গাছপাথর - দেবলীনা চট্টোপাধ্যায়

অলংকরণ - প্রতিম দাস

বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসেছিলেন অনন্তবাবু, “আরে মশাই হয় হয়! এ দুনিয়ায় সবই হয়।” আর ঝট করে আমার মনে পড়ে গেছিল ঝুরিদিদার কথা।

আমার ঝুরিদিদা। বাতাসের গায়ে আঁকিবুকি কেটে,কখনো বা খলখল করে হেসে গড়িয়ে পড়ত,কখনো বা মেয়েদের ইস্কুলের বড়দিদিমণির মতো কোমরে হাত দিয়ে কাদের যেন বকাঝকাও করত। আশেপাশের যত অদেখা, অজানা জিনিসের হদিশ ছিল ঝুরিদিদার কাছে। লোকে অবশ্য আড়ালে পাগলী বলত। ছোটটি ছিলুম তখন। চোখ দুটোকে যতদূর সম্ভব গোল্লা গোল্লা করে প্রাণপণে সেসব দেখার চেষ্টা করতুম আমিও। কিন্তু কিছুই ছাই চোখে পড়ত না! এক বাদলা-বিকেলে দেখেছিলুম মিত্তিরদের পানা পুকুরটায় পা ডুবিয়ে বসে আপনমনে আবোলতাবোল বকছে ঝুরিদিদা, আমি কাছে যেতেই সড়সড় করে এক মানুষ লম্বা কী এক কদাকার জীব যেন জলে নেমে গেল। ঠিক যেন কুমির আর পেঁচার শরীর মিলেমিশে তৈরী এক উদ্ভট জিনিস! “ওটা কী গো?” জিজ্ঞাসা করতেই নিশ্চিন্ত গলায় বলেছিল, “ও ডুগডুগি। সেই কবে যেন পথ ভুলে পিথিবিতে এয়েছিল, তাপ্পর থেকে এই মিত্তিরদের পুকুরেই রয়ে গেছে। এট্টু বিষ্টির জল নে গেল। আসলে ওদের ওখানে তো বিষ্টি হয় না!”

—“পথ ভুলে পৃথিবীতে এসেছিল! মানে? ওর বাড়ি তবে কোথায়?” চোখ কপালে তুলেছিলাম আমি।

—“কী যেন নামটা বলেছিল... বড্ড খটোমটো। এই আমাদের পিথিবির মতনই ওদেরও আলাদা একখান পিথিবি আছে গো বুতুবাবু।”

—“যাহ! আরেকটা পৃথিবী! তাও আবার হয় নাকি!” স্পষ্ট অবিশ্বাসের সুর ছিল আমার গলায়।

প্রায় দন্তহীন মাড়ির মধ্যে ঝুলে থাকা এক দুটো পানখাওয়া কালচে দাঁত বের করে হেসেছিল ঝুরি দিদা, “হয় লো হয়। শোন বুতু। মনে রাখবি, আসলে হয় না বলে কিছু হয় না।”

সেই প্রথম। আমাদের রোজকার একঘেয়ে দেখাশোনার বাইরে যে আরো একটা দেখার আর শোনার জায়গা আছে, সেই দরজাটুকু আমার সামনে খোলে ঝুরিদিদার হাত ধরে। আজও মাঝেমধ্যে মনে হয়, সত্যিই কি পাগল ছিল ঝুরিদিদা? নিজের মতো করে আজগুবি অলীক কল্পনার জগৎ বানিয়ে হয়ত তাতেই নিশ্চিন্ত ছিল! কিন্তু তারপরেই মাথার ভেতর ভুস করে ডুবসাঁতার দিয়ে উঠে আসে সেই সমস্ত স্নায়ু অবশ করা ভয়াল কদর্য ঘটনাগুলো, যা ঘটেছিল আমার নিজের চোখের সামনে! সেই সমস্ত কল্পনাতীত অভিজ্ঞতার মধ্যে পড়ে আতঙ্কে হিম হয়ে গেছিল ডাকাবুকো এই বিতংস খাসনবীশের রক্তও! সেই সমস্ত অবিশ্বাস্য অদ্ভুতুড়ে ঘটনা, যার কোনোরকম ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না আজও। তখনি মনে হয়, হয়তো সত্যিই হয় না বলে কিছু হয় না। এখন পঁয়ষট্টি বছর বয়সে জীবনের এই শেষবেলায় এসে ইচ্ছে জাগে, কোথাও লিখে রাখি সেসব। হয়তো কোনোদিন কেউ পড়বে না, জানবে না... তাও,আমার সঙ্গে সঙ্গেই চিরতরে হারিয়ে যাবে এই অভিজ্ঞতাগুলো, এ যেন মানতে মন চায় না। সারাটা জীবন খবরের পেছনে দৌড়ে দৌড়ে বিয়ে-থাও করে ওঠা হয়নি। এখন আছে শুধু গড়িয়ার এই দু কামরার ফ্ল্যাটে একা একা বসে পুরোনো দিনের কথা মনে করা, আর নিজের সঙ্গে কথা বলা আমার এই খসড়া খাতার পাতায়। এটুকুই।

কিন্তু হঠাৎ করে আজ অনন্ত বাবুর কথাই কেন মনে পড়ল আমার? এর জন্য দায়ী অবশ্য রাণুর মা। ক’দিন ধরে কেমন যেন পেটটা ভুটভাট করছিল, রাণুর মা-কে বলেওছিলুম সে কথা। আজ সক্কাল সক্কাল এসে ঘরের কাজ শুরু করার আগেই আমার মুখের সামনে ধরল এক গ্লাস ঘন সবুজ তরল। কেমন যেন ঘাস ঘাস গন্ধ। “কী এটা?” জিজ্ঞাসা করতেই সহর্ষ উত্তর এল, “এ হইল গিয়া পাতরকুচি গাছের রস গো দাদাবাবু! খেইয়ে দ্যাকো দিকিনি, শরীল একদম তর হই যাবে!”

পাথরকুচি গাছ! এই একটা শব্দ... আর এক ধাক্কায় আমার মনে পড়ে গেল বছর কুড়ি আগের একটা ঘটনা।

সাতানব্বই বা আটানব্বই সাল। আনন্দবাজারের স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে চরম বাউন্ডুলে জীবনযাপন করছি তখন। কাজের জগতে বরাবরই আমার নাম ছিল উদ্যমী হিসেবে। আর এই শেকড়হীনভাবে ভেসে বেড়ানো, বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন অভিজ্ঞতা চেখে দেখাটা খুব প্রিয় ছিল বলে নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ নিউজ কভার করার জন্য এডিটর সবার আগে বেছে নিতেন আমাকেই। তেমনি একটা কাজের জন্য ডাক এল বোলপুরে যাওয়ার। বিরোধী দলের এক সর্বভারতীয় নেতার বিরাট জনসভা হবে বোলপুরে, তাই নিয়ে রাজ্যরাজনীতি সরগরম। বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন হয়েছে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লুম বোলপুরের উদ্দেশে। জনসভার রিপোর্ট দেওয়া তো বটেই, সঙ্গে একটা সুপ্ত ইচ্ছেও ছিল। ভোরবেলা ওখানে স্টেশনে নামামাত্র বুঝলাম বোলপুর এখন লালে লাল। না, আমি রাজনৈতিক রং এর কথা বলছি না... এ হল প্রকৃতির রং। সময়টা ছিল মোটামুটি মার্চের প্রথম, যেদিকেই তাকাই কৃষ্ণচূড়া, শিমূল, পলাশের মনভোলানো লাল-কমলা রঙের আগুন লেগেছে! মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনাটা আরো একবার ঘুরপাক খেয়ে নেচে উঠল। যাই হোক, প্রকৃতি থেকে তখনকার মতো মনটা সরিয়ে কাজে নেমে পড়লাম আমি আর ক্যামেরাম্যান সৌমিক। স্থানীয় নেতৃত্বের ইন্টারভিউ নেওয়া, পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য নোট করে-টরে সভার মাঠে পৌঁছতে পৌঁছতে বুঝলাম পেটের ভেতর ছুঁচোর ডনবৈঠক শুরু হয়ে গেছে। সকাল থেকে কয়েক কাপ চা আর বিস্কুট ছাড়া তো তেমন কিছু পেটে পড়েওনি। আমার মনের কথাটাই বলে উঠল সৌমিক, “চলুন দাদা, আগে পেটে চাট্টি দানাপানি ফেলার ব্যবস্থা করি। সারাদিন আবার কখন কী জোটে তার ঠিক নেই।” অতি উত্তম প্রস্তাব! মাঠের উল্টোদিকেই একটা দোতলা বাড়ির একতলায় বড় বড় করে লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল... ‘মা ভবতারিণী পাইস হোটেল’। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে পড়লাম। নামে পাইস হোটেল হলেও চা-বিস্কুট, ডিমটোস্ট, ঘুঘনি-মুড়ি... এমনকি রাতে রুটি-তড়কাও পাওয়া যায়। দুটো মাছ-ভাত বলে দিয়ে কাঠের বেঞ্চিতে বসে কথা বলছি এমন সময় প্রথম দেখলাম অনন্তবাবুকে।

হোটেলটায় মোটামুটি ভিড়। পার্টির লোকেরা অনেকেই ভাত খাচ্ছে, কেউ কেউ আবার চা-ডিমটোস্ট নিয়ে বসেছে। আমরা বসেছিলাম বিল কাউন্টারের কাছেই একটা টেবিলে। একটু পরেই দু হাতে ধোঁয়া ওঠা ভাত, ডাল, আলুভাজা, মাছের ঝোল সমেত থালা ব্যালেন্স করতে করতে এল হাফপ্যান্ট পরা একটা ছেলে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই “কী দাদারা, কলকাতা থেকে এলেন নাকি?” বলতে বলতে লেংচে লেংচে পাশে এসে বসলেন এক ফর্সা সৌম্যদর্শন ভদ্রলোক। বয়স মেরেকেটে বছর চল্লিশেক হবে, সুন্দর সুঠাম চেহারা, বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ। অবাক হয়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি করছি আমরা, বিগলিত হেসে প্লেটের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, “পারশে মাছটা খেয়ে দেখবেন, সব কটা ডিমভরা! আমি নিজে বাজারে গিয়ে এনেছি! হেঁ হেঁ!" মনে পড়ল একটু আগেই কাউন্টারে দেখেছিলাম এনাকে। সম্ভবত হোটেলের ম্যানেজার। ভদ্রলোক নিজেই পরিচয় দিলেন। অনন্ত চৌধুরী, হোটেলের মালিক। বেশ হাসিখুশি দিলখোলা টাইপের লোক অনন্তবাবু, কিছুক্ষণেই আড্ডা জমে উঠল। হয়তো কাউন্টার থেকে আমাদের কথা টুকরো টুকরো শুনেছিলেন, তারপর রিপোর্টার শুনে আরো উত্তেজিত হয়ে বললেন, “বাহ্! জীবন তো আপনাদের মতো হতে হয় মশাই! খবরের টানে কত কত জায়গা ছুটে বেড়ান... কত গা গরম করা ঘটনা! অ্যাডভেঞ্চারাস লাইফ একেবারে!”

—“বিতংসদা মানুষটাই তো পুরো অ্যাডভেঞ্চারাস”, ভাতে ঝোল মাখতে মাখতে ফুট কাটল সৌমিক, “যেখানে যত আজব উদ্ভট স্টোরি পাবে, সবার আগে দৌড়ে চলে যাবে!”

—“তাই! বাহ্,বেশ বেশ”,বলতে বলতে প্লেটের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বললেন, “দেখেছো কাণ্ড!” পরক্ষণেই বাজখাঁই হাঁক পাড়লেন, “অ্যাই বাচ্চু! মাছের তেলের ছ্যাঁচড়াটা দিসনি তো এনাদের! নিয়ে আয় শিগ্গির!” পড়িমরি করে বাটি হাতে তুরন্ত দৌড়ে এল হাফপ্যান্ট, সযত্নে পাতের পাশে ঢেলে দিল তেল চপচপে কালচে সবুজ ছ্যাঁচড়া। “আপনারা খান... যা লাগবে বলবেন, বাচ্চু দিয়ে দেবে... আমি ওদিকটা যাই গিয়ে...”, বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেলেন কাউন্টারের দিকে। তখনি দেখতে পেলাম একটু উঠে থাকা ঢলঢলে পাতলুনের নীচ দিয়ে তাঁর ডান পা-টা। অস্বাভাবিক রকম সরু লিকলিকে আর পায়ের পাতাটা প্রায় নাইন্টি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে বাঁকা।

এরপর সারাটা দিন যেন ঝড় বয়ে গেল। না, কোনো গোলমাল হয়নি। নেতাদের জ্বালাময়ী বক্তৃতা আর তার সঙ্গে সঙ্গে জনতার সোল্লাস গর্জন ও হাততালি আকাশ বাতাস কাঁপাতে লাগল। সভার শেষে মাঠের এক কোণে বসে সবিস্তারে গুছিয়ে লিখে ফেললাম রিপোর্ট। কথা ছিল সৌমিক রিপোর্ট নিয়ে রওনা হয়ে যাবে কলকাতা, আর আমি রয়ে যাব দিনদুয়েক... বসন্তোৎসব কভার করার জন্য। হ্যাঁ, এ আমার বহুদিনের স্বপ্ন... দোলের শান্তিনিকেতন দেখব, লালে লাল পলাশে ছাওয়া পথে হাঁটব খোয়াইয়ের ধার ধরে, বাউলের গান শুনব। তাই আসার আগেই এডিটরকে পটিয়েপাটিয়ে এসেছিলাম, বসন্তোৎসব কাটিয়ে ফিরব। তবে শর্ত একটাই ছিল, শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব নিয়ে একটা লেখা দিতে হবে রবিবারের পাতার জন্য। সৌমিকের ট্রেন সন্ধ্যে নাগাদ। গল্প করতে করতে স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগালাম দুজন। সৌমিকটা বরাবরের ছেলেমানুষ, একজন 'হরেক মাল' ফেরিওয়ালাকে ধরে দরাদরি করে একটা হুঁকো ডিজাইনের লাইটার কিনে ফেলল। আমার জন্য কিনল একটা চাবির রিং, তার পেছনে আবার ফোল্ডিং পেপার নাইফ। তারপর "খোয়াইয়ের মেলা থেকে আমার জন্য কিছু কিনতে ভুলো না যেন" বলে হাত নেড়ে ট্রেনে উঠে গেল। আমিও আগামী দুদিনের কথা ভেবে আনন্দে প্রায় উড়তে উড়তে স্টেশন থেকে পা বাড়ালাম শহরের দিকে। কিন্তু শহরের ভেতর লজ খোঁজ করতে গিয়ে বুঝলাম কী গভীর গাড্ডায় পড়েছি! বসন্ত উৎসব উপলক্ষে বোধহয় পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালি দল বেঁধে এসে পড়েছে বোলপুরে, শহরের লজগুলোর একেবারে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই’ দশা। মাথায় হাত আমার! খানদশেক লজ, কটেজ, বাংলো ইত্যাদি ঘুরে-টুরে যখন কী করি কী করি ভাবছি, ততক্ষণে পেট জানান দিতে শুরু করেছে ভাত খাওয়ার পর সভার মাঠে ঝালমুড়ি আর কয়েক কাপ চা ছাড়া তেমন কিছুই ঢোকেনি তার অন্দরে।

সামনে তাকিয়ে দেখলাম কখন যেন হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়িয়েছি ‘মা ভবতারিণী’-এর সামনে। গুটি গুটি ঢুকে একটা চা আর ডিমটোস্ট অর্ডার দিয়ে ব্যাগটা পাশে রাখলাম। সন্ধ্যে নেমে গেছে অনেকক্ষণ, বসন্তের ফুরফুরে একটা বাতাসও বইছিল... কিন্তু দুশ্চিন্তাটা আমার মাথা থেকে যাচ্ছিল না কিছুতেই। শেষমেষ স্টেশনে কোনোমতে রাতটা কাটিয়ে কাল সকালেই ফেরার ট্রেন ধরবো ভাবছি, খোঁড়াতে খোঁড়াতে পাশে এসে বসলেন অনন্তবাবু। হাতের চায়ের গ্লাসটা টেবিলে রেখে বললেন, “কী মশাই? একা কেন? আরেকজন কই?”

—“উঁ?”,স্টেশনের মশাদের কথা ভাবতে ভাবতে বেজার মুখে বললাম, “সৌমিক? সে তো ফিরে গেছে। আমার দুদিন থাকার কথা ছিল... কিন্তু কোত্থাও রুম পাচ্ছি না... কী মুশকিলে পড়লুম বলুন তো!”

—“হুম্”, চিন্তিত মুখে চায়ে চুমুক দিলেন অনন্তবাবু, “সত্যি চিন্তার কথা বটে। এই সময় এখানে ঘর পাওয়া...”, তারপর কী যেন ভেবে একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, “উপায় একটা আছে অবশ্য... কিন্তু আপনার অসুবিধে হবে হয়তো...”

ডিমটোস্ট চিবোনো বন্ধ করে উৎসুক হয়ে চাইলাম, “আছে? কী উপায় বলুন তো? স্টেশনের চেয়ে ভালো?”

হেসে ফেললেন অনন্তবাবু। তারপর কাঁধে হাত দিয়ে স্মিত কণ্ঠে বললেন, “অত ভাববেন না। আর কিছু না হোক এই গরীবের কুটিরখানি আছে। ছোট বাড়ি, তিনটি প্রাণীতে থাকি। কষ্টসৃষ্ট করে থাকলে কি আর একটা মানুষের জায়গা হবে না? তবে কলঘরটা বাড়ির বাইরে... চলবে তো আপনার?”

—“চলবে মানে!”, দুহাতে জড়িয়ে ধরলাম অনন্তবাবুর হাত, “দৌড়বে মশাই, দৌড়বে! কথায় বলে যদি হয় সুজন, তেঁতুল পাতায় ন’জন!”

—“আসুন তবে”, উঠে পড়লেন অনন্তবাবু। খোঁড়া পা-টা টেনে টেনে সামনে হাঁটতে লাগলেন, আমি ব্যাগটা কাঁধে তুলে পেছন নিলাম। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, ভাগ্যিস সকালে এই হোটেলটাতেই ঢুকেছিলাম! নাহলে এই বিপদের মধ্যে এমন সহৃদয় একজন মানুষের সাহায্য পেতাম কি?

হোটেলের পাশ দিয়ে একটা সরু পায়ে চলা পথ চলে গেছে। সেটা ধরে দু'মিনিট হাঁটলেই অনন্তবাবুর একতলা বাড়ি। বাড়িটার অবস্থা সত্যিই খুব একটা ভালো না। বাইরের দেওয়ালে রং নেই, শুধু পলেস্তারা... তাও যেখানে সেখানে ঝরে পড়েছে। বাড়ির সামনে কম পাওয়ারের একটা বাল্ব জ্বলছে, তাতে যতদূর বুঝতে পারলাম সামনে ছোটো উঠোনের পরে একটা সবুজ রঙের নীচু দরজা। অনন্ত বাবু দরজার সামনে গিয়ে “কই গো?” বলে হাঁক পাড়তেই আটপৌরে শাড়ি পরা এক গ্রাম্য মহিলা মাথায় ঘোমটা টেনে দরজা খুললেন। সম্ভবত অনন্তবাবুর স্ত্রী। দরজা পেরিয়ে ঢুকলে কলতলা, তারপরে দুটো ছোটো ছোটো ঘর। “ইনি হচ্ছেন খাসনবীশ বাবু, আনন্দবাজারের রিপোর্টার, বুঝলে?”,বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন অনন্তবাবু, “আর ইনি আমার অর্ধাঙ্গিনী।” জলভরা স্টিলের গ্লাস হাতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ভদ্রমহিলা, আমার নমস্কারের উত্তরে মাথা নত করে সলজ্জ হেসে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেন। ঢকঢক করে জলটা খেয়ে পরিতৃপ্তি হল। না, তৃষ্ণা নিবারণের জন্য নয়, দুশ্চিন্তার পর্ব মিটে শেষমেষ মাথার ওপর একটা ছাদ আর অনন্তবাবুর অন্তরঙ্গ আতিথেয়তায় তখন একটা শান্তির বাতাস সত্যিই বয়ে যাচ্ছে মনের ভেতর দিয়ে। ওদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনন্তবাবু, আমাকে একটা ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে গিয়ে বললেন, “আপনি জামাকাপড় পালটে নিন। তারপর কলঘরটা দেখিয়ে দিচ্ছি, মুখ হাত ধুয়ে নেবেন। রাতে কী খাবেন, ভাত না রুটি?” হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে দাওয়ায় এসে বসেছি, কাঁচের গ্লাসে করে চা আর খানকতক বিস্কুট রেখে গেলেন অনন্তবাবুর স্ত্রী। অন্য ঘরটা থেকে গরম ভাত ফোটার গন্ধ ভেসে আসছে, সঙ্গে ফোড়নের ছ্যাঁকছোঁক শব্দ। বুঝলাম ওটাই রান্নাঘর। চা খেতে খেতে অনন্তবাবু বলছিলেন নিজের কথা। “বাংলায় এম.এ করেছি মশাই। কিন্তু চাকরি জুটল না। আর এই যে পা দেখছেন, জন্ম থেকেই এরকম। মানে কুলিগিরি করেও যে খাবো, তারও উপায় নেই। হে হে হে।” হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেও তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণাটা ভালোমতই টের পাচ্ছিলাম আমি। মনটা ভার হয়ে যাচ্ছিল। সাংবাদিকতার খাতিরে প্রতিদিনই নানারকম মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়, তাই খুব কাছ থেকে দেখেছি এই শিক্ষিত বেকারদের জ্বালা কী! তার ওপর সে যদি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়। তাও তো অনন্তবাবু সৎ পথে থেকে সৎভাবে রোজগার করছেন, অনেকেই ক্ষোভে-দুঃখে ভুল রাস্তা ধরে। পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরালেন অনন্তবাবু, “ক’দিন একটা নাটকের দলে থিয়েটার করলাম। খোঁড়া লোক, ওই এক দুটো সাইড রোল দিত। তাও খুব ভালো লাগত জানেন, অনেক স্বপ্নও দেখতাম... কিন্তু টাকা? থিয়েটার করে পেট চালানো মুশকিল হয়ে পড়ছিল, অগত্যা এই হোটেল। অনেক কষ্ট করে দাঁড় করিয়েছি হোটেলটা। এখন মোটামুটি চলে যায় আর কী!" হাসলাম। এদিক ওদিক তাকিয়ে বললাম, “তা আপনার বাড়ির তৃতীয় সদস্যটি কোথায়? আলাপ করালেন না তো?"

-"কে, টুনি?", আধো অন্ধকার বারান্দাটার দিকে তাকালেন অনন্তবাবু,তারপর হাত তুলে বললেন, "ঘুমিয়ে গেছে। রাত হয়েছে তো।" অনন্তবাবুর হাত লক্ষ করে বারান্দার কোণের দিকে তাকালাম। টালির চাল থেকে মোটা হুক দিয়ে ঝোলানো আছে একটা বড়সড় খাঁচা,আর তার ভেতর পালকের মধ্যে ঘাড় গুঁজে ঘুমোচ্ছে একটা গাঢ় সবুজ রঙের টিয়া পাখি। "ও, আচ্ছা", হাসিমুখে বললাম, “আমি ভাবলাম টুনি বোধহয় আপনার ছেলে কিংবা মেয়ের নাম।" হঠাৎ কেমন একটা ছায়া পড়ল অনন্তবাবুর মুখে, শুকনো গলায় বিড়বিড় করলেন, “হুঁহ! ছেলে! মেয়ে! আমাদের কপালে নেই বুঝলেন! নইলে এরকম হয়? আরো কত কী যে কপালে আছে... হা ভগবান!" বলতে বলতে হঠাৎ যেন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল অনন্তবাবুর মুখ, ঠোঁট কামড়ে অন্ধকারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। চুপ করে বসে রইলাম। কী ঘটেছে হয়তো কিছুটা আন্দাজ করতে পারছি। কিন্তু আমার আশঙ্কার চেয়েও বাস্তবটা যে আরো ভয়ঙ্কর সেটা বুঝতে পারলাম যখন ফুঁপিয়ে উঠলেন অনন্তবাবু, “প্রথমবার আমার একটা ছোট্ট মেয়ে হয়েছিল... এই এত্তটুকু", দুহাত বুকের কাছে জড়ো করে বলে চললেন, "ভেবেছিলাম নাম রাখবো পরি! কিন্তু... মাত্র সাতদিন, জানেন... কী এক অজানা জ্বর হল, সাতদিনের মাথায় আমাদের ছেড়ে চলে গেল সে...”, অবরুদ্ধ গলায় বলতে থাকলেন, “এক বার নয়, তিন তিন বার! প্রতিবার জন্মানোর ক’দিনের মধ্যেই ভগবান তাদের কেড়ে নিতে থাকলেন আমাদের কোল থেকে। হয়তো এ জন্মে ‘বাবা’,‘মা’ ডাক শোনা আমাদের কপালে নেই... ভগবান চান না...”

আস্তে আস্তে হাত রাখলাম অনন্তবাবুর পিঠে। কিছু কিছু কষ্টের সান্ত্বনা হয় না, কোনো কোনো ক্ষতি অপূরণীয়ই থেকে যায়। পেছন থেকে একটা ফোঁপানির আওয়াজে ঘুরে দেখলাম, কখন যেন রান্নাঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছেন অনন্তবাবুর স্ত্রী। আমি পেছনে ঘুরতেই মুখে আঁচল চাপা দিয়ে একছুটে চলে গেলেন ঘরের মধ্যে। দুহাতে মুখ ঢেকে বসেছিলেন অনন্ত বাবু। বিড়িটা খসে পড়েছে দাওয়ায়। একটা গুমোট পরিবেশ ধীরে ধীরে চেপে বসছে আধো অন্ধকার বাড়িটায়, বহুকালের যন্ত্রণাদায়ক এক অধ্যায় যেন হঠাৎ-ই অপরিচিত বাতাসে খুলে গেছে। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। না জেনেশুনে কতখানি আঘাত করে ফেললাম আমি? আমার এই অনুশোচনা হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেই মুখ মুছে মাথা তুললেন অনন্তবাবু, হালকা স্বরে বললেন, “ছাড়ুন আমার দুঃখের কাহিনী। দুটো দিন বেড়াতে এসেছেন, মন খারাপ করলে হয় নাকি! এখন পুরো শান্তিনিকেতন সেজে উঠবে দোলের রঙে... আবীর উড়বে, পলাশ-কৃষ্ণচূড়া সেজে উঠবে... আপনার সব প্ল্যান করা হয়ে গেছে?”

—“হ্যাঁ,মোটামুটি”,বসন্তোৎসবের প্রসঙ্গে সামান্য সহজ হয়েছি আমি, “কাল ভোর ভোরই বেরিয়ে পড়ব। প্রথমে পাঠভবন, কলাভবন, ছাতিমতলা...”

—“বুঝেছি বুঝেছি”,আমাকে থামিয়ে দিলেন অনন্তবাবু, “তারপর কঙ্কালীতলার মন্দির, খোয়াইয়ের মেলা... ওই গড়পড়তা বাঙালী শান্তিনিকেতন এসে যা দেখে আর কী! তবে আপনি তো মশাই অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করেন? তাহলে আপনাকে এমন একটা জিনিসের কথা বলতে পারি, যা কোনো ট্যুরিস্ট গাইডলিস্টে পাবেন না।”

—“কী জিনিস?”,অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

—“একটা গাছ", মিটিমিটি হাসলেন অনন্ত বাবু।

—“মানে? গাছ আবার দর্শনীয় জিনিস নাকি?", আরো বেশি অবাক হয়েছি।

—“দর্শনীয় বলে দর্শনীয়! দেখলেই বুঝতে পারবেন কী জিনিস! ভগবানের এ এক আশ্চর্য সৃষ্টি! সৃষ্টি কেন বলি, এ স্বয়ং ভগবানই!”,উৎসাহে জ্বলজ্বল করে উঠল অনন্তবাবুর দুই চোখ।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। গ্রাম-গঞ্জ এলাকায় স্থানীয় মানুষ কুসংস্কার বশত গাছ-টাছের পুজো করে জানি। আর ধর্মভীরু লোকজনদের কাছে সেসব জায়গা দর্শনীয়ও হয়ে যায়। সেরকম কোনো কিছুর কথা বলছেন অনন্তবাবু? ধুস, তেমন কিছুতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। ব্যাপারটা নিয়ে আরেকটু আলোচনা করতে যাব, এমন সময় রান্নাঘরের দোরগোড়া থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে এল, “ভাত হই গ্যাছে।” উঠে পড়লেন অনন্তবাবুও, “চলুন, গরম গরম খেয়ে নিন। সামান্যই আয়োজন... খাওয়ার পরে নাহয় আবার বসা যাবে।” আমারও খিদেয় পেটে গানবাজনা শুরু হয়ে গেছিল, তাই তখনকার মতো বিষয়টা মুলতবি রেখে অনন্তবাবুর পেছন পেছন পা বাড়ালাম।

রান্নাঘরে ঢুকতে চোখে পড়ল মেঝের এক দিকে স্টোভ, বাসনপত্র, রান্নার জিনিসপত্র... আর অন্য দিকটায় পরিপাটি করে পাশাপাশি দুটি ফুলতোলা আসন পাতা, তার পাশে রাখা একটি করে জলভরা স্টিলের গ্লাস। অনন্ত বাবুর স্ত্রীর রুচি দেখে মন ভরে গেল। সঙ্গে ওনার রান্নার হাতও যে খারাপ নয়, সেটা মুখে গ্রাস তুলেই বুঝলাম। আমরা বসামাত্র দুটো কানা তোলা স্টিলের থালায় গোল করে সাজানো গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত, সরু করে কাটা আলুভাজা, বেগুনভাজা আর পাশে ছোটো বাটিতে ডিমের ঝোল এসে গেল। তৃপ্তি করে খেলাম। খাওয়ার পর মৌরি চিবোতে চিবোতে দাওয়ায় এসে বসলাম। কাল পূর্ণিমা। বিশাল থালার মতো চাঁদ উঠেছে। তার আলোয় ভেসে যাচ্ছে ছোট্ট উঠোনটা। তিরতির বাতাসে ভেসে আসছে কোনো এক নাম না জানা রাত-ফোটা ফুলের মিষ্টি গন্ধ। উদাস মুখে বসেছিলেন অনন্তবাবু। আমার মাথার মধ্যে কিন্তু ঘুরঘুর করছিল সেই গাছ দেখার কথাটা। একটু গলা খাঁকরে বললাম, “ইয়ে, ওই কী যেন গাছ দেখার কথা বলছিলেন তখন?"

-"আপনার বোধহয় এই গাছ দেখার বিষয়টা একটু বোকা বোকা লাগছে, না?", তীক্ষ্ম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কেমন একটা অদ্ভুত সুরে বলে উঠলেন অনন্তবাবু। অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। আমরা আমতা করে বলে উঠলাম, “না না! সেরকম কোনো ব্যাপার নয়... আমি তো তেমন কিছু... "

হঠাৎ উঠে এসে আমার গা-ঘেঁষে বসলেন অনন্তবাবু। একটা অপার্থিব হাসি খেলা করছে তাঁর মুখে। তারপর আমার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে গম্ভীর খসখসে গলায় বলে উঠলেন, “আচ্ছা বিতংসবাবু, কেমন হবে যদি রঙিন প্রকৃতির কোলে ছড়িয়ে থাকা শান্তিনিকেতনে এসে আপনি কয়েকশো বছরের পুরোনো এক রুক্ষ-শুষ্ক দানবাকৃতি পাথরের গাছ দেখতে পান?"

সেই গলার মধ্যে কী যেন ছিল, আমার গা-টা শিরশির করে উঠলো। অস্ফুট স্বরে বললাম, “পাথরের গাছ!"

-"কিংবা গাছের মতো পাথর", জ্বলজ্বলে চোখে দরজার পেছনে জমাটবাঁধা অন্ধকারের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললেন, “সৃষ্টির আদিতে জন্ম নেওয়া পাতালের সেই জীব... তান্ত্রিক বাবা তো তাই বলেছিলেন!"

আমার মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল... পিঠের মাঝ বরাবর যেন একটা ঠান্ডা স্রোত নামছে। পাতালের জীব! পাথরের গাছ! তান্ত্রিক বাবা! কী বলতে চাইছেন অনন্তবাবু?

আমার মুখ দেখে বোধহয় মনের অবস্থাটা বুঝতে পারলেন... একটা নির্মল হাসি ছড়িয়ে পড়ল অনন্তবাবুর মুখে। "সব মাথার ওপর দিয়ে গেল তো? দাঁড়ান, আপনাকে গোড়া থেকে বলি", বলতে বলতে লুঙ্গির গেঁজে থেকে একটা বিড়ি বার করে ধরালেন। তারপর নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শুরু করলেন, “তা সে শ'দুয়েক বছর তো হবেই! আমাদের এই অঞ্চলে পুরোদমে জমিদার রাজত্ব ছিল। যে সে জমিদার নয়... একদম-ডাকাত জমিদার, বুঝলেন! শোনা যায়, মল্লিকদের পূর্বপুরুষরা এককালে দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই ডাকাতির ধনরত্নে পুষ্ট হয়ে শেষের দিকে ডাকাতির পথ ছেড়ে জমিদার হয়ে রাজত্ব শুরু করে। তবে জমিদার হয়ে যাওয়ার পরও তাঁরা গোপনে ডাকাতের দল পুষতেন আশেপাশের তহশিলে ডাকাতি চালিয়ে ধনসম্পদ লুঠপাট করে আনার জন্য। যাই হোক, মল্লিক বংশের এক বংশধর ছিলেন কন্দর্পনারায়ণ মল্লিক। তাঁর সময়ে হঠাৎ দেশে ভয়ঙ্কর খরা দেখা দিল। নদী-খাল-বিল শুকিয়ে জলের অভাবে কাতারে কাতারে লোক মরতে শুরু করল, রাজবাড়ির কূয়ো-পুকুরগুলোতে জল প্রায় তলানিতে ঠেকল। রাজা দেখলেন মহাবিপদ। এই অঞ্চলে থাকলে জলের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে। সুতরাং,পাইক-বরকন্দাজ সহযোগে পরিবার নিয়ে ঘর ছাড়লেন রাজামশাই। বনের পথে যাচ্ছেন, এদিকে বেজায় তেষ্টা পেয়েছে মহারাজের। দলের লোকেরাও প্রায় ধুঁকছে,পাল্কিবাহকেরাও প্রচণ্ড তেষ্টায় আর পাল্কি বইতে পারে না। “এবার বুঝি মরতেই হবে” ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রাজার নজরে পড়ল এক অদ্ভুত দর্শন গাছ, আর তার নীচে ধুনি জ্বালিয়ে বসে থাকা এক সাধু। দেবদ্বিজে বিশেষ ভক্তি ছিল কন্দর্পনারায়ণের, গিয়ে পড়লেন সাধুবাবার পায়ে। সব শুনেটুনে সাধুবাবা রক্তবর্ণ চোখ ঘুরিয়ে বললেন, “এই বিশালাক্ষ বৃক্ষ তোমাকে রক্ষা করবে বৎস, তোমার রাজ্যের প্রজাদের কোনোরকম অভাব-অভিযোগ থাকবে না। এ বৃক্ষ কিন্তু কোনো সাধারণ শ্রেণীর উদ্ভিদ নয়, সৃষ্টির আদিতে পাতালপুরীতে জন্ম নেওয়া এক বিপুল শক্তিধর প্রাণ! এর ক্ষমতা কতদূর তার কোনো ধারণা সাধারণ ক্ষুদ্র বুদ্ধির মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। শুধু মনে রাখবে, এ গাছের চাই খাদ্য। একটি করে নরদেহ। প্রতি পূর্ণিমা তিথিতে একটি করে মনুষ্য শরীর অর্পণ করতে হবে বৃক্ষদেবতাকে, তবেই তিনি তুষ্ট হবেন। কোনোভাবে যেন দেবতার অপমান না হয়! তাহলে কিন্তু মহা দুর্যোগ নেমে আসবে!” এই বলে কীভাবে তন্ত্রসাধনার দ্বারা বৃক্ষকে জাগিয়ে তুলতে হবে তা শিখিয়ে দিলেন রাজাকে। ভক্তিভরে সেসব শিখলেন কন্দর্পনারায়ণ, এবার শুধু একটি জ্যান্ত নরদেহ চাই। উপায় বলে দিলেন সাধুবাবাই। ভৃত্যদের মধ্য থেকে একজনকে শক্ত করে বাঁধা হল গাছের সঙ্গে, সামনে উপচার সাজিয়ে বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণে পূজা শুরু করলেন সাধুবাবা। দেখতে দেখতে জেগে উঠল গাছ, ধীরে ধীরে পাথর বানিয়ে ফেলল সেই ভৃত্যকে... তারপর তার সমস্ত রক্ত-রস-মাংস আত্মগত করে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিল।”

—“উফ্! কী নৃশংস!”, শিউরে উঠে বললাম, “ভয়ঙ্কর ব্যাপার! কিন্তু গাছ এরকম পাথর বানিয়ে টুকরো করে দিল... এরকম আবার হয় নাকি!”

—“আরে মশাই হয় হয়! এ দুনিয়ায় সবই হয়!”, বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে হাসলেন অনন্তবাবু, “অন্তত আমার বাপ-ঠাকুরদার মুখে তো তাই শোনা! এমনিতেও গাছটা দেখলেই আপনি ব্যোমকে যাবেন মশাই, গ্যারেন্টি দিচ্ছি। অমন পাথরের মতন গাছ... এ আপনি কোথাও পাবেন না! কন্দর্পনারায়ণের পর থেকে তো রাজ্যের যত চোর-ছ্যাঁচড়াদের ওই গাছের সঙ্গে বেঁধেই মারা হত, বংশের অন্তত এক জন করে ওই তন্ত্র-মন্ত্র শিখে রাখতেন। এখন অবশ্য সে জমিদারিও নেই, সেই বীভৎস প্রথাও নেই। তবে গাছটা আছে। সে এক জিনিস মশাই! ঠিক যেন ডালপালা-পাতা সহ একটা গোটা গাছ হঠাৎ পাথরে পরিণত হয়েছে!”

চুপ করে বসেছিলাম। মাথার ভেতরে কিছু পুরনো কথা, পুরনো ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছে। বিড়িটা শেষ হয়ে এসেছিল, দাওয়ায় ঠুকে ঠুকে সেটা নিভিয়ে অনন্তবাবু বললেন, “কী ভাবছেন মশাই?”

—“উঁ? আমার এক দিদার কথা... ও কিছু না”,একটা আড়মোড়া ভেঙে হাই তুললাম, “কাল সকালে তো বিশ্বভারতী যাবো, তার আগে ভোর ভোর বেরিয়ে একবার আপনার ওই পাথরের গাছটা দেখে এলে মন্দ হত না। আপনার সময় হবে?”

রাতটা কেটে গেল। পরদিন ভোরে অনন্তবাবুর স্কুটারে করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মিনিট দশেক চলার পর স্কুটারটা একটা চায়ের দোকানের সামনে স্ট্যান্ড করে রাখলেন অনন্তবাবু। ভাঁড় থেকে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিচ্ছি, দোকানিকে বলে বেরিয়ে এলেন হাসিমুখে, “এখান থেকে একটু হাঁটতে হবে, সামান্য চড়াই আছে। স্কুটার নিয়ে ওঠা চাপের ব্যাপার।” চা-টা শেষ করে বললাম, “আপনাদের এখানে জল-হাওয়া কিন্তু তোফা মশাই। কাল রাতে যা একখান ঘুম হল না! এখনও ঘুম ঘুম পাচ্ছে। চলুন হেঁটে হেঁটেই যাই, ঘুমটা কাটবে। কিন্তু আপনার অসুবিধে হবে না তো?”

—“আরে অন্ধের কিবা দিন, কিবা রাত! তেমনি খোঁড়ার কিবা সমতল, কিবা চড়াই!”,হো হো করে হেসে উঠলেন অনন্তবাবু, “তাছাড়া এতো এভারেস্ট নয়, সামান্য টিলা মাত্র।” অপ্রস্তুত হেসে অনন্তবাবুর পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করলাম। যত দেখছি এই মানুষটাকে, শ্রদ্ধায়-স্নেহে মনটা ভরে যাচ্ছে। নিজের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যেভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচেন, অন্যকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন... তেমনটা বোধহয় আমাদের মতো অনেক শক্তসমর্থ মানুষই পারবে না! আজ সকালে বেরোনোর সময় চিড়ে-দই না খাইয়ে ছাড়লেন না, সারাদিন কী পেটে পড়ে না পড়ে এই বলে। তারপর স্কুটার নিয়ে বেরিয়েও পড়লেন আমার সঙ্গে। লোকালয় ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে চলে এসেছি। প্রথম প্রথম বসন্ত উৎসবে পৌঁছনোর দেরী হয়ে যাবে বলে চিন্তা করছিলাম, তবে কিছুটা হাঁটার পরই বুঝতে পারলাম এসে কোনো ভুল করিনি। চারপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য এতটাই মনোমুগ্ধকর যে মনে হচ্ছিল বাকি সব চুলোয় যাক, শুধু চেয়ে চেয়ে দেখি এই অপরূপা প্রকৃতিকে! সদ্য জন্মানো কচি সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে উপচে পড়ছে লাল-হলুদ-কমলা রঙ, যেন আগুন লেগেছে বনে! শিমূল-পলাশ-কৃষ্ণচূড়ায় ঢেকে আছে পথ, সবুজ ঘাসের ওপর কখনো কখনো ঝরে পড়েছে উজ্জ্বল লাল ফুলগুলো। ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় কীসের যেন মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। এক ঝাঁক পাখি টুইট-টুইট করতে করতে উড়ান দিল। “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান...”,গুনগুনিয়ে দু কলি ছিটকে বেরিয়ে এল আমার হেঁড়ে গলা দিয়ে। গলা মেলালেন অনন্তবাবুও। “আপনার তো বেশ রেওয়াজ করা গলা মনে হচ্ছে!”,তারিফের গলায় বললাম। “হেঁ হেঁ, ওই আর কী...”,লজ্জিত হেসে সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন অনন্তবাবু, “এই যে পৌঁছে গেছি। এই সেই গাছ।”

সত্যি বলতে কী এই অসাধারণ পরিবেশ উপভোগ করতে করতে গাছটার কথা ভুলেই গেছিলাম। অনন্তবাবুর কথায় সামনের দিকে তাকালাম, আর মারাত্মক এক ঝটকা খেলাম! এরকম কোনো কিছু যে হতে পারে, তা আমার ধারণার বাইরে ছিল! গলা দিয়ে ছিটকে বেরোল একটাই আর্তনাদ, “উফফ্!”

হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত বস্তু। সে এক ভয়াল ভয়ঙ্কর মূর্তি! একটা বিকট কদাকার গাছ, তিন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়ালে যতটা চওড়া হয় ততটা চওড়া তার গুঁড়ি। আর সেই বিশাল গুঁড়ির ঠিক মাঝখানে একটা অন্তত দশ ইঞ্চি রেডিয়াসের বিশাল এক গহ্বর, যার মাঝখান থেকে সামান্য উঁচু হয়ে বেরিয়ে আছে একটা মোটা কাণ্ড... ঠিক যেন একটা চোখ! অনন্তবাবুর গল্পের সেই বিশালাক্ষ গাছ! কিছুক্ষণের জন্য মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরোল না আমার। মোটা গুঁড়িটার ওপর দিক থেকে সাপের মত পেঁচালো আঁকাবাঁকা কিছু ডালপালা আকাশের দিকে উঠে গেছে,সেগুলোর শেষ প্রান্ত লক্ষ লক্ষ ধারালো দাঁত বিশিষ্ট কোনো দানবের হাঁ-এর মতো! তবে সব থেকে বেশী আশ্চর্যজনক এই যে, গাছটার পুরো শরীরটাই মসৃণ স্লেট রঙের! ঠিক যেন ভিনগ্রহ থেকে আসা কোনো বীভৎস জন্তু হঠাৎ কোনো দৈববলে পাথরে পরিণত হয়েছে। অথবা কোনো দক্ষ শিল্পীর বিকৃত কল্পনার ফসল হিসেবে পাথর খোদাই করে বানানো হয়েছে এই কদর্য অবয়ব! এই বসন্তের শাল-পলাশ-মহুয়ার জঙ্গলে যেখানে সদ্য ফোটা ফুলে, কচি পাতায় উপচে পড়ছে রঙের বাহার, সেখানে এই নিষ্প্রাণ ধূসর বর্ণের বিকৃত পাথুরে বস্তুটি যেন এক মূর্তিমান মৃত্যুর প্রতীক। লক্ষ করে দেখলাম সাধারণত বড় বড় গাছের নীচটা যেমন ছাওয়া থাকে কচি সবুজ ঘাস বা বুনো ঝোপে, এখানে তেমন কিছুই নেই। তার বদলে আছে শুধু বড় বড় পাথর খণ্ড। ছোটো বড় কালচে ধূসর পাথরের টুকরো ছড়িয়ে আছে গাছের গোড়া থেকে হাত দশেক দূর... প্রায় আমাদের পায়ের কাছ অব্দি। “এ কী ভয়ঙ্কর জিনিস মশাই! দেখলেই কেমন গা শিরশির করে!”,অস্ফুটে ছিটকে এল আমার গলা দিয়ে, “কী অদ্ভুত সৃষ্টি!”

-"এ স্বয়ং ভগবানের লীলা, তাঁরই সৃষ্টি! বুঝলেন!”,বলত বলতে সসম্ভ্রমে কপালে জোড় হাত ঠেকালেন অনন্তবাবু। ভগবানে বিশ্বাস আমার কোনোকালেই নেই, তার ওপর এই কদাকার জিনিসটা দেখে ভগবানের থেকে বরং মূর্তিমান শয়তানই বেশী মনে হচ্ছে। নীচু হয়ে পায়ের কাছ থেকে একটা পাথরের টুকরো তুললাম। গাঢ় স্লেট রঙের নিটোল মসৃণ গা-টা, যেন জল পড়লে পিছলে যাবে। গাছটার শরীরও এই একই পাথরের, দূর থেকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। জায়গাটা আর ভালো লাগছিল না। চারদিকে এত রঙের বাহার, এত সুন্দর মিষ্টি হাওয়া... তার মধ্যে এই বিদঘুটে জিনিসটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয়! পাথরটা ফেলে দিয়ে ঘুরলাম, “চলুন ফেরা যাক। এখানে আর দাঁড়িয়ে লাভ নেই। একটু জঙ্গলের শোভা উপভোগ করি বরং।”

—“তাই চলুন”,ঘুরলেন অনন্তবাবুও, তারপর যুদ্ধজয়ের গলায় বলতে থাকলেন, “দেখলেন তো! বলেছিলাম না, পুরো চমকে যাবেন! এ যে সে গাছ নয়, বিশালাক্ষ গাছ!” অনন্তবাবুর বকবকানি চলছে, আস্তে আস্তে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম জঙ্গলের পথে। মনে ফুরফুরে ভাবটা ফিরে আসছে, একটা নরম আলস্য যেন ছড়িয়ে পড়ছিল শরীর জুড়ে। একটা পলাশ গাছের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। এতটা চড়াই উঠে গলাটা কেমন শুকিয়ে এসেছে। সঙ্গে জল রাখলে ভালো হয়। অনন্তবাবুকে সে কথা বলতেই তুড়ি বাজিয়ে ব্যাগ থেকে একটা জলের বোতল বের করে বললেন, “সব ব্যবস্থা আছে স্যার! একটা জলের বোতল আমি সবসময় ব্যাগে রাখি!" আগুনরঙা পলাশের ভারে নুয়ে পড়েছে ডালগুলো, তলাটা ঝরে পড়া ফুলে ছাওয়া। দু'চোখ ভরে দেখতে দেখতে অনন্তবাবুর হাত ধরে টানলাম, “তাহলে আর কী... আসুন একটু বসে জল খাই এখানে। ওই বিচ্ছিরি পাথুরে গাছের কথা ছেড়ে একটু আসল প্রকৃতির স্বাদ অনুভব করুন তো মশাই! কী সুন্দর ঠান্ডা ছায়া না?”

আহ্! কঁকিয়ে উঠলাম। ঘাড়ে পিঠে অসহ্য যন্ত্রণা। হাত দুটো নাড়াতে পারছি না। কী যেন ছুঁচের মতো সারা গায়ে ফুটে চলেছে, জ্বালা করছে গোটা শরীর। ধড়মড়িয়ে উঠে বসার চেষ্টা করলাম,পারলাম না। চারদিকটা এতো অন্ধকার কেন? আমি কি স্বপ্ন দেখছি? এটা কোন জায়গা? মাথাটা যেন দু'মনি বস্তার মত ভারী হয়ে আছে, কিছু ভাবতে পারছি না। একটু দূরে একটা আগুন জ্বলছে না? ছোট্ট একটা আলোর বলের মতন... নাচছে, লাফাচ্ছে... কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে... ওঃ, বড় ঘুম পাচ্ছে আমার। ধীরে ধীরে কাছে এগিয়ে আসছে... কাছে... আরও কাছে... আমার ভারী চোখের পাতাটা টেনে তোলার চেষ্টা করলাম। আলোটা একেবারে কাছে এসে পড়েছে, একদম মুখের সামনে... কে যেন একটা ফাঁকা হাঁড়ির ভেতর থেকে ডাক দিয়ে উঠল, “খাসনবিশ বাবু! ও খাসনবিশ বাবু! ঘুম ভাঙলো তাহলে?” শব্দগুলো যেন ভোঁতা হাতুড়ির মতো স্নায়ুতন্ত্রে ধাক্কা মারছে, চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে আমার। কোনোমতে জড়ানো গলায় বললাম, “কে?”

হাতের মশালটা মাটিতে পুঁতে সামনে এসে উবু হয়ে বসল লোকটা। তারপর বিশ্রী খ্যাকখ্যাক করে হেসে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল, “হবে! হবে! এইবার হবে!”

অনন্তবাবু! বিস্ময়ে আমার চোয়াল ঝুলে গেল! মাথার ভেতর সব কেমন জড়িয়েমড়িয়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মশার কামড়ে জ্বলছে গা, শক্ত হয়ে প্রায় চামড়া কেটে বসেছে পাকানো দড়ি। বুঝতে পারছি কোনো কিছুর সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে আমাকে! কিন্তু অনন্তবাবু এরকম হাসছেন কেন? একটা ঝটকা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই দড়িগুলো যেন আরো চেপে বসল,যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলাম! ফাঁদে আটকা পড়া প্রাণীর মত ছটফটিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, “কী পাগলামি এসব! আমাকে খুলে দিন শিগ্গির!”

—“কী যে বলেন মশাই”,জুত করে বসলেন অনন্তবাবু, “এত দিনে এত কষ্ট করে মাছ ধরা পড়ল জালে, আর আপনি বলছেন তাকে ছেড়ে দিতে!”

বিস্ময়ে আতঙ্কে রা কাড়ল না আমার মুখ দিয়ে! এসব কী বলছেন অনন্তবাবু! তার মানে আমাকে টোপ দিয়ে এনেছেন এভাবে বন্দী করবেন বলে? কী মতলব তাঁর? আমার কাছে তো টাকাপয়সা বিশেষ...

—“হে হে... থিয়েটার করাটা বেশ ভালোই কাজে লাগল, বুঝলেন?”,মশালের আলোয় একটা বিড়ি ধরিয়ে লম্বা টান দিলেন অনন্ত বাবু, “ওফ্, আজ অব্দি কত চেষ্টাই না করেছি! একটা লোককে বিশ্বাস করাতে পারিনি! গুলগপ্পো ভেবে উড়িয়ে দিত সব। আর পা টারও এমন অবস্থ... ল্যাংড়া লোক হয়ে জোর করে কাউকে তুলে আনবো কী করে বলুন তো!”

সম্পূর্ণ স্বাভাবিক স্বরে কথা বলছেন অনন্তবাবু। আমার মাথার ভেতরটা যেন চক্কর কাটছিল। এই মানুষটাকে পরোপকারি, বন্ধুবৎসল ভেবেছিলাম... অতিথিপরায়ণতার আড়ালে তবে এই লুকিয়েছিল! একটা ঠগ-জোচ্চরের পাল্লায় পড়লাম শেষে! দাঁতে দাঁত ঘষে চেঁচিয়ে উঠলাম, “কী চান আপনি? হোটেলের আড়ালে এইভাবে কিডন্যাপিং এর ব্যবসা চালান! থুঃ!”,একদলা থুতু ছুঁড়ে ফেললাম মাটিতে।

—“কিডন্যাপিং!”,হো হো করে হেসে উঠলেন অনন্তবাবু, “আপনাকে কিডন্যাপ করে আমার লাভ কী মশাই! চালচুলোহীন একটা লোক, পাতি রিপোর্টার... সঙ্গে নিশ্চয়ই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়ে ঘোরেন না! তার জন্য বোতলের জলে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে এত কসরৎ করে আপনাকে এখানে আনতে যাব কেন?”

ঘুমের ওষুধ! শরীরে একটা বিদ্যুৎচমক খেলে গেল আমার! এই জন্য জল খেয়ে গাছের ছায়ায় বসার পর যেন শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল আমার, চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছিল! কতক্ষণ ঘুমিয়েছি আমি? ক’দিন কেটেছে? কী করতে চায় এই লোকটা আমার সঙ্গে? “আপনি...”,ফের গর্জে ওঠার আগেই গম্ভীর স্বরে হাত তুললেন অনন্তবাবু, “দাঁড়ান দাঁড়ান! আপনার সব প্রশ্নের উত্তর পাবেন। ভাবছেন তো, কেন এখানে আপনাকে এনেছি? এখানে এনেছি একটা গল্প শোনাতে। আপনাকে সেই কন্দর্প মল্লিকের গল্প শুনিয়েছিলাম মনে আছে? সেটা তো এখনো শেষ হয়নি!”

নিষ্ফল আক্রোশে মুখ ঘুরিয়ে নিলাম। গল্প! লোকটা কি উন্মাদ? আমার মুখভঙ্গিকে পাত্তা না দিয়ে আপনমনে বলতে শুরু করলেন অনন্তবাবু, “আরে অত রাগ করবেন না। শুনুনই না গল্পটা! তো তারপর কী হল, বিশালাক্ষ গাছের কৃপায় তো রাজ্যের সব দুর্দশা কেটে গেল, ফুলেফেঁপে উঠল জমিদারিও। নিয়মমতো বৃক্ষ দেবতাকে বলি উৎসর্গ করার রীতিও চলে আসছিল পুরুষের পর পুরুষ ধরে। সবই ঠিক চলছিল, এমন সময় কন্দর্পনারায়ণের দুই প্রজন্ম পর ঘটে গেল একটা মারাত্মক দুর্ঘটনা!”

দু'হাতে চেপে ধরে এক ধাক্কায় আমার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন অনন্তবাবু! কেমন যেন অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সেই মুখ! দু'হাতে ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়লেন আমার দিকে, লাল রক্তজবার মতো দু'চোখের মধ্যে মণি দুটো যেন কয়লার মতো জ্বলে উঠল! লালা জড়ানো ঘড়ঘড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী হল জানেন? পাপ! পাপ! মহাপাপ হল!”

মশালের আলোয় সেই বীভৎস মুখভঙ্গির সামনে যেন আমার শরীরের প্রতিটা পেশী জমে ঠান্ডা হয়ে গেল! এক অসীম আতঙ্কে বিকৃত হয়ে উঠল অনন্তবাবুর মুখ, “এক পূর্ণিমার রাতে ভগবানকে ভোগ নিবেদনের সময় কীভাবে যেন দড়ি কেটে পালিয়ে গেল বন্দি! ভগবান রুষ্ট হলেন! অভিশাপ নেমে এল পরিবারের ওপর! বংশের প্রত্যেকটা সন্তান হয় মারা যেতে লাগল জন্মের পর, আর নাহলে জন্মাল বিকলাঙ্গ হয়ে! এই আমার মতো!” বলতে বলতে এক ঝটকায় হাঁটু অব্দি তুলে দিলেন পাতলুন, বেরিয়ে পড়ল শুকনো গাছের ডালের মত লিকলিকে পা আর উল্টানো পায়ের পাতা!

দিনের বেলায় যে পা দেখে করুণা জেগেছিল, ধকধক করে জ্বলতে থাকা রক্তিম আলোয় সেই কঙ্কালসার বীভৎস অঙ্গ দেখে বুকের মধ্যে কাঁপুনি খেলে গেল আমার। পাহাড়প্রমাণ ভয় চেপে বসছে মনের ভেতর, সেই সঙ্গে একটা ভয়ঙ্কর সম্ভাবনাও। শুধু অস্ফুটে বললাম, “মল্লিক... ?”

—“হ্যাঁ। আমাদের আসল পদবি মল্লিক",বাঁকা হাসি উড়ে এলো আমার দিকে, “চৌধুরী শুধুমাত্র উপাধি ছাড়া কিছুই নয়। কাউকে দিই না আমার এই পরিচয়, দিয়ে কী হবে? ডাকসাইটে বনেদি মল্লিক বংশের ছেলে একটা ঝুপড়ি হোটেল চালায়, এই কথা বলতাম সবাইকে?",তেতো স্বর বলে চলল, “আমার স্বর্গত বাবা যোগীন্দ্রনারায়ণ মল্লিক ছিলেন জন্মান্ধ। গরিব স্কুল মাস্টার। একটা চোখ জন্ম থেকেই পুরোপুরি নষ্ট। দুই সন্তানের মৃত্যুর পর আমি এলাম। অনন্তনারায়ণ মল্লিক। কিন্তু জন্মালাম এই খোঁড়া পা নিয়ে। গতকাল রাতে আপনাকে একটাও মিথ্যে কথা বলিনি বিতংসবাবু! সন্তানসুখ আমার কপালে জোটেনি। কিন্তু আমি জানি...”,বলতে বলতে পরম তৃপ্তিতে ভরে গেল তাঁর মুখ। মাটি থেকে হাতে তুলে নিলেন গোল মতো কী একটা জিনিস, তারপর সেটা মাথায় ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বললেন, “উৎসর্গ পেলেই ফের প্রসন্ন হবেন দেবতা। কেটে যাবে অভিশাপ। মল্লিকবংশ তার উত্তরাধিকারী পাবে।”

একটা গরম লোহার শিক যেন কেউ ঢুকিয়ে দিল আমার কানে। মশালের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি অনন্ত বাবুর হাতে চকচক করছে সকালে দেখা সেই মসৃণ পাথর! শুধু তাই নয়, আমার পায়ের নীচে আশেপাশে চারদিকে ছড়িয়ে সেই পাথর। পিঠের পেছনে ঠান্ডা স্লেটের মতো পাথুরে স্পর্শ অনুভব করতে করতে এতক্ষণে তাকালাম ওপরের দিকে। পূর্ণিমার আলোয় পাতাবিহীন মরা ডালগুলো ডাইনির ধারালো নখের মত উঁচিয়ে আছে! যে গাছের সঙ্গে আমাকে বেঁধে রাখা হয়েছে, সেটা আর কিছুই নয়... সকালে দেখা সেই পাথুরে গাছ!

জীবনে কখনো কখনো কখনো এমন কিছু পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সমস্ত সাধারণ বোধবুদ্ধি লোপ পেয়ে মানুষ আতঙ্কের শেষ সীমানায় পৌঁছে যায়। সেই রাত্রির নিকষ অন্ধকারের মধ্যে চাঁদের আলোর আবছায়ায় দানবের মতো গাছটাকে দেখে, অনন্তবাবুর বর্ণনায় দেবতাকে নরদেহ উৎসর্গ করার দৃশ্যটা জীবন্ত হয়ে উঠল আমার সামনে! শরীরের সমস্ত রক্ত যেন জমাট বেঁধে যাচ্ছে, তলপেটে চিনচিনে যন্ত্রণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণভয়! উন্মত্তের মতো দড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করতে থাকলাম, “ছেড়ে দিন! ছেড়ে দিন আমাকে! এক্ষুণি দড়ি খুলে দিন অনন্তবাবু! এটুকু দয়া করুন! আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি! প্লিজ ছেড়ে দিন!”

—“ওফ্!”,বিরক্ত হয়ে উঠে এলেন অনন্তনারায়ণ মল্লিক। পাশে রাখা একটা ঝোলা থেকে একদলা কাপড় বের করে আমার মুখে ঠুসে দিতে দিতে বললেন, “বড্ড চ্যাঁচাচ্ছেন আপনি! যদিও আশেপাশে কেউ নেই আপনার এই চিৎকার শোনার জন্য, তাও... সাবধানের মার নেই। আমাকে এখন সাধনায় বসতে হবে, মনঃসংযোগ করতে হবে... জাগিয়ে তুলতে হবে দেবতাকে। এই দিনটার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করেছি আমি।”

মুখে কাপড়টা গুঁজে দিতেই আমার শরীরের সব যন্ত্র যেন বিকল হয়ে গেল। এই তবে শেষ! কাপড়ের দলাটা চেপে ধরেছে আমার শ্বাসনালী। বুক থেকে উঠে আসা একটা বোবা গোঁ গোঁ শব্দ আর চোখ উপচে যাওয়া কান্না ছাড়া যেন আর কোনো অস্তিত্ব নেই আমার! সেদিকে অবশ্য কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সামনের লোকটার। একে একে ঝুলি থেকে বের করে সাজাতে লাগল কয়েকটা ছোট ছোট হাড়, কিছু শিকড়-বাকড়, কালো রঙের কোনো জানোয়ারের লোম, মাটির খুরিতে কালচে লাল রঙের একরকমের থকথকে তরল। দম ফুরিয়ে আসছিল আমার। বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা চিৎকারটা স্তিমিত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ছিল ক্রমশ। সারা শরীরে লক্ষ লক্ষ বিষফোঁড়ার যন্ত্রণা, খাওয়ার-জল বিহীন গোটা একটা দিন কাটানোর পর নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল শরীর। ওই তো, হাড়গুলোকে সাজিয়ে তার ঠিক মাঝখানে তরলভর্তি খুরিটা রাখলেন অনন্ত বাবু, মুখে নির্মল প্রশান্তির ছাপ। চোখের সামনে দৃশ্যপট ঝাপসা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে... পুরোনো কথা মনে পড়ছে... এখানে প্রথম আসার দিনটা... দূরে কোথায় যেন দ্রিমি দ্রিমি মাদল বাজছে... বলির বাজনার মতো... আর কোনোদিন ফেরা হবে না...

প্রায় বুজে আসা চোখের এক কোণে দিয়ে ঠিক তখনি চোখে পড়ল জিনিসটা। আমার অবসন্ন শরীরটা ঝুলে পড়েছে বাম পাশে, সেদিক বরাবর হাতখানেক দূরে পাথরের খাঁজে খুব হালকা আবছায়ার মতো কী একটা যেন চকচক করছে। চোখগুলোকে টেনে বড় করার চেষ্টা করলাম। কী ওটা? এক আঙুল মতো একটা জিনিস... লাল রঙের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে... প্রাণপণে ঝুঁকে পড়লাম আমি, আর তখনি আশার একটা ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল মনের মধ্যে! সৌমিকের দেওয়া সেই চাবির রিং টা! আমাকে এখানে আনার সময় বোধহয় কোনোভাবে বোধহয় পড়ে গেছে পকেট থেকে,পাথরে ধাক্কা খেয়ে খুলে গেছে রিং এ লাগানো ফোল্ডিং পেপার নাইফ! এটা দিয়ে কি দড়ি কাটা যাবে? সম্ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমার শরীরে যেন নতুন জোয়ার এল। আড়চোখে দেখলাম পদ্মাসনে বসেছেন অনন্তবাবু, চোখ বোজা। দু'হাতে কোলের ওপর রেখেছেন একখানা পাথর। এই সুযোগ! কোনোভাবে পেতেই হবে ছুরিটা! কিন্তু কিছুটা দূরে পড়ে আছে ওটা, কীভাবে নেওয়া যায়? পা থেকে ইঞ্চিকয়েক দূরে পড়ে আছে জিনিসটা, সামান্য নাড়নোর চেষ্টা করলাম পা। শ্রান্তিতে শরীর নুয়ে পড়ছে, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ, তাও চেষ্টা আমাকে করতেই হবে। পায়ের পাতাটা আস্তে আস্তে সরাচ্ছি বাম দিকে, শক্ত নাইলন দড়ির বাঁধনে যেন চামড়া কেটে যাচ্ছে! অসহ্য যন্ত্রণায় চোখে জল এসে যাচ্ছে আমার। দাঁতের ফাঁকে গোঁজা কাপড়টা কামড়ে ধরে কষ্ট সহ্য করছি, ওই ছুরিটার ওপর এখন নির্ভর করছে আমার বাঁচা-মরা!

কতক্ষণ কাটল জানি না। পা-টা প্রায় পৌঁছে গেছে ছুরিটার পাশে, আস্তে আস্তে বুড়ো আঙুলটা ছুঁল ফলাটা। আর একটু! পায়ের পাতাটা সামান্য পিছিয়ে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলা মারলাম হাতলের দিকটা, পাথরের গায়ে সামান্য আওয়াজ তুলে প্রায় উড়ে এসে আমার পাশে পড়ল ছুরিটা!

আর ঠিক তক্ষুণি গম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করলেন অনন্তবাবু।

এ আমাদের চেনা কোনো ভাষা নয়। চোখ বোজা অবস্থাতেই এক অদ্ভুত করুণ সুরে যেন ইনিয়ে বিনিয়ে মিনতি জানাচ্ছেন অনন্তনারায়ণ মল্লিক। সেদিকে কান দেওয়ার সময় অবশ্য আমার ছিল না। মশার কামড়ে জ্বলছে গোটা শরীর। ছুরিটা এখনো আমার নাগালের বাইরে। ভাগ্যিস হাতটা পিছমোড়া করে বাঁধা নেই! সব শক্তি এক করে কোমর ঘষটে ঘষটে বাম দিকে উপুড় হয়ে পড়লাম। দড়িটা ঘষা লেগে লেগে বাহুর চামড়া কেটে দিচ্ছে, বোধহয় রক্ত বেরিয়ে গেল। শিকড়পোড়া গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করছে। যেকোনো মুহূর্তে চোখ খুলতে পারেন অনন্তবাবু! তার আগেই ওটা কুড়িয়ে নিতে হবে আমায়। মাটিতে প্রায় নাক ঠেকে এসেছে, শক্ত করে বাঁধা হাতদুটো এগিয়ে দিতেই হাতে ঠেকল তীক্ষ্ণ ফলাটা! কোনোমতে ফলাটা তুলে নিয়েই যতটা দ্রুত সম্ভব শরীরটাকে সোজা করে নিলাম। অনন্তবাবুর মন্ত্রোচ্চারণের জোর বেড়েছে,গমগমে কণ্ঠস্বর যেন নিস্তব্ধ জঙ্গলের গাছ থেকে গাছে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসছে। আমার ভেতরে তখন যুদ্ধজয়ের আনন্দ! এবার শুধু দড়িটা কেটে ফেলার অপেক্ষা, ব্যস! মুক্তি! তাড়াতাড়ি ছুরিটা ডানহাতের মুঠোয় নিয়ে বাঁধন কাটতে শুরু করলাম। আর ঠিক তখনি প্রথম অনুভব করলাম একটা অবিশ্বাস্য অথচ ভয়াবহ ঘটনা!

আমার শরীরের পেছনে পাথুরে জিনিসটার ভেতর একটা কম্পন শুরু হয়েছে! তার গরম উপরিভাগের স্পর্শ জামা ভেদ করে এসে পৌঁছচ্ছে আমার পিঠের চামড়ায়! আস্তে আস্তে রবারের মতো নরম হয়ে যাচ্ছে পাথর... আর খুব ধীরে ধীরে একটা হিসহিসে শব্দের মধ্যে যেন একটু একটু করে বসে যাচ্ছে আমার শরীরটা! জেগে উঠছে গাছ!

এক আদিম আতঙ্কে কিছুক্ষণের জন্য যেন পাথর হয়ে গেলাম আমি। দেরী হয়ে গেল? আর কি নিস্তার নেই? এই মূর্তিমান শয়তান কি এবার সত্যিই পাথরের টুকরো করে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে আমাকে? চোখ মেলে তাকিয়েছেন অনন্তবাবুও। মশালের শিখাটা এঁকেবেঁকে যেন বীভৎস কাটাকুটি খেলা করে চলেছে তাঁর মুখে। আমার দিকে তাকিয়ে কী বুঝলেন কে জানে, একটা পাখির পা-কে সেই থকথকে তরলে চুবিয়ে ছিটিয়ে দিতে লাগলেন আমার দিকে! দুর্গন্ধে গা গুলিয়ে বমি উঠে আসছিল আমার। ফের চোখ বুজে বিড়বিড় শুরু করলেন, যদিও তাঁর ঠোঁটুর কোণে লেগে থাকা উল্লাসের হাসিটা আমার চোখ এড়ালো না।

এই সুদীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবনে বরাবরই দেখেছি চরম বিপজ্জনক অবস্থায় হঠাৎ একটা ভীষণরকম মনের জোর এসে যেন আমার সামনে অন্ধের যষ্টি হয়ে দাঁড়ায়। সেই মুহূর্তেও সমস্ত আতঙ্ক আর বিভীষিকার উর্দ্ধে যেন আমার ভেতর থেকে ছিটকে এল একটা দৃঢ় গলা, “তুই পারবি বুতু! এখনও সময় আছে! চেষ্টা কর! পালাতে হবে তোকে! বাঁচতে হবে!” সম্বিৎ ফিরে এল আমার। জলে ডোবা মানুষ যেভাবে খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে, সেভাবেই ছুরিটা চেপে ধরে শরীরের সব শক্তি দিয়ে ঘষতে লাগলাম নাইলনের দড়ির ওপর। একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছি... দুপাশ থেকে ভারী পাথর চেপে আসছে... তার মধ্যেই স্পষ্ট অনুভব করলাম,পট্ করে কেটে গেল আমার হাতের বাঁধন! ক্ষিপ্র হাতে একে একে কাটতে শুরু করলাম বাকি দড়িদড়া... এই উন্মাদ কাপালিকের ফের চোখ খোলার আগেই যে করে হোক পালাতে হবে আমাকে! পাথর পিষে দিচ্ছে... গরম হলকায় পুড়ে যাচ্ছে পিঠ... আর তার তালে তালে উচ্চগ্রামে চড়ছে অনন্তবাবুর গলা। কী বিকৃত উল্লাস সেই অদ্ভুত উচ্চারণের মধ্যে! মুখের কাপড়টা খুলে ফেলে হাঁচোরপাচোর করে উঠে দাঁড়ালাম। আর এক মুহূর্ত নয়! আজ আবার পুনরাবৃত্তি হবে ইতিহাসের, আবার পালাবে বন্দী। গাছের ভেতর থেকে আসা হিসহিসে শব্দটা একটু যেন থমকে গেল। পায়ের তলায় একটা মৃদু কম্পন পেলাম। ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি? টলতে থাকা শরীরে পালানোর জন্য পা বাড়ালাম আর তখনি ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা যার কথা মনে করলে আজও আমার শরীরের সব স্নায়ু কেঁপে ওঠে।

কখন যেন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন অনন্তবাবু। আমাকে দেখে ভয়ঙ্কর গর্জন করে জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলে উঠল তাঁর চোখ! চোখের নিমেষে দাঁতে দাঁত ঘষে ক্রুদ্ধ বাঘিনীর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলেন... আর এক ঝটকায় কোনোমতে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে মাটির ওপর গড়িয়ে পড়লাম আমি!

সেই মুহূর্তে মাটির ওপর শুয়ে আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে যেন ঘটে গেল মহাপ্রলয়! গলন্ত লাভার মত জ্বলে উঠল পুরো গাছটার শরীর! কানফাটানো হিসহিসে শব্দ ঘিরে ধরল চারদিক থেকে, যেন বহুযুগের বুভুক্ষু এক দানব শিকারের গন্ধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে! আর তক্ষুনি টাল সামলাতে না পেরে গাছের গায়ে আছড়ে পড়লেন অনন্তনারায়ণ মল্লিক।

একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণ। অনন্তবাবুর দেহটা গাছের শরীর ছোঁয়া মাত্র লক্ষ লক্ষ পাথরের টুকরো যেন সাপের মতো মাথা তুলে দাঁড়াল! লাভার স্রোতের মধ্যে শরীরটা গেঁথে ফেলল সেই পাথরের সাপেরা, পাকে পাকে জড়িয়ে ধরতে থাকল তার খাদ্যকে! পুড়তে থাকা রক্ত মাংস মজ্জার গলিত তরলে যেন তৃষ্ণা নিবারণ হতে থাকল সেই পাতালের জীবের! আর মর্মান্তিক আর্তনাদ করতে করতে তলিয়ে যেতে থাকলেন ডাকাতে জমিদার বংশের শেষ বংশধর! আগ্নেয়গিরির মতো প্রাণ রস শুষে নেওয়া সেই জ্বলন্ত ছিন্নভিন্ন দেহাংশ হাজার হাজার পাথরের টুকরো হয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়তে লাগল চারদিকে!

কীভাবে যে সেই অভিশপ্ত জায়গা থেকে পালিয়ে এসেছিলাম, তা আর আজ পরিষ্কার মনে পড়ে না। কিন্তু সেদিন যে বীভৎস ঘটনা আমার সামনে ঘটেছিল, তা পরের বহুরাত ধরে করাল আতঙ্ক হয়ে ফিরে ফিরে এসেছে ঘুমের মধ্যে! এমন বিভীষিকাময় সেই সব দৃশ্য, যা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কল্পনা করে উঠতে পারে না! পাথরের টুকরোগুলো ছিটকে পড়ার সময় একটা এসে আটকে ছিল আমার জামার মধ্যে। আজও আমার শেলফের ওপরে রাখা পাথরটা দেখলে অনন্তবাবুর কথা মনে হয়। মনে হয়, কোন মানুষটা আসল? যে হাসিখুশী অতিথিপরায়ণ মানুষটার ঘরে কাটিয়েছিলাম এক রাত, নাকি যে মানুষটা এক অলীক বাসনার ঝোঁকে আমাকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই হারিয়ে গেলেন? একই মানুষের মধ্যে এরকম দুটো সত্তা হয়? বন্ধুর বেশে আসা একটা মানুষের আড়ালের মুখটা আসলে এতটা লোভী, এতটা স্বার্থপর হয়? হয়তো সত্যিই হয়। হয়তো হয় না বলে আসলে কিছু হয় না।

পাঠকেরা যা পড়ছেন