর দিলো না সমুদ্র, পরিবর্তে একটানে প্রেরণার নাইটির বোতামগুলো খুলে ফেলল। রাগে চিৎকার করে উঠল প্রেরণা, কিন্তু লাভ হল না। কোনো অমানুষিক শক্তিতে প্রেরণার মুখটা চেপে ধরল সে। প্রেরণা লক্ষ করল সমুদ্রর চোখ দুটো টকটকে লাল। প্রায় ঘন্টাখানেক ধস্তাধস্তির পর শান্ত হল সমুদ্র, বা বলা ভালো আচমকাই প্রেরণাকে ছেড়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল সে। হতভম্ব প্রেরণা কিছুক্ষণ উঠতে পারলো না নিজের জায়গা ছেড়ে। যখন উঠতে গেল টের পেলো সারা শরীরে অসহ্য ব্যাথা। ঘড়ির দিকে তাকাল প্রেরণা, পাঁচ’টা বেজে সাতচল্লিশ।

***

টেবিলের ওপর তাস গুলো সাফল করতে করতে পার্থ বলে উঠল, “একটা দারুণ জায়গার সন্ধান পেয়েছি। যাবি নাকি?”

“কোথায় সেটা?” জানতে চাইলো প্রেরণা।

“ক্রমশ প্রকাশ্য।”

প্রেরণা মাথা নাড়ল, “ওকে, তাহলে জায়গাটার সম্পর্কেই বলো দেখি। শুনে যদি ইন্টারেস্ট লাগে তাহলে যাওয়ার কথা ভাবা যাবে নিশ্চয়। কী বলো সমুদ্র?”

“হুঁ?” চমকে উঠলাম আমি, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়।”

“তোর মন সবসময় কোথায় থাকে বল তো? কোনো সময়ই যেন নিজের মধ্যে থাকিস না।” ধমকে উঠল পার্থ।

“সরি।”

“আচ্ছা শোন তাহলে। আমার এক বন্ধুর মারফৎ জানতে পেরেছি খবরটা। যেখানের কথা বলছি সেটা একটা প্রত্যন্ত গ্রাম। নাম বাতাসিয়া। ওখানের লোকেদের মধ্যে একটা ইন্টারেস্টিং মিথ প্রচলিত আছে। ওই গ্রামটা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটা প্রাচীন ভগ্ন স্তূপ আছে…”

“কীসের ভগ্নস্তূপ?” পার্থর কথার মাঝেই জিজ্ঞেস করল প্রেরণা।

“ঠিক জানি না। মানে ওখানকার গ্রামের লোকও ঠিক জানে না ওখানে আগে কী ছিল, তবে ওই রাজবাড়ী বা এই জাতীয় কিছু হবে হয়তো।”

“ওকে। দেন…?”

“দেন মিথটা হলো এই যে গ্রামের মানুষরা বলে ওই ভগ্ন স্তূপে নাকি মাঝে মাঝে পরীদের দেখতে পাওয়া যায়।”

পার্থর কথা শুনে একসঙ্গে হেসে উঠলাম আমি আর প্রেরণা। হাসতে হাসতেই আমি বললাম, “তা আমাদের বাজার কি এতো মন্দা চলছে যে শেষমেশ পরীর সন্ধানে বেরোতে হবে !”

আমার কথায় একটুও রাগলো না পার্থ, যেটা ওর চরিত্রের সাথে একদম মানানসই নয়। বরং মৃদু হেসে বলল, “আমিও কথাটা শুনে তোদের মতোই হেসেছিলাম। কিন্তু মিথটা এখানেই যে শেষ নয়।”

“মানে?” জানতে চাইলো প্রেরণা।

“মানে গ্রামের মানুষরা যে পরীদের দেখে ওটা আমাদের রূপকথার গল্পে বর্ণিত পরীদের মত নয় গুড এঞ্জেল নয়। বরং এই পরীরা নাকি ভয়ঙ্কর। ওখানকার বাসিন্দাদের কাছে শয়তানের দূত হিসেবেই পরিচিত। ওরা নাকি জীবন্ত মানুষের আত্মাকে দেহ থেকে বের করে নিতে পারে, তারপর সেই আত্মা নিয়ে যা খুশি করে। আত্মা নাকি ওদের কাছে খেলনার মত।”

“হোয়াট!”

“ইয়েস।”

“বাট পার্থ এসব গ্রামের মানুষদের কথার কি কোনো ভিত্তি আছে? গাঁজাখুরি গল্প ফাঁদছে নাকি কে জানে!” বললাম আমি।

পার্থ জবাবে বলল, “ডোন্ট ফর্গেট এইসব গ্রামের মানুষদের কথা শুনেও কিন্তু আমরা অনেকবার অনেক কিছুর সন্ধান পেয়েছি।”

“কিন্তু পার্থ ব্যর্থ হয়েছি কতবার সে খেয়াল আছে?” বলল প্রেরণা।

“ব্যর্থ হতে পারি এই আশঙ্কায় খোঁজ নিতে যাবো না! শোনো আমি চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছি যা রটে তার কিছুও তো ঘটে। আর এই বিশ্বাস নিয়েই আমি এগিয়ে যাওয়া পছন্দ করি। সবসময় সবটা গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী আমি নই। যাইহোক, আমি যাবো। তোমরা যেতে চাইলে জানাও।”

পার্থর কথা শুনে আমার দিকে তাকালো প্রেরণা। আমি কী জবাব দেবো খুঁজে পেলাম না।

***

“ক’দিন ধরে ব্যাপারটা ঘটছে?”

“প্রায় এক সপ্তাহ।”

“হুমম।”

“এই দেখ কী অবস্থা করেছে আমার… গোটা গায়ে আঁচড়ানোর দাগ, কালশিটে… উফফ আমি আর পারছি না সহ্য করতে। তুই প্লিজ কিছু একটা সলিউশন দে।”

“আর ইউ শিওর সমুদ্র আগে কখনও এরকম ভায়োলেন্ট হয়নি?”

“নেভার। ওকে আমি খুব ভালো করে চিনি। খুব ধীর স্থির মানুষ বলেই ওকে জানতাম কিন্তু…”

“এই রকম আচমকা ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনো চেঞ্জ?”

“না।”

“প্রেরণা…”

“হুঁ?”

“সত্যি কথা বল। আয়াম শিওর তুই কিছু একটা চেপে যাচ্ছিস।”

“না-রে সত্যি বলছি।”

“লিসন কোনো একটা ছোটো ডিটেইলও যদি লুকোস তাহলে কিন্তু আমি সমুদ্রর ট্রিটমেন্ট করতে পারবো না। কী হল?”

“শ্রীজাতা… গতকাল একটা ব্যাপার ঘটেছিল।”

“কী?”

“অন্যদিন ওই সময় সমুদ্র একটাও কথা বলে না কিন্তু কাল… কাল আমি ওকে একটা সপাটে চড় কষিয়ে চিৎকার করে উঠছিলাম। তখন ও বলল…”

“কী বলল?”

“বলল - আমায় চিনতে পারছো না প্রেরণা? আমি পার্থ।”

“পার্থ? সেটা কে?”

……….

***

“তোমার সাথে যতবার এসেছি ততবার এরকম হুজ্জুতি পোহাতে হয়েছে।” হাঁফাতে হাঁফাতে পার্থর উদ্দেশে কথাগুলো ছুঁড়ে দিলো প্রেরণা।

পার্থ গম্ভীর মুখে বলল, “তাহলে তোমার আসা উচিৎ হয়নি।”

“আমি…” মুখের কথা মুখেই রয়ে গেলো প্রেরণার। আমরা সবাই দেখলাম একটা কালো খর্বকায়, শীর্ণদেহী লোক এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের সামনে। লোকটার পরনে কোনো জামা নেই, শুধু হাঁটুর ওপরে খাটো একটা ধুতি। লোকটা একটা দুর্বোধ্য ভাষায় আমার আর প্রেরণার উদ্দেশে কিছু একটা বলল। আমি আর প্রেরণা কিছু বুঝতে না পেরে চোখাচোখি করলাম কিন্তু পার্থ আমাদের অবাক করে দিয়ে লোকটার সাথে কথা বলতে লাগলো ওর ভাষাতেই। কখনও হাত পা নেড়ে কখনও বাংলা আর ওই ভাষা মিশিয়ে বেশ কিছুক্ষণ লোকটার সাথে কথা চালালো পার্থ। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “চল।”

আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে যেতেই পার্থ আমায় ইশারা করে চুপ থাকতে বলল। দেখলাম ওই গ্রামবাসীটা ইতিমধ্যেই হাঁটা শুরু করে দিয়েছে। পার্থ ওর পিছু নিলো, আমি আর প্রেরণা চললাম পার্থর পেছন পেছন। একটু অগ্রসর হতেই একটা গ্রামে এসে পড়লাম। ছোটো ছোটো অসংখ্য ঝুপড়ি ঘর গ্রামের মানুষগুলোর দারিদ্রের পরিচয় বহন করছে। কতগুলো বাচ্চাকে আদুল গায়ে মুরগি নিয়ে খেলা করতে দেখলাম। প্রত্যেকটা বাচ্চাই এতো শীর্ণ যে তাদের পাঁজরের হাড় অবধি গোনা যাবে। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে যে বাড়িটার সামনে এসে উপস্থিত হলাম সেই বাড়িটা গ্রামের অন্য বাড়িগুলোর তুলনায় খানিক উন্নত, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পার্থ ফিসফিস করে বললো, “গ্রামের মোড়লের বাড়ি। মোড়লের সাথে যা কথা বলার আমি বলবো। তোরা একদম স্পিকটি নট থাকবি।”

আমি আর প্রেরণা কোনো উত্তর দিলাম না। যে লোকটা আমাদের পথ দেখিয়ে এনেছিলো সে মোড়লের বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো আর আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম বাইরে। প্রচণ্ড রোদ এখানে, আর যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল, তেষ্টাও পাচ্ছিল। সঙ্গে আনা জল অনেক আগেই শেষ। প্রেরণার অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। দেখলাম সে জুতো খুলে নিজের পা দুটো পরীক্ষা করছে, পায়ের পাতা ফুলে ঢোল। এদিকে পার্থর চোখেমুখে ক্লান্তির লেশমাত্র নেই। বরং ওর চোখে এক চাপা উত্তেজনা লক্ষ করতে পারলাম। এই রোদের মধ্যে একেকটা মিনিটকে একেকটা ঘন্টার সমতুল্য মনে হচ্ছিল। এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, বেশ কিছুক্ষণ পর সেই লোকটা আরেকজন তুলনামূলক বয়স্ক লোককে নিয়ে এলো বাইরে। পার্থ আমাদের উদ্দেশে ঠোঁট চেপে বলল, “মোড়ল।”

মোড়ল লোকটি আমাদের অবাক করে দিয়ে প্রথমে নমস্কার করলো। তারপর ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললো, “বলুন বাবু।”

পার্থ চটজলদি জবাব দিলো, “আমরা তিনজনেই রিসার্চ স্কলার। আপনাদের জীবন যাত্রার ওপর একটা ডকুমেন্টারি বানাতে চাই।”

“কী?”

“ছবি করব আপনাদের নিয়ে। আপনাদের সঙ্গে কথা বলে, আপনারা কেমন ভাবে থাকেন সেসব নিয়ে একটা ছবি বানাবো।”

“কিন্তু ক্যান?” অবাক হয়ে জানতে চাইলো বৃদ্ধ। পার্থ অবলীলায় বলল, “আমরা গবেষণা করছি এরকম প্রত্যন্ত গ্রামের জীবনযাত্রা নিয়ে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন।” হাত জোড় করলো পার্থ। বৃদ্ধ চোখ ছোটছোট করে আমাদের দেখলেন খানিকক্ষণ। তারপর বললেন, “ভিতরে আসুন।”

বৃদ্ধের ডাকে ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম আমি, নয়তো এতক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে আমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল।

বৃদ্ধের সাথে ভেতরে ঢুকতেই একটা বাচ্চা ছেলে মাদুর পেতে দিলো আমাদের। সেখানে বসার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা তিনটে গ্লাসে ডাবের জল এনে রাখলো আমাদের সামনে। আমি সৌজন্য ভুলে চোঁ চোঁ করে শেষ করে ফেললাম জলটা। পার্থ দেখলাম আমার দিকে কটমটিয়ে তাকাচ্ছে, গ্রাহ্য করলাম না আমি। বৃদ্ধ পার্থকে বললেন, “খান, ভালো লাগবে।”

পার্থ মৃদু হেসে গ্লাসটা তুলে নিলো মুখের কাছে। বৃদ্ধ আবার চোখ ছোটো ছোটো করে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাফ করবেন। আমি আপনাদের অনুমতি দিতে পারব নাই।”

চমকে উঠলাম আমি। আমার ধারণা ছিলো এইসব মানুষগুলো সিনেমার নাম শুনলেই কুপোকাত হয়ে যাবে কিন্তু তা নয় উল্টে এ আমাদেরই কুপোকাত করতে চাইছে। গ্লাসের আড়ালে থাকায় পার্থর মুখের অভিব্যক্তি পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না। তবে সে কিছু বলছে না দেখে আমিই ময়দানে নামলাম। সরাসরি বৃদ্ধের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”

“আমরা তামাশা করি নাই বাবু।”

বৃদ্ধের উত্তরে আরেকবার চমকে উঠলাম, কিন্তু নিজের মনের ভাব প্রকাশ না করে বললাম, “আপনি ভুল ভাবছেন। এই সিনেমা অন্যরকমের হয়। এতে আপনাদের জীবনযাত্রার কথা তুলে ধরব আমরা। তখন দেখবেন ওপর মহল থেকে আপনাদের সাহায্যের জন্য…”

“থাক বাবু থাক। এমন কতা ঝুড়ি ঝুড়ি শুনছি। আর ভাল্লাগে নাই। আমি অনুমতি দিতে পাললুম না।”

বৃদ্ধের কথায় আমার মুখে কথা জোগাল না। এবার দেখলাম পার্থ মুখের সামনে থেকে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বলল, “আপনি অনুমতি না দিলে আমরা কিছু করতে পারি না। আমরা ফিরে যাবো। কিন্তু…”

“কিন্তু কী?” জানতে চাইলেন বৃদ্ধ।

“আমরা তো অনেক দূর থেকে এসেছি সঙ্গে একজন মেয়েমানুষও আছে। এখন বেরোলে ফিরতে ফিরতে তো অনেক রাত হয়ে যাবে। তারওপর এতটা পথ হাঁটা…”

“ও লিয়ে চিন্তা করবেননি বাবু। আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু অমানুষ নই। আজ আপনারা একেনেই থাকুন। কাল সকালে যাবেন না হয়।”

“উফফ আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেবো…” হাত জোড় করে বৃদ্ধের সামনে মাথা ঝোঁকাল পার্থ। বৃদ্ধের মুখ দেখে বুঝলাম শহরের বাবু এতো সম্মান দিচ্ছে দেখে বেশ খুশি হয়েছে সে। মনে মনে হাসলাম আমি।

***

“আপনার নাম?”

“সমুদ্র সেনগুপ্ত।”

“কী করেন?”

“ফ্যামিলি বিজনেস আছে।”

“ওকে। তা সমুদ্র বাবু…”

“ডক্টর…”

“হুমম?”

“আপনি প্রেরণার বান্ধবী তাই না?”

“ইয়েস। আমরা একসাথে স্কুলে পড়তাম।”

“আপনি প্লিজ ওকে বোঝান আমি পাগল নই। আর আপনিও বিশ্বাস করুন আমি পাগল নই। আমি একদম সুস্থ, কিন্তু…”

“কিন্তু রোজ ভোর রাতে আপনি যা করেন…”

“ট্রাস্ট মি আমি ওসব করি না। আপনি প্রেরণাকে জিজ্ঞেস করবেন আমি কোনদিনও এরকম ছিলাম কিনা।”

“আপনি করেন না? তাহলে কে করে?”

“পার্থ।”

“সে কে?”

“আমাদের বন্ধু।”

“সে তো হলো কিন্তু আপনার কেন মনে হয় এসব পার্থই করছে আপনার সাথে? সে কীভাবে আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?”

“সেটা আমি বলতে পারবো না আপনাকে। তবে এটুকু জেনে রাখুন এসব পার্থই করছে, আই মিন পার্থর আত্মা।”

“আপনি আত্মায় বিশ্বাস করেন?”

“না করার কী আছে? আমাদের এই অস্তিত্বটার চেয়েও বেশি সত্যি হল আমাদের আত্মার অস্তিত্ব। ডক্টর আপনি জানেন এই মুহূর্তে, ঠিক এই মুহূর্তেও পার্থর আত্মা আমার শরীরের ভেতর আছে। ও শুধু এখন চুপটি করে বসে আছে, সময় এলেই ও নিজের কাজ শুরু করবে।”

“এখন? আপনি বুঝলেন কী করে?”

“আমি জানি। যাইহোক, আপনাকে বলছি ডক্টর আপনি এসবের কিচ্ছু করতে পারবেন না। পার্থ আছে, ও থাকবে।”

“বাট শুনুন আমার কথাটা…”

“আই ওয়ার্ন ইউ ডক্টর শ্রীজাতা মিত্র, আমাকে আর প্রেরণাকে আমাদের মতোই ছেড়ে দিন। প্রেরণাকে সাহায্য করার কথা ভাবলে আখেরে আপনারই বিপদ হবে।”

“সমুদ্র বাবু আপনার ভয়েসটা…!”

…….

***

ভাত আর দেশি মুরগির ঝোল খেয়ে আরামে ঘুম ধরে গিয়েছিল আমার। পার্থর ডাকে ধড়ফড় করে উঠে বসলাম; পার্থ আমাকে ইশারায় চুপ থাকতে বলে ফিসফিস করে বলল, “ব্যাগ নিয়ে নে। যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, চল।”

ঘুম ঘুম চোখে ব্যাগ নিয়ে ঘরের বাইরে আসতেই দেখলাম প্রেরণা ইতিমধ্যেই উঠে পড়েছে। পা টিপে টিপে তিনজনে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম। পূর্ণিমার রাত। আকাশে গোল থালার মত চাঁদ। চারিদিক জ্যোৎস্নার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। বেশ একটা ফুরফুরে হাওয়াও দিচ্ছে। পার্থ চাপা স্বরে বলল, “স্পিডে কিন্তু পা টিপে টিপে হাঁটতে হবে। কেউ কোনো কথা বলবে না। লেটস গো।”

এই বলে হাঁটতে লাগলো পার্থ। ওকে অনুসরণ করতে লাগলাম আমরা। স্পিডে কিন্তু পা টিপে টিপে হাঁটা যে কী শ্রমসাধ্য কাজ তা টের পাচ্ছিলাম হাড়ে হাড়ে। তার ওপর সকাল থেকে সেই হেঁটেই যাচ্ছি, এখনও আবার কতটা হাঁটতে হবে কে জানে। প্রেরণার দিকে তাকালাম। দেখলাম যন্ত্রণায় মেয়েটার মুখটা কুঁকড়ে উঠছে মাঝে মাঝে কিন্তু তাও মুখে টুঁ শব্দটিও করছে না। প্রেরণা মেয়েটা এমনই। অসম্ভব মনের জোর। অবশ্য মনের জোর না থাকলে আমাদের ক্লাবের সক্রিয় সদস্য হওয়া যায় না। এসব কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যেন গ্রামের সীমানা পার করে চলে এসেছি। পার্থ বলল, “এবার সবাই রিল্যাক্স হয়ে হাঁটতে পারিস। তবে জোরে কথা বলা যাবে না।”

“ওকে।” পার্থর কথায় সম্মতি জানিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের ঘামটা মুছলাম। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম যেখানে এই মুহূর্তে আছি সেটা একটা রুক্ষ প্রান্তর। পার্থকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “জায়গাটা কোন দিকে তুমি ঠিক জানো?”

“মোড়লের কাছে সব জেনে নিয়েছি। টানা এই পথ ধরে হাঁটতে থাকলেই নাকি জায়গাটা পাওয়া যাবে। বলল ভোরের দিকে নাকি সূর্যের প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষণিকের জন্য দৃশ্যমান হয় ওই রাত-পরীদের শরীর। এমনিতে নাকি ওরা রাতের মতোই কালো…”

শেষের কথাগুলো খানিকটা স্বগতক্তির ঢঙে বলল পার্থ। আমরা আর কেউ কোনো কথা বললাম না, নীরবে ওকে অনুসরণ করে যেতে থাকলাম।

 

ওই রুক্ষ পথ ধরে কত পথ হেঁটেছি জানি না। আচমকা সামনে একটা টিলা দেখে আমাদের গতি রুদ্ধ হলো। পার্থ আমাদের ইশারায় দাঁড়িয়ে যেতে বলে একলাই এগিয়ে গেলো টিলাটার দিকে। তারপর সন্তর্পণে উঠতে লাগলো ওটার ওপর। কাঁকুরে মাটিতে পা স্লিপ করে যেতে দেখলাম ওর, কিন্তু পার্থ পার্থই। নিজেকে সামলে নিলো নিমেষে। টিলাটার একবারে মাথায় উঠে ওপ্রান্তে কী যেন দেখলো, তারপর আমাদের দিকে ঘুরে ইশারায় আসতে বলল। আমি চাঁদের আলোয় দেখলাম ওর মুখে এক রহস্যময় হাসি। আমি আর প্রেরণা এগিয়ে উঠতে গেলাম টিলাটার ওপর। প্রেরণা পা স্লিপ করে পড়ে গেল। আমি হাতটা বাড়ালাম ওর দিকে, প্রেরণা একগাল হেসে জুতোগুলো খুলে এক হাতে নিলো তারপর অন্য হাত দিয়ে আমার হাতটা ধরে উঠে দাঁড়াল। সাবধানে উঠতে লাগলাম দুজনেই। তবে পার্থর মত ফ্লেক্সিবিলিটি আমাদের কারুর নেই তাই সত্যি বলতে ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে উঠেছিলাম দুজনেই। তারপর অনেক কসরৎ করে অবশেষে টিলার মাথাতে উঠতেই পার্থ ইশারা করে সামনের দিকে দেখাল। ওর আঙুলকে অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। দেখলাম টিলাটার ঠিক নিচেই রয়েছে এক শতাব্দী প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ। কীসের ধ্বংসস্তূপ তা ঠাহর করতে পারলাম না। আমাদের দেশীয় রাজবাড়ী বা কোনো অট্টালিকার অংশ বলে ঠিক যেন মনে হলো না। কিন্তু তা না হলে কীসের ভগ্নাবশেষ হতে পারে সেটাও ভেবে পেলাম না। যাইহোক, তিনজনেই নামতে লাগলাম ওই ভগ্নস্তূপ লক্ষ করে। ওঠার চেয়ে নামাটা অনেক সহজ হলো। পার্থ বলল, “ভোর হতে বেশি বাকি নেই, তিনজন সুবিধেজনক জায়গা দেখে নিজেদের আড়াল করে অপেক্ষা করব।”

“সে ঠিক আছে, কিন্তু কতক্ষণ? যদি কিছু না ঘটে?” জিজ্ঞেস করল প্রেরণা।

পার্থ বলল, “না ঘটলে সূর্যের আলোটা স্পষ্টভাবে ফুটে গেলেই চলে যাবো আমরা।”

পার্থর কথায় সম্মতি জানিয়ে ঢুকে গেলাম সেই স্তূপের মধ্যে। একটা বড়সড় স্তম্ভের আড়ালে নিজেকে যথাসম্ভব লুকিয়ে ফেললাম। পার্থ দেখলাম একটা তোরণের মত জিনিসের আড়ালে চলে গেলো আর প্রেরণা আমার মতই একটা স্তম্ভের আড়ালে লুকোলো। ব্যাগ থেকে কার্বলিক এসিড বের করে ছড়িয়ে দিলাম চারিদিকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এডভেঞ্চারে বেরোই ঠিকই কিন্তু সাপের হাতে মরতে চাই না।

 

কতক্ষণ বসেছি সে হিসেবে নেই। ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম কখন যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেটা। টিলার ওপ্রান্ত অবধি কী সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছিল কিন্তু এখানটা অসম্ভব রকমের গুমোট। বারবার রুমাল বের করে ঘাম মুছে নিচ্ছি। ভাগ্য ভালো মশার উপদ্রবটা এখানে নেই অন্তত। বেশ ভালো করেই জানি শুকনো হাতে ফিরতে হবে তবুও কেন জানি না মনে মনে বেশ একটা উত্তেজনা হচ্ছে। আসলে এবারের রহস্যের উৎসটা যতই গাঁজাখুরি মনে হোক না কেন পার্থ যখন সেটার পেছনে ছুটে এসেছে তখন পুরোপুরি উড়িয়ে দিতেও পারছি না। এরকম অবস্থার মধ্যেই একটু তন্দ্রা মতন চলে এসেছিল, আচমকা একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনে চোখ তুলে চাইলাম। আর তাকাতেই যে দৃশ্য দেখতে পেলাম তাতে আমার হাত পা অবশ হয়ে এলো। দেখলাম সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছুটা দূরে সেই তোরণটার সামনে যেখানে পার্থ লুকিয়েছিল। এখানে যদিও চাঁদের আলো স্পষ্ট ছিলো না তাও মেয়েটাকে চিনতে ভুল হলো না আমার। অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো একটা শব্দ, “প্রেরণা!”

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম, প্রেরণা ওখানে ঐভাবে করছেটা কী! দেখলাম পার্থ আস্তে আস্তে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এলো। যদিও ওর মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না তাও আমি জানি এই মুহূর্তে শরীর জুড়ে চলছে আদিম রিপুর শিহরণ। আমারও নিজেকে সংযত রাখা মুশকিল হয়ে উঠছে কিন্তু তাও কোনোভাবে নিজের জায়গা ছেড়ে নড়লাম না। বুঝতে পারছিলাম না ওরা দুজন ঠিক কী করতে চাইছে এই মুহূর্তে! দেখতে পেলাম পার্থ এগিয়ে গেলো প্রেরণার দিকে, তারপর বাম হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ওর কোমর… মুখটা বাড়িয়ে প্রেরণার ঠোঁটে ঠোঁট লাগালো…

আর সেই মুহূর্তেই আচমকা কিছু একটা এমন ঘটল যে পার্থ চিৎকার করে ছিটকে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা, কিছুতে একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো তোরণটার সামনে। ক্ষণিকের জন্য মনে হল যেন পার্থর মুখের কাছটা রক্তাক্ত। পার্থকে আর স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু দেখলাম প্রেরণার শরীরটা আস্তে আস্তে কেমন যেন পরিবর্তিত হতে শুরু করল। সারা গায়ে আঁশের মত কী যেন বেরিয়ে গেলো। মুখের মধ্যেও শুরু হলো আমূল পরিবর্তন। এমন একটা সুন্দর শরীর মুহূর্তের মধ্যে কী কদাকার রূপ ধারণ করলো তা আমার বর্ণনার অতীত। আর তারপরেই দেখলাম আচমকা ওর পিঠ চিরে বেরিয়ে এলো দুটো প্রকাণ্ড সাদা রঙের ডানা। চাঁদের মৃদু আলোতেও ঝলসে উঠল তাদের রং। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে এ প্রেরণা হতে পারে না, এই তাহলে সেই রাতপরী…!

তবে চমকের আরও অনেকটা বাকি ছিলো তখন অবধি। দেখলাম সেই জন্তুটা (হ্যাঁ ওকে পরী বলতে কষ্ট হচ্ছে আমার) আস্তে আস্তে ডানায় ভর করে মাটির থেকে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেলো। তারপর ডান হাতটা বাড়িয়ে কিছু যেন টেনে নিতে লাগলো আর আমি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম পার্থর শরীর থেকে একটা ধোঁয়া ধোঁয়া মানুষের অবয়ব যেন বেরিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলো ওই জন্তুটার দিকে। পার্থর শরীরটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। এদিকে আমারও নড়া চড়ার শক্তি যেন লোপ পেয়েছিল বারোয়ারি পুতুলের মত, শুধু বিস্ফারিত দৃষ্টি নিয়ে দেখছিলাম এক আশ্চর্য দৃশ্য। যা আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের কাছে স্রেফ অবিশ্বাস্য তাই আমি ঘটতে দেখছিলাম আমার চোখের সামনে।

 

আচমকা আমার পিঠে যেন কেউ টোকা দিলো। এক… দুই… তিনবার… একটা ঢোঁক গিলে কাঁপতে কাঁপতে ঘাড় ঘোরালাম, দেখলাম একটা অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসে আছে ঠিক আমার পেছনটাতেই। মেয়েটা ক্রমশ ওর মুখটা বাড়িয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো আমার দিকে। গগনভেদী চিৎকার করে না বলতে চাইলাম কিন্তু টের পেলাম আমার গলার স্বর ফুটছে না। মেয়েটার মুখটা আমার ঠোঁট স্পর্শ করে ফেলল। আতঙ্কে জ্ঞান হারালাম আমি।

***

সমুদ্র আর প্রেরণাকে বসতে বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো শ্রীজাতা। ঘুরে এসে ঠিক প্রেরণার পেছনটাতে দাঁড়াল সে। প্রেরণা অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলো না শ্রীজাতা, তার নজর স্থির হল সমুদ্রের দিকে। লোকটা কেমন যেন ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছে এদিক সেদিক, মনটা যে অন্যমনস্ক তা ওর দিকে তাকালেই বলা যায়। সেই সঙ্গে ওর চোখে এক অদ্ভুত ভয়। সমুদ্রের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই শ্রীজাতা প্রশ্ন করল, “প্রেরণা, পার্থ বসু কে?”

প্রশ্নটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীজাতার চোখ ঘুরল প্রেরণার দিকে, আর প্রেরণার চটজলদি জবাব এলো, “বলেছিলাম না আমাদের বন্ধু।”

“শুধুই বন্ধু?”

“মানে?”

“মানেটা এখন থাক, আগে বল পার্থ বসুর আসল পরিচয় কী। মানে তোদের বন্ধু এটা তো তার পরিচয় হতে পারে না।”

“পার্থ একটা কোম্পানিতে চাকরি করতো। আমাদের থেকে কিছু বড়ই হবে বয়েসে।”

“হুমম, আর তোদের সাথে তার আলাপ কোথায়?”

“আ… আমরা একটা ক্লাবের মেম্বার ছিলাম সবাই।” কথাটা বলতে গিয়ে গলার কাছটা দুবার ওঠা নামা করল প্রেরণার।

শ্রীজাতা ওর কথার সূত্র ধরে জানতে চাইল, “কীসের ক্লাব?”

“এমনিই… মানে…”

“আমি জানতে চাই কীসের ক্লাব ছিল তোদের?” গলা চড়াল শ্রীজাতা।

প্রেরণা অবাক হল খানিক।

“পার্থ, আমি আর প্রেরণা তিনজনেই একটা অকাল্ট ক্লাবের মেম্বার ছিলাম।”

“অকাল্ট ক্লাব! ইন্টারেস্টিং… ক্লাবটার সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছে করছে ভীষণ।”

“শাট আপ সমুদ্র, তুমি কি পাগল হলে? কীসব উল্টোপাল্টা বকছো?”

“পাগল তো আমি হয়েই গেছি প্রেরণা তাই তো আমাকে এখানে এনেছো তুমি। শুনুন শ্রীজাতা, আমাদের এই সিক্রেট ক্লাবের পত্তন করেছিলেন রোজালিন্ড নামে এক এংলো ইন্ডিয়ান মহিলা। অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে চর্চা করাই আমাদের ক্লাবের উদ্দেশ্য, ক্লাবের সকলের নেশাও বটে। এই কাজ করতে গিয়ে প্রাণও হারিয়েছে অনেকে, যেমন রোজালিন্ড নিজে। তবে…”

“ফর গড সেক তুমি চুপ করো সমুদ্র। ওর একটাও কথা বিশ্বাস করিস না শ্রীজাতা, কীসব উল্টোপাল্টা বকছে। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। তুই শোন…”

“আচ্ছা আমি সমুদ্রের মুখ থেকেই আগে শুনি না। তুই শান্ত হয়ে বসে থাক।”

“আই কান্ট। ওর এসব পাগলামি আমি বরদাস্ত করতে পারবো না।”

“তুই এতো উত্তেজিত হয়ে ঘামছিস কেন প্রেরণা?”

“ঘামছি? কই না তো…”

“রোজালিন্ডের পর আমাদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হয়েছিল পার্থ। অত্যন্ত ধূর্ত, জটিল, নিষ্ঠুর একটা মানুষ। নিজের স্বার্থের জন্য লোকটা যা খুশি করতে পারে। শুধু তাই নয় সবাইকে ডমিনেট করার মধ্যে ও এক অদ্ভুত আনন্দ পেতো। পার্থকে আমি পছন্দ করতাম না, হয়তো দলের কেউই করতো না কিন্তু তাও আমাদের ওকে প্রেসিডেন্ট বলে মেনে নিতে হয়েছে তার কারণ ওর অসীম জ্ঞান, অনুসন্ধিৎসা আর সর্বোপরি একটা দলকে সঠিক ভাবে চালানোর ক্ষমতা যা আমাদের...”

সমুদ্রকে থামাতে চিৎকার করে উঠল প্রেরণা, “রাবিশ...”

“শান্ত হ প্রেরণা। সমুদ্র তো পার্থকে অপছন্দ করত, আর তুই?” খুব শান্ত গলায় প্রশ্নটা করল শ্রীজাতা।

চমকে উঠল প্রেরণা, “আমি?”

“পার্থ বলে কলেজ লাইফে তোর একজন প্রেমিক ছিল তাই না? তা সমুদ্রর সাথে লিভ ইন কবে শুরু করলি? এই পার্থ বসুই কি সেই পার্থ?”

“ইটস টু মাচ শ্রীজাতা, তোকে সমুদ্রের ট্রিটমেন্ট করতে বলেছিলাম। আমাদের পার্সোনাল লাইফে নাক গলাতে নয়।”

“সরি টু সে প্রেরণা, বাট একজন মানসিক রোগীর চিকিৎসা করতে গেলে তার পার্সোনাল ব্যাকগ্রাউন্ড সম্বন্ধে আমাকে জানতেই হবে।”

“ওকে… দেন লিসন। তোর কত টাকা ফিজ হচ্ছে বল আমি মিটিয়ে দিচ্ছি। তোকে আর সমুদ্রর চিকিৎসা করতে হবে না।”

মৃদু হাসলো শ্রীজাতা। প্রেরণাকে সে ছোটো থেকে চেনে। বরাবরই একটু লিডার গোছের ছিলো মেয়েটা, অসমম্ভব মনের জোর। এখনও পাল্টায়নি একটুও।

“আমি যে সুস্থ হতে চাই প্রেরণা।” সমুদ্রর কথায় চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল প্রেরণা। সমুদ্র কাতর গলায় বলল, “বিশ্বাস করো আমি আর নিতে পারছি না এসব। সবসময় কেমন যেন ভয় ভয় লাগে, মনে হয় এই বুঝি পার্থর আত্মা… আমি জানি শ্রীজাতা আমাকে কোনো সাহায্য করতে পারবে না, শুধু শ্রীজাতা কেন কেউই আমাকে সাহায্য করতে পারবে না।”

“যদি জানোই শ্রীজাতা কোনো হেল্প করতে পারবে না তাহলে বাড়ি চলো। এখানে আর নাটক করার দরকার নেই।” দাঁতে দাঁত চিপে কথাগুলো বললো প্রেরণা।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাথাটা নিচু করে চুপ করে গেল সমুদ্র। শ্রীজাতার চেম্বারটায় তখন প্রায় পিন পড়ার নিস্তব্ধতা, শুধু ঘড়ির কাঁটাটা টিকটিক করে সময় মেপে চলেছে।

মাথা তুলল সমুদ্র, “নাটক? তোমার থেকে ভালো নাটক কি আমি করতে পারি প্রেরণা?” সমুদ্রের গলার স্বর এক আকস্মিক পরিবর্তন। মুখটা সাদা হয়ে গেল প্রেরণার। কোনরকমে কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলল, “সমুদ্র…!”

“উঁহুঁ… সমুদ্র নয়, সমুদ্র নয়… বলো পার্থ। এতদিনেও চিনতে পারলে না আমাকে? নাকি চিনতে চাইছো না?” শেষ কথাগুলোয় শ্লেষ স্পষ্ট।

নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে প্রেরণা বলল, “সমুদ্র শোনো…”

“তোমার সমুদ্রর শরীরে এখন শুধু আমি… পার্থ। বাতাসিয়ার শয়তানের সহচরী খুব সযত্নে আমার আত্মাটাকে তোমার সমুদ্রের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল প্রেরণা। আজও বুঝলে না সে কথা?”

“সমুদ্র এসব তোমার মনের ভুল…”

“কী? আবার সমুদ্র? ওই ছেলেটার জন্যই আমাকে ঠকিয়েছিলে তুমি তাই না?”

“এসব… এসব কী বলছো…!”

জবাব না দিয়ে এক পা দু'পা করে প্রেরণার দিকে এগোতে থাকলো সমুদ্র। প্রেরণা ভয়ে পেছাতে পেছাতে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে থমকে গেল। সমুদ্র এবার চরম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপর, দুহাত দিয়ে গলাটা চেপে ধরল প্রেরণার। শ্রীজাতা ছাড়াতে যেতেই ওকে এক অমানুষিক শক্তিতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো সমুদ্র। ঘরের কোণে ছিটকে পড়ল শ্রীজাতা। তারপর চিৎকার করে উঠল সমুদ্র, “খুব শীঘ্রই তোমার সমুদ্রর সমস্ত শরীরটার দখল নিয়ে নেবো আমি, তখন কী করবে প্রেরণা?”

“সমুদ্র ফর গড সেক আমাকে ছেড়ে দাও প্লিজ…” কোনোক্রমে কথাগুলো বলার সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণা আর আতঙ্কে প্রেরণার দু'চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তৃতীয় জনের উপস্থিতি ভুলে সে বলে উঠল, “মনে করার চেষ্টা করো প্লিজ পার্থ মারা গেছে। ওসব পরীদের গল্প মিথ্যা…”

“মিথ্যা নয়, পার্থ মরেনি, পার্থ কোনোদিনও মরতে পারে না।” দাঁতে দাঁত চিপে কথাগুলো বলে প্রেরণার গলাটা আরও জোরে চেপে ধরল সমুদ্র। আর নিতে পারলো না প্রেরণা, অচৈতন্য হওয়ার আগে অস্ফুটে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো এক নির্মেদ স্বীকারোক্তি, “ভুলে গেলে বাতাসিয়ায় পার্থকে আমরা শেষ করেছিলাম নিজের হাতে…”

পাঠকেরা যা পড়ছেন