কালো বিড়াল - এডগার অ্যালান পো

যে কাহিনী লেখার জন্য এখন হাতে কলম নিয়ে বসেছি সেরকম একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় বা বলা যেতে পারে এরকম জান্তব ঘটনার বিবরণী আমি আগে লিখিনি। কোনোদিন যে লিখবো এরকম কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। আমাকে হয়তো আপনাদের পাগল বলেই মনে হতে পারে যদি আমি বলি, যে অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আমার নিজের মনই সেগুলোকে বিশ্বাস করতে চাইছে না। যেহেতু আমি পাগল নই এবং আমি স্বপ্নও দেখিনি তাই এই অদ্ভুত ঘটনার প্রমাণ রাখার জন্যই এ কাহিনী নথিবদ্ধ করে রাখছি।

আগামীকাল আমার জীবনের শেষ দিন... জীবনের শেষ মুহূর্তে আত্মার ওপর জমে থাকা উদ্বিগ্নতার অবসান ঘটানোই আমার অবিলম্ব উদ্দেশ্য। সে কারণেই বিশ্বজগতের সামনে আমি আমার ঘরোয়া জীবনের কিছু ধারাবাহিক ঘটনা লিখে রেখে যাচ্ছি। কোনোরকম ব্যক্তিগত মন্তব্য ছাড়াই। ওই সব ঘটনার পরিণতি, সংযুক্ত ঘটনাগুলির ভয়ঙ্করতা - আমাকে নির্যাতন করেছে - আমাকে শেষ করে দিয়েছে। তবুও আমি বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবো না তাদের কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে বার করার। এটাও ঠিক যে, অনেকের কাছেই হয়তো ব্যাপারটা খুব একটা আতঙ্কজনক মনে হবে না। কিন্তু আমার কাছে সেগুলো সামান্য নয়... ওরা এসেছিল ভয়াবহতার চরম মাত্রা নিয়েই। হয়তো বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা ভেবে চিন্তে এমন কিছু খুঁজে পাবেন যা আমার ভ্রান্ততা কমাতে পারে। শান্ত মনে, অনেক বেশি যুক্তি দিয়ে ভাবলে এবং আমার নিজের চেয়ে উত্তেজনার মাত্রা অনেক কম করতে সক্ষম হলে হয়তো এ ঘটনা খুব সাধারণ এক ঘটনা বলেই প্রতিভাত হবে। যার ভেতর খুঁজে পাওয়া যাবে স্বাভাবিক কার্যকারণ সম্পর্ক।

শৈশব থেকেই আমি আমার নৈতিকতা এবং নরম মনের স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলাম। আমার হৃদয় এতোটাই কোমল স্বভাবের ছিল যে আমার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে মজা করতো। বিশেষ করে নানারকম জীবজন্তুদের প্রতি টান ছিল খুব বেশি মাত্রায়। আমার বাড়িতেও ছিল অনেক রকম পোষা জীবজন্তু। ওদের সাথেই আমার অনেকটা সময় কেটে যেতো।

ওদের খাওয়ানো এবং দেখাশোনা করার মতো আনন্দ আমি আর কিছু থেকেই পেতাম না। এই স্বভাবটা বয়স বাড়ার সাথে সাথেই আরোই বৃদ্ধি পেলো। এই সবের ভেতর থেকেই আমি জীবনে বেঁচে থাকার উত্সাহটা কুড়িয়ে নিতাম। যারা জীবজন্তু পোষেন বিশেষ করে কুকুর, তারা হয়তো ওই মানবেতর প্রাণীদের ভালোবাসাটা ঠিক কী জিনিস, সেটা অনুভব করতে পারবেন। বিষয়টাকে ঠিকঠাক বুঝিয়ে বলা আমার পক্ষে একটু কষ্টকর। একে অনুভব করা যায়। পরীক্ষা করেও দেখা যায়। ওদের ভালোবাসাটা একেবারে হৃদয় ছুঁইয়ে অবস্থান করে।

আমার বিয়ে হয়েছিল অল্প বয়সেই। ভাগ্যটা সত্যিই ভালো ছিল আমার। কারণ পরের ঘরের সেই মেয়েটি আমার এই স্বভাবটাকে মেনে নিয়েছিল। সব সময়ে আমার পাশে পাশে থাকতো ওদের দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে। আমাদের পোষা জীবজন্তুর তালিকায় ছিল নানান রকম পাখি, গোল্ড-ফিস, একটা দারুণ কুকুর, অনেকগুলো খরগোশ, একটা ছোট বাঁদর এবং একটা বিড়াল।

শেষোক্ত প্রাণীটি এককথায় অসাধারণ। আকারে বেশ বড় এবং সুন্দর দেখতে। সম্পূর্ণ কালো গায়ের লোম এবং আচরণ অত্যন্ত ভালো। বুদ্ধিও যেন একটু বেশীমাত্রায় ছিল বিড়ালটার।

আমার স্ত্রী মানসিকভাবে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল না মোটেই, কিন্তু সেও বলতো এক প্রাচীন জনপ্রিয় ধারণার কথা। সমস্ত কালো বিড়ালেরা নাকি আসলে ছদ্মবেশী ডাইনি। তার মানে এই নয় যে এটা ও খুব একটা দৃঢ় বিশ্বাস থেকে বলতো। এসব নিয়ে এর আগে আমি কোনোদিন গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। কিন্তু ঘটনাগুলো পর পর ঘটে যাওয়ার পর এসব কথাগুলো আমার মনে ভেসে ভেসে আসছে।

বিড়ালটার নাম ছিল প্লুটো। আমার সবচেয়ে প্রিয় পোষা প্রাণী এবং সময় কাটানোর সঙ্গী। ওকে আমিই খেতে দিতাম। বাড়ি ছেড়ে কোথাও গেলে ও আমার সাথে সাথেই যেতো। রাস্তাঘাটে আমাকে অনুসরণ করা থেকে ওকে আটকানো একটা সমস্যার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

আমাদের এই অপ্রচলিত বন্ধুত্ব বেশ কয়েক বছর ধরে চলে। এদিকে সময়ের সাথে সাথে আমার মেজাজ এবং চরিত্রে একটা পরিবর্তন আসে— যার ফলে একটা অন্তর্বর্তী অমনোযোগিতার জন্ম হয়। আমি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম [কথাগুলো লিখতে নিজেরই লজ্জা হচ্ছে] বড়সড় ধরনের এক বাজে অভিজ্ঞতা অর্জনের পথে। যত দিন গড়াচ্ছিল আমি হয়ে উঠছিলাম অতিরিক্ত পরিমাণে ‘মুডি’... নিজের আচরণ অন্যের কাছে হয়ে উঠছিল বিরক্তিকর... অস্বস্তিজনক...

আশেপাশের মানুষজন কী চায় এটা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছিলো। নিজের দুর্ভোগের চাপ সামলাতে না পেরে মাঝে মাঝেই স্ত্রীর সাথে কথা বলার সময় আজেবাজে ভাষা প্রয়োগ করে ফেলছিলাম। এমনকি কখনো সখনো হাতও উঠিয়েছি ওর গায়ে। বাড়ীর পোষা প্রাণীগুলো, অবশ্যই, আমার এই মানসিক পরিবর্তন অনুভব করতে পেরেছিলো। ওদের দিকে নজর রাখার পরিমাণটা যে কমে গিয়েছিল আমার দিক থেকে এটা বলাই বাহুল্য। তাছাড়াও ওদের প্রতি আমার আচরণ হয়ে গিয়েছিল নিষ্ঠুর।

প্লুটোর ক্ষেত্রে অবশ্য তখনও নিজেকে অনেকটাই সংযত রেখেছিলাম। কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে আমার আচরণ হয়ে উঠেছিল জঘন্য। আদর পাওয়ার আশায় বা যে কোন কারণে ওরা আমার সামনে এসে গেলেই দিতাম কষিয়ে ঘা কতক।

এসবের পেছনে একটাই কারণ ছিল... যার মাত্রা দিন দিন বাড়ছিল... তার নাম অ্যালকোহল! ফলে সময় যত বয়ে যেতে থাকল আমার অভব্য আচরণের মাত্রাও বাড়তে থাকলো। এর হাত থেকে বয়স্ক জুবুথুবু হয়ে যাওয়া প্লুটোও আর রক্ষা পেল না।

একদিন রাতে, পাঁড় মাতাল হয়ে সারা শহর চক্কর মেরে বাড়িতে ফিরলাম। ইদানিং প্লুটো আর আমার সাথে সাথে যেতো না। ভালোই লাগতো সেটা। কাছেও আসতে চাইছিল না ওইদিন। জোর করে ধরলাম ওকে। ও ভয় পেয়ে আমার হাতে কামড়ে দিলো। সাথে সাথেই একটা দৈত্যসম ক্রোধ আমার ভেতরে জেগে উঠলো। নিজেকেই চেনা বা বোঝার ক্ষমতা আমার ভেতর থেকে মুছে গেল ওই মুহূর্তে। আমার নিজের আত্মা মনে হয় ওই সময়ে আমার শরীর ছেড়ে বিদায় নিয়েছিল। তার বদলে এক শয়তানসুলভ অপ্রতিরোধ্য উগ্রতা জিন নামক পানীয়ের উচ্ছাসে মেতে শরীরের প্রতিটা মাংসপেশিতে এক রোমাঞ্চ জাগানো উদ্দাম নাচ শুরু করে দিলো। ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে বার করলাম ছোট্ট ছুরিটাকে... বার করে আনলাম ওটার চকচকে ফলাটাকে... চেপে ধরলাম বেচারী বিড়ালটার ঘাড়ের কাছটা... তারপর ওর একটা চোখ চাকুটা দিয়ে খুবলে উঠিয়ে নিলাম অক্ষি কোটরের ভেতর থেকে। ওই লজ্জাজনক অত্যাচারটা করার সময় একটা আয়না সামনে থাকলে নিশ্চিত দেখতে পেতাম আমার শয়তান সুলভ লাল মুখাবয়ব... আমার ভেতরে যেন একটা আগুন জ্বলছিল গনগন করে... কাঁপছিলাম থরথরিয়ে...

পরের দিন সকালে যখন ঘুম ভাঙলো – মনে ফিরে এলো গতরাতের বর্বরতার স্মৃতি... যার অর্ধেক ছিল ভয়াবহ আতঙ্কের আর বাকি অর্ধেক দুঃখবোধ। অনুভব করতে পারছিলাম একটা অপরাধ আমি করেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো পুরো ব্যাপারটা খুব একটা জোরালোভাবে আমাকে নাড়া দিচ্ছিল না। মনে হচ্ছিলো না যে এর কারণে আমার আত্মা খুব একটা অনুতপ্ত। কিছু সময়বাদেই আমি আবার অন্যান্য দিনের মতো বোতলের রঙিন পানীয়ের নেশায় ডুবে গেলাম সমস্ত স্মৃতিকে মুছে দেওয়ার জন্য।

 

এদিকে ধীরে ধীরে বিড়ালটা সুস্থ হয়ে উঠলো। খুবলে বার করে নেওয়ার ফলে সৃষ্ট চোখের গর্তটা বাস্তবিক অর্থেই একটা ভয়ঙ্কর চেহারায় বদলে দিয়েছিল ওর মুখটাকে। তবে বুঝতে পারছিলাম সেই অর্থে আর তেমন কোন যন্ত্রণা ওকে ভোগ করতে হচ্ছে না। গোটা বাড়ীতে স্বাভাবিকভাবে ঘুরে ফিরে বেড়ালেও প্রত্যাশিতভাবেই আমার উপস্থিতি অনুভব করতে পারলেই ভয়ের তাড়নায় পালিয়ে যেত। আমার ভেতরে আগের ভালো মানুষটার যেটুকু অংশ অবশিষ্ট ছিল সেটা ওর এই আচরণ দেখে প্রথম প্রথম খুব দুঃখ পেতো। কিন্তু খুব শীঘ্রই এই অনুভূতিটা বদলে গেল বিরক্তিতে। তারপর সেটা পরিণত হলো এক চূড়ান্ত এবং অবিশ্বস্ত মানসিক বিপর্যস্ততায়। সে এমন এক নেতিবাচক মানসিকতা যা আত্মিকভাবে কোনও দর্শন মানে না। যদিও আজ আমি নিশ্চিত নই যে আমার সেই ইতিবাচক আত্মাটা আর আমার ভেতরে বেঁচে আছে কিনা। প্রত্যেক মানুষের ভেতর এক আদিম জেদী ভাবাবেগ অবস্থান করে। এর মাধ্যমেই একজন মানুষের চরিত্র গঠন হয়। আর এর কারণেই একজন মানুষ কত শত বার এমন সব কাজ করে বসে যা তার করা উচিত নয়। ঠিক এই কারণেই আমাদের সব সেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে বেঁচে থাকা মুহূর্তগুলোর ভেতর থেকেও এমন অনেক কাজ আমরা করে ফেলি যা আসলে আইন লঙ্ঘন। ওই মুহূর্তে আমরা ওই সিদ্ধান্তকেই সেরা বলে ভেবে নিই। আমার আত্মার মধ্যে তখন নাচানাচি করছিল সেই নিয়ম ভাঙ্গার জেদ। আমি সাঙ্ঘাতিক কিছু একটা করার উদ্দামতা অনুভব করছিলাম। আমার আত্মা ছটফট করছিল হিসাববিহীন এক অনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করার জন্য। অনুরোধ করছিল আমাকে নিষ্ঠুর কিছু করার জন্য... শুধুমাত্র ভুল করার জন্যই জেনেবুঝে একটা ভুল কিছু করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছিল - অনুরোধ করছিল অসহায় ওই প্রাণীটির ওপর অত্যাচারের প্রণালী অব্যাহত রাখার জন্য। উত্যক্ত করছিল আঘাত করার জন্য।

অবশেষে একদিন সকালে, ঠান্ডা মাথায়, বিড়ালটার গলায় জড়িয়ে দিলাম দড়ির ফাঁস... এবং ঝুলিয়ে দিলাম ওকে একটা গাছের ডালে। বিশ্বাস করুন ওই কাজ করতে গিয়ে আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসেছিল। বুকের মধ্যে নিদারুণ এক যন্ত্রনার অনুশোচনার অনুভুতির অনুভব হচ্ছিল। এর একমাত্র কারণ, আমি যে জানতাম ও আমাকে ভালোবাসে... সেকারণেই বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ করার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি আমার জঘন্য অপরাধের। বুঝতে পারছিলাম আমি যা করছি তা পাপ— এমন এক মারাত্মক পাপ যা আমার আত্মাকে বিভ্রান্ত করে দিয়েছে—সবচেয়ে দয়াময় ঈশ্বরও এর ক্ষমা করতে সক্ষম হবেন না।

যেদিন আমি ওই নিষ্ঠুর কাজটি করি সেদিন রাতে আমার ঘুম ভেঙে যায় চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে। আগুন লেগেছে। বুঝতে পারলাম আগুন লেগে গেছে আমার বিছানার চাদরেও। পুরো বাড়িতেই জ্বলছিল আগুন। আমি, আমার স্ত্রী এবং একজন চাকর ওই বিধ্বংসী আগুনের হাত থেকে নিজেদের কোনোমতে বাঁচাতে সক্ষম হই। বাকি সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমার সব বিষয়আশয় সম্পত্তি ওই লেলিহান আগুনের গ্রাসে শেষ হয়ে যায়। আমি ডুবে যাই এক চরমতম হতাশার সাগরে।

কী থেকে কী হয়েছিলো এই কার্যকারণ খুঁজে বার করার মতো শক্তিও আমার ছিল না। তবে আজ পর পর ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করছি – চেষ্টা করছি খুঁটিনাটি সব কিছুই লেখার।

আগুনে সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমি ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাই। সহসাই একটা দেওয়ালের দিকে আমার চোখ পড়ে। বিশেষ ব্যতিক্রম বলা যেতেই পারে দেওয়ালটাকে। বাড়ীর সব দেওয়াল ভেঙে পড়ে গেলেও ওটা খাড়া হয়ে ছিল। খুব একটা মোটাও না। আমার বিছানার পেছন দিকে ছিল ওটার অবস্থান।

সম্ভবত ওটার গায়ের প্লাস্টার আগুনের হাত থেকে ওটাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। ওই দেওয়ালের সূত্রেই মানুষের ভেতর কথা চালাচালি শুরু হয়। ওটাকে দেখতে অনেক মানুষ জড় হয়েছিল। বিশেষ করে একটা নির্দিষ্ট অংশের দিকেই সবার আগ্রহী মনোযোগ গিয়ে পড়েছিল।

“অদ্ভুত!",”এরকম আগে দেখিনি!" ধরনের নানা মন্তব্য ভিড়ের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল। এগিয়ে গেলাম ব্যাপারটা কী, সেটা দেখার জন্য। যা দেখলাম তাতে আমার সারা শরীরে এক শীতল জলের স্রোত বয়ে গেল। সাদা দেওয়ালের গায়ে এক বিরাট মাপের বিড়ালের ছবি ফুটে উঠেছে। স্বীকার করতেই হবে এতো নিখুঁত দেওয়াল চিত্র আমি খুব কমই দেখেছি। আর তার চেয়েও অদ্ভুত কী জানেন... বিড়ালটার গলায় যে একটা দড়ি বাঁধা আছে সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে।

প্রথম দেখাতেই যে আতঙ্কের চাদর আমাকে ঘিরে ধরেছিল তার সঠিক বিবরণ দেওয়া আমার পক্ষে কঠিন। আশ্চর্যও কম হইনি। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে যে ভাবনা আমার মনে এল সেটা এরকম। বাগানের যে গাছে আমি বিড়ালটাকে ঝুলিয়ে দিয়েছিলাম সেটা আমার বাড়ীর লাগোয়া। যখন বাড়ীতে আগুন লাগে তখন সেটা দেখতে বেশ কিছু মানুষ ওই বাগানে ঢুকে পড়ে। তাদের মধ্যেই কেউ বিড়ালটাকে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায় এবং দড়ি কেটে ওটাকে আমার ঘরের খোলা জানলা দিয়ে ভেতরে ছুঁড়ে দেয়। ওটা এসে পড়ে ওই নতুন প্লাস্টার করা দেওয়ালের সামনে। বেড়ালের মরা শরীরের ওপর অন্যান্য দেওয়ালের ভেঙে পড়া টুকরো এসে পড়তেই ওটা চেপ্টে বড় হয়ে যায়। তারপর আগুনের তাপে ওই মৃতদেহ পুড়ে যে অ্যামোনিয়া গ্যাসের জন্ম হয় তার থেকেই ওই ছবিটা সৃষ্টি হয়েছে। আর এসবই নিশ্চিতভাবে ঘুম থেকে উঠে আমি এ ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ঘটে।

ব্যাপারটাকে এভাবে সাজিয়ে নিলেও আমার বিবেক কিন্তু আমাকে আমার করা অপরাধটাকে অবরে সবরে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো। শিহরণ উদ্রেককারী ঘটনাটাকে বিস্তারিতভাবে ভাবার চেষ্টা করার কারণেই হয়তো ওটা আমার মনের ওপর গভীর একটা ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তী কয়েক মাস আমি ওই বিড়ালটার ভাবনার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনি। এই সময়ে আমার ভেতরে এক অদ্ভুত রকমের অনুভূতি খেলা করতো... না সেটা ঠিক অনুশোচনা নয়।

বিড়ালটার মৃত্যুর জন্য যতটা অনুশোচনা করা উচিত, সেসবের অনেক দূরে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম নিজেকে। কিন্তু ওই গোত্রের প্রাণীদের দিক থেকে একটা ভয়ের তাড়না যেন সব সময় আমার পিছু পিছু ধাওয়া করে চলতো। বিশেষ করে প্লুটোর মতো কাউকে দেখতে পেলে সেটা বেড়ে যেত।

একদিন রাতে প্রায় পাথরের মূর্তির মতো নিথর বসেছিলাম — নিঃসীম আতঙ্ক ঘিরে ধরেছিল আমাকে—সমস্ত মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছিল একটা কালো বস্তুর ওপর —– যেটা অবস্থান করছিল একটা মদের পিপের ওপর! বেশ কয়েক মিনিট ধরে একদৃষ্টে ওটার দিকে তাকিয়েছিলাম। এই লেখা লিখতে গিয়ে যে ভাবনাটা আমাকে অবাক করে দিচ্ছে তা হলো ওই মুহূর্তে ওটা ঠিক কী তা বুঝে উঠতেই পারছিলাম না। অগত্যা উঠে গিয়েছিলাম ওটার কাছে... ছুঁয়ে দেখার জন্য।

একটি কালো বিড়াল! বেশ বড়সড় মাপের— একেবারে প্লুটো যে মাপের ছিল ঠিক সেই রকম। সব কিছু একেবারে একই রকম শুধু একটা ব্যাপার আলাদা। প্লুটোর গায়ে কোনও সাদা লোম ছিল না। কিন্তু এই বিড়ালটার গায়ে চোখে পড়ার মতো একটা অংশ ছিল যা সাদা লোমে ভরা। প্রায় গোটা বুকটাই সাদা বলা যায়।

একবার গায়ে হাত ছোঁয়াতেই বিড়ালটা উঠে দাঁড়ালো। বার কয়েক হাত বুলাতেই শুরু করলো আরাম পাওয়ার সেই চিরাচরিত ঘরঘর শব্দ। হাত বোলানো থামালেই আমার হাতে মাথা ঘষছিল প্রাণীটা। বুঝতে পারছিলাম আমার সঙ্গ ওর পছন্দ হয়েছে। ওই মুহূর্তে এরকম একটা প্রাণীকেই আমার খুব প্রয়োজন মনে হয়েছিল। বিড়ালটাকে নিজের কাছে রাখার ইচ্ছে থেকেই আশেপাশে একটু খোঁজখবর নিলাম। কিন্তু জানা গেল কেউ এর আগে ওটাকে এই এলাকায় কোনোদিন দেখেনি।

বিড়ালটার গায়ে বার কয়েক হাত বুলিয়ে ফিরে চললাম বাড়ির দিকে এবং দেখতে পেলাম ওটাও আমার পিছু পিছু আসছে। আসুক আসছে যখন। দু’তিন বার থেমে গিয়ে নিচু হয়ে ওর মাথায় গলায় হাতও বুলিয়ে দিলাম। বাড়ি পৌঁছাতেই ওটা ছুটে চলে গেল আমার স্ত্রীয়ের কাছে। সেও খুব আদর করেই ওটাকে কোলে উঠিয়ে নিলো।

কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই অনুভব করলাম বিড়ালটাকে কেন জানি না আমার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। এরকম কিছু যে হতে পারে এটা কিন্তু আমি প্রত্যাশা করিনি। সম্ভবত প্রাণীটার অত অতিরিক্ত পরিমাণে গায়ের কাছে ঘুর ঘুর করাটা আমার মনে বিরক্তির জন্ম দিচ্ছিলো। আরো কিছুদিন যেতেই ওই তিক্ত ভাবনাটা আস্তে আস্তে জমাট বেঁধে পরিণত হলো ঘৃণাতে। চেষ্টা করছিলাম ওটার থেকে দূরে থাকার... এড়িয়ে যাওয়ার। আগেরটার সাথে যে নিষ্ঠুরতা করেছি তার থেকে জন্ম নেওয়া এক লজ্জা আমাকে আটকে রাখছিল সরাসরি এই বিড়ালটার গায়ে আঘাত করা থেকে। বেশ কয়েকটা সপ্তাহ নিজেকে সামলে রাখলাম। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ হাতের বাইরে চলে যেতে শুরু করলো। ওটাকে দেখতে পেলেই একটা অযৌক্তিক ঘৃণার ভাব আমার ভেতরে গুলিয়ে উঠতে শুরু করতো। আশেপাশে ওটা আছে বুঝতে পারলেই আমি নিঃশব্দে সেখান থেকে পালিয়ে পালিয়ে যেতাম।

কোন সন্দেহই নেই এই নতুন বিড়ালটার ওপর আমার ঘৃণা আরো বেড়ে যায় যেদিন জানতে পারি প্লুটোর মতোই এটারো একটা চোখ কানা। এই ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল আমার স্ত্রী। যে কারণে ও ওকে একটু বেশিই ভালবাসতো। যা আমার মোটেই পছন্দ হতো না। অথচ এই আমিই কোনো একসময়ে এসবের ভেতরে থেকেই সহজ সরল আনন্দগুলো খুঁজে পেতাম। কিন্তু তখন তো আমি বদলে যাওয়া মানুষ।

একদিকে বিড়ালটার প্রতি আমার ঘৃণা যেমন বাড়ছিল অন্যদিকে বিড়ালটা যেন আমার আরো ন্যাওটা হয়ে পড়ছিল। আমার পায়ের আওয়াজ যে কী পরিমাণে চিনতে পারত তা আমি লিখে বোঝাতে পারবো না। যখনই আমি চেয়ারে গিয়ে বসতাম হয় ওটা চেয়ারের নিচে শুয়ে পড়তো অথবা লাফিয়ে উঠে পড়তো কোলের ওপর। সাথেই বিরক্তিকর ভাবে গা ঘষে ঘষে নিজের আনুগত্য জানাতো। যদি আমি উঠে হাঁটতে শুরু করতাম তো ওটা এমনভাবে আমার পায়ের ভেতর দিয়ে চলাফেরা করতো যে হুমড়ি খেয়ে পড়ার উপক্রম হতো। আবার কখনো কখনো লাফিয়ে উঠে আসতো বুকের কাছে, বড় বড় ধারালো নখ দিয়ে পোশাক আঁকড়ে ধরে ঝুলে থাকতো। আর এই সময়েই মনের ভেতর জেগে উঠতো বিরক্তির ভাবটা। মনে হত দুহাতে ধরে ছুঁড়ে ফেলে দিই ওটাকে। যদিও সেটা করতাম না, কারণ আগেই বলেছি — সেই অপরাধবোধ।

আপাতত একটা স্বীকারোক্তি করেই রাখি, শুধু অপরাধ বোধ নয়, আমি ওই বিড়ালটাকে ভয় পেতাম।

এই ভয় বা আতঙ্কটা কোনও শারীরিকরূপধারী কিছুর মোটেই ছিল না— ঠিক বলে বোঝাতে পারছি না বোধহয় বিষয়টাকে। আমাকে এক অদ্ভুতরকমের লজ্জাবোধ ঘিরে রেখেছিল— হ্যাঁ, সেই লজ্জা আমার অন্তরের ভালো মানুষটা পেতো। আতঙ্কগ্রস্থ হত আমার দ্বিতীয় সত্তাটা। অথচ ক্ষুদ্র ওই প্রাণীটা মোটেই দৈত্য দানব কিছুই ছিল না।

আমার স্ত্রী একাধিকবার আমার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিল এই নতুন বিড়ালটার বুকের কাছের সাদা রোঁয়াগুলোর দিকে। ওগুলোই ছিল আমার হত্যা করা বিড়ালটার সাথে এই বিড়ালের একমাত্র পার্থক্য। যারা এ আখ্যান পড়ছেন তাদের নিশ্চিত মনে আছে আমি আগেই বলেছি অনেকটা জায়গা জুড়ে ছিল ওই সাদা রোম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আমি ওই দাগের সাথে আর একটা জিনিষের রূপরেখার মিল খুঁজে পেতাম। নিশ্চিতভাবেই সেটা কল্পনাপ্রসূত ছিল— তবুও সে এমন এক জিনিষ যার নাম ভেবেই আমি থর থর করে কেঁপে উঠতাম। ঠিক ওই কারণেই আমার ঘেন্না হতো— ভয় হতো— আমার মন চাইতো ওই কালো দানবের হাত থেকে মুক্তি পেতে...

খুব ইচ্ছে হচ্ছে না আপনাদের... ওই দাগের সাথে আমি ঠিক কীসের মিল দেখতে পেতাম সেটা জানার? সে এক অত্যন্ত ভয়ানক জিনিস — তার নাম ফাঁসিকাঠ!

আমার মনের ভেতরের জমে থাকা কষ্ট এবং অপরাধবোধের যে নির্মম মন্থন চলছিল সেখান থেকে আগামী মৃত্যুর ওই একটাই ছবি আমি দেখতে পেতাম ওটার দিকে তাকালেই!

আমি আর পারছিলাম না সহ্য করতে। আমার চিরন্তন মানবতাবোধ একটু একটু করে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিলো। নরম মনের মানুষটা পরিণত হচ্ছিল এক ক্রুদ্ধ পশুতে— সব কোমলতার বোধ অজ্ঞাত করাল গ্রাসে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল। এক পাশব সত্তা আমার ভেতর দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল প্রতিনিয়ত। কেন এই রকম অসহনীয় কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে! হে ঈশ্বর! একটা দিন বা রাত কি শান্তি পেতে পারি না আমি?

আগে যেটা ছিল সেটা কখনোই আমাকে একা থাকতে দিতো না। আর এখন যেটা জুটেছে সেটা অবিরত আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কখনো সে উঠে আসছে আমার বুকের ওপর তার দুঃসহ ভার নিয়ে — ওর গরম নিঃশ্বাসে আমি অনুভব করছি নরকাগ্নির জ্বলন— এ এক এমন নাছোড়বান্দা দুঃস্বপ্ন যা সমানে আমার হৃদপিণ্ডের ভেতরে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলেছে!

এই ধরনের অসহনীয় মানসিক চাপের দ্বারা নিষ্পেষিত হতে হতে আমার ভেতরে যেটুকু ভালো ছিল সেটা এক সময় কোথায় যেন হারিয়ে গেল। যত রাজ্যের খারাপ খারাপ চিন্তা আমার মাথার মধ্যে নেচে বেড়াতে শুরু করলো। সেসব চিন্তা অতিমাত্রায় জঘন্য তমসাচ্ছন্ন। এর প্রভাবে আমার মেজাজ দিন দিন চড়ছিল সপ্তমে। আশেপাশের কোন কিছুকেই আর সহ্য করতে পারছিলাম না। তা সে পশু হোক বা মানুষ। আমার আসল আমিটা সেই অনিয়ন্ত্রিত মহাক্রোধের বিস্ফোরণ সহ্য করতে না পেরে কোথায় যেন হারিয়ে লুকিয়ে পড়েছিল। এর যাবতীয় রেশ সহ্য করতে হত আমার শত অত্যাচারে মুখে রা না কাটা অসহায় স্ত্রীকে। এত কিছুর মাঝেও সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যেত নিজেকে স্বাভাবিক রাখার।

ইতিমধ্যে আমার আর্থিক অবনতিও হয়েছিল চরম। সেই পুরোনো ভাঙাচোরা বাড়িটাতেই বাস করছিলাম বাধ্য হয়ে। একদিন সেই বাড়ির সেলারে যেতে হয়েছিল কিছু জিনিষপত্র নিয়ে আসার জন্য। আমার সাথে আমার স্ত্রীও ছিল। সরু সিঁড়িটা দিয়ে নামছি এমন সময় কোথা থেকে হাজির হলো সেই বিড়ালটা।

ওকে দেখেই আমার মাথার ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। দানবিক এক ক্রোধ আমার মধ্যে তুর্কি নাচ নাচতে শুরু করলো। নিচে নেমে হাতে তুলে নিলাম একটা কুঠার। কী করতে যাচ্ছি বুঝতে পেরেই আমার স্ত্রী আমার হাত চেপে ধরলো। ব্যস— বাধা পেতেই আমার ভেতরের পিশাচটা এবার বেরিয়ে এলো এক লাফে। এক ঝটকায় ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে ওই কুঠার দিয়েই— মারলাম এক ঘা!

ধারালো ফলাটা গেঁথে বসে গেল বেচারীর মাথার ঠিক মাঝখানে। না একটাও আওয়াজ এবারেও সে করলো না। বিস্ফারিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে। প্রাণহীন দেহ নিয়ে...

কী জঘন্য কাজ করে ফেলেছি যখন বুঝতে পারলাম তখন একে গোপন করার ইচ্ছেটাই আমার মাথায় এলো সবার আগে। আমার পাশবসত্তা আমাকে মদত দিলো। আমি বুঝতে পেরেছিলাম রাতে বা দিনে কোন সময়েই এ মৃতদেহ এই বাড়ী থেকে লোকচক্ষুর অগোচরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। প্রতিবেশীদের চোখে পড়ে যাবোই।

একের পর এক পরিকল্পনার স্রোত আমার মাথায় ভেসে এলো। একবার মনে হল মৃতদেহটাকে কুচি কুচি করে কেটে আগুনে পুড়িয়ে ফেলবো। তারপর মনে হল, না এর চেয়ে এই ঘরের মেঝেতে একটা গর্ত খুঁড়ে শরীরটাকে পুঁতে দেবো। আবার এটাও মনে হলো, বাগানে কুয়োর ভেতর ফেলে দিলেও তো হয়। কিংবা একটা বাক্সের মধ্যে দেহটাকে ঢুকিয়ে লোক ভাড়া করে দূরে কোথাও ফেলে আসার ব্যবস্থা করলেই বা ক্ষতি কী। এরকম সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমার মাথায় দারুণ একটা আইডিয়া এসে গেল। কোথায় যেন পড়েছিলাম। মধ্যযুগে সন্ন্যাসীরা তাদের শত্রুদের হত্যা করার পর মৃতদেহগুলোকে এভাবেই লুকিয়ে ফেলতেন।

যেখানে তারা বসবাস করতেন সেই বাড়ীর মোটা দেওয়াল খুঁড়ে তার ভেতরে শরীরটাকে ঢুকিয়ে নতুন করে ইঁট দিয়ে গেঁথে দিতেন ওরা।

হত্যাকাণ্ড ঘটে যাওয়ার পর চতুর্থ দিনের মাথায় বাড়ীতে অপ্রত্যাশিতভাবে পুলিস এসে উপস্থিত হলো। জানালো বিশেষ কারণে তারা এ বাড়ীর খানাতল্লাসী করে দেখবে। আমি কোনোরকম বাধা দিইনি। বিব্রতও বোধ করিনি। কারণ আমার হত্যালীলার সমস্ত প্রমাণ এতো নিপুণভাবে আমি গোপন করে দিয়েছি যে কারো বাবার ক্ষমতা নেই সেটা খুঁজে বার করে।

যারা এসেছিলেন তারা তল্লাসি চালানোর সময় আমাকে তাদের সাথে থাকার নির্দেশ দেন। গোটা বাড়ীর আনাচেকানাচে আঁতিপাতি করে খুঁজে দেখেন ওরা। অন্তত বার চারেক ওরা সেলারটাকেও ঘুরে ঘুরে দেখেন। আমার মুখের একটাও পেশী একটু সময়ের জন্যেও বিকৃত হতে দিইনি। মুখে ফুটিয়ে রেখেছিলাম নেহাত গোবেচারার ভাব। হৃদপিণ্ডের চলনে ছিল না সামান্যতম বেচাল। ওদের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে সব জায়গায় গেলাম। বুকের ওপর দুহাত গুটিয়ে জড় করে রেখেছিলাম সর্বক্ষণ। উত্তেজনার বিন্দুমাত্র কেউ দেখতে পায়নি আমার আচরণে।

পুলিশের দলটা সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হয়ে এক সময় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। সেটা শুনেই আমার হৃদপিণ্ড এবার তড়াং তড়াং করে লাফাতে শুরু করেছিলো। সেটাকে আটকানোর ক্ষমতা আমার ছিল না। ওদের উদ্দেশে কিছু একটা বলার জন্য আমি ছটফট করে উঠেছিলাম। আমি তো জিতে গেছি। একেবারে নিশ্চিত হতে হবে যে ওরা আমার নির্দোষ হওয়ার বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দিহান নন।

“জেন্টলমেন,” বলেই ফেললাম, দলটা কিছুটা এগিয়ে যেতেই, “আমি খুশি যে আপনাদের সন্দেহ নিরসন করতে পেরেছি। আমি চাই আপনারা সকলে ভালো থাকুন এবং সৌজন্য সহকারে জীবন যাপন করুন। সাথেই আরো একটা কথা না বলে পারছি না এই – এই বাড়িটা খুব ভালো করে বানানো হয়েছিল।”

[ওই সময়ে সহজ স্বাভাবিক কিছু কথা বলার উদ্দেশ্য থাকলেও, আমি নিজেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না আসলে আমি কী বলতে চলেছি।]

“ইয়ে জেন্টলম্যানস, বলতে চাইছি যে এই বাড়ীর দেওয়ালগুলো খুবই মনোযোগ দিয়ে বানানো হয়েছিল। আরে আপনারা কি চলে যাচ্ছেন? বুঝতে পেরেছেন আশাকরি এইসব দেওয়ালগুলোকে অতিরিক্ত মাল মশলা সহযোগে বানানো হয়েছিল?” আমার বলা কথাগুলোকে নিছক উদাসীনতার সাথে প্রমাণ করার অছিলায় একটা বেতের লাঠি হাতে তুলে নিয়ে দমাদ্দম কয়েক ঘা কষালাম দেওয়ালের গায়ে। ঠিক সেই জায়গাটায় যেখানে আমার স্ত্রীয়ের মৃতদেহটা পুঁতে রাখা আছে।

সেই দাঁত নখ ওয়ালা প্রাণীটার সংস্পর্শ থেকে আমাকে বাঁচাতে পারতেন একমাত্র ঈশ্বর! সেটাও হলো না। চিৎকার করে লাঠি ঠুকে আমি যা বলে চলেছিলাম সেটার প্রতিধ্বনি সহসাই যেন নিশ্চুপ হয়ে গেল। তার কারণ একটা শব্দ। একটা মৃদু কান্নার মতো শব্দ! মনে হচ্ছিল কোনো এক কবরের ভেতর থেকে উঠে আসছে যেন!

প্রথমটায় থেমে থেমে বাচ্চা শিশুর ফুঁফিয়ে কান্নার মতো— তারপর হঠাৎ খুব জোরে – পিলে চমকানো –দিয়েই একঘেয়ে একটানা শিহরণ জাগানো অমানবিক চিৎকারের স্রোত – পাশবিক গোঙানি – একই সাথে সে আওয়াজে মিশে ছিল কষ্টের অনুভুতি, আতঙ্কের প্রচ্ছায়া এবং বিজয়ের উল্লাস! সে শব্দকে তুলনা করা যেতেই পারে অশ্রুত নারকীয় সঙ্গীতের সাথে। সেই সব প্রেতেদের আর্তনাদ যারা তাদের অভিশপ্ত নরকবাসের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে চলেছে।

সত্যি কথা বলতে এর বর্ণনা দেওয়া বৃথা বাক্যব্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি পায়ে পায়ে পিছু হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিলাম দেওয়ালের কাছে। ওদিকে সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অনুসন্ধানকারী দলটাও থমকে গিয়েছিল পাথরের মূর্তির মতো। আতঙ্ক এবং কৌতূহল ফেটে পড়ছিল তাদের চোখেমুখে।

সময় নষ্ট না করে একসাথে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো দেওয়ালটার ওপর। ছাড়িয়ে দিলো কয়েকদিন আগেই করা প্লাস্টার। মৃতদেহটায় ইতিমধ্যেই পচন ধরে গিয়েছিল। তবু সোজা দাঁড়িয়ে তার গলে যাওয়া চোখ দিয়ে ড্যাবড্যাব করে সামনের দিকে তাকিয়েছিল।

আর তার মাথার ঠিক ওপরে লাল টকটকে জিভ আর একমাত্র চোখটায় আগুন ঝরানো দৃষ্টি নিয়ে বসেছিল সেই ভয়ানক জন্তুটা। যার কারণে আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছিলাম।

ওটার নারকীয় কান্নার শব্দের কারণেই আজ আমি পৌঁছে গিয়েছি ফাঁসির দড়ির খুব কাছে।

সেদিন তাড়াহুড়োতে অজান্তেই ওকেও গেঁথে দিয়েছিলাম দেওয়ালের ভেতর!

পাঠকেরা যা পড়ছেন