প্রত্যাবর্তন - জাকিউল অন্তু

অলংকরণ - প্রতিম দাস

প্রচণ্ড মিউ মিউ শব্দে আমার চটকা ভাঙলো৷ গাড়ির পেছনের সিটে আমার কোলের ওপর বসে আছে ফেলিক্স৷ আমার পোষা বেড়াল৷ বয়স তিন মাস৷ ভীষণ আদুরে আর বেশ ভীতু৷

গাড়ি চালাচ্ছিলো আমার অফিসের বন্ধু তন্ময়৷ গাড়িতে যাত্রী মাত্র তিনজন৷ আমি, তন্ময় আর ফেলিক্স৷ আমি ফেলিক্সকে কোলে নিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশেই বসেছিলাম কিন্তু ঘুমে চোখ লেগে আসায় একটু পেছনে এসেছি ঘন্টাখানেক হলো৷ ফেলিক্স সাথেই এসেছে৷ আরো ঘন্টাখানেক পর বদলি হিসেবে আমি ড্রাইভ করবো৷

কখন ঘুমে কাত হয়ে গেছি জানি না। ফেলিক্সের মিউ মিউ শুনে ধড়মড় করে উঠেছি৷ ফেলিক্স কোল থেকে নেমে গিয়ে সামনের সিটে গিয়ে বসেছে। আর সামনের উইন্ডশিল্ডের দিকে তাকিয়ে তারস্বরে ডেকে যাচ্ছে৷ যেন করুণ অথচ অদ্ভুত এক টান ওর গলায়৷ এরকম ডাক আমি আগে শুনিনি৷ গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে বলেই বোধহয় অবলা প্রাণীটার স্বাভাবিক ডাক আমার কাছে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে৷

আমি চোখ ডলতে ডলতে সামনে তাকালাম। তন্ময় গাড়ি থামিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে৷ যেন খানিকটা ভয় পেয়েছে৷

জিজ্ঞেস করলাম, “কীরে! কদ্দূর এলাম৷ সমুদ্র কি দেখা যাচ্ছে?”

জবাবে ও বললো, “সমুদ্র দেখতে ঢের সময় বাকি৷ আগে চিন্তা করে দেখ পৌঁছুতে পারবি কি না!”

মাঝরাতে রসিকতা ভালো লাগছিলো না৷ খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললাম, “কেন? গাড়ি রেখে উল্টোদিকে হাঁটা শুরু করবি নাকি?”

“আরে নাহ! রাস্তায় বোধহয় বিপদ অপেক্ষা করছে রে৷ সাথে তো নিরাপত্তার জন্য কিছু আনলামও না৷”

“কী হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি৷

“খুব সম্ভবত ডাকাত৷ সামনে রাস্তার ওপর গাছ কেটে ফেলেছে৷ গাড়ি ঐ গাছ ডিঙিয়ে যেতে পারবে না৷ এই সুযোগে ওরা আক্রমণ করবে৷ তুই না বললি এই রাস্তা নিরাপদ?” চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করলো তন্ময়।

 

“হ্যাঁ বলেছিলাম। কোনদিন এই রাস্তায় এরকম ঘটনা ঘটেনি। কক্সবাজারের মানুষ খুব ভালো৷ এদের মন সমুদ্রের মতই উদার৷ এত কাছাকাছি এসে এরকম ঝামেলা হওয়ার মানে হলো কোন নেশাখোর বা পাতি গুন্ডা পথ আটকেছে৷ কিছু টাকা পেলেই ছেড়ে দেবে৷” বললাম আমি৷

তন্ময়ের মুখটা কেমন যেন হয়ে গেলো৷ ওর সঙ্গে শখের ক্যামেরাটা আছে৷ টাকা গেলে যাক৷ ওদিকে ওদের নজর না গেলেই হলো৷

আমি একটু অভয় দিয়ে বললাম, “একটু এগিয়ে দেখ না কী হয়৷”

ফেলিক্সের চেঁচামেচি থেমেছে৷ কিন্তু নতুন একটা শব্দের উদ্ভব হয়েছে তার বদলে। ফেলিক্স গরগর করছে৷ খুব আরামে থাকলে অথবা শত্রু দেখলে অমন করে ও৷ বেড়ালদের খুব স্বাভাবিক স্বভাব৷

গাড়ির ইঞ্জিন চালু হলো আবার। একটু এগিয়ে যেতেই মনে হলো সামনে যে গাছের মতন বস্তুটা পড়ে আছে তাতে মাছের চোখের মণির গর্তের মতন অগভীর গর্ত করা!

যেন অজস্র চোখ অপলক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে৷ এটা কী গাছ কে জানে৷ গাছটা বাঁকা হয়ে পড়ে আছে। অনেকটা নমনীয় সরীসৃপের মতন!

আরেকটা ব্যাপার লক্ষণীয়৷ গাছটার আকার খুব ছোট নয়৷ মোটামুটি বড়ই৷ এই গাছ কেটে ফেলতে হলে লোকবল দরকার। তার মানে কি...? সামনে কঠিন বিপদ আসন্ন!

আরেকটু এগিয়ে গেলাম৷ কিন্তু এবার মনে হলো গাছটা আমাদের থেকে পালাচ্ছে৷ যত সামনে এগোনো হচ্ছে গাছটা ততই যেন আরো সামনে এগিয়ে যাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে!

লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্তিতে কি আমাদের দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে? সম্ভাবনা আছে৷ কিন্তু দুজনের একসাথে দৃষ্টিভ্রম হওয়াটা কি যৌক্তিক?

অবশ্য দুজনেই প্রায় সমান ক্লান্ত৷ তাছাড়া মাঝখানে রাস্তা ভুল করায় ঘন্টাদুয়েক নষ্ট হয়েছে৷ নইলে আগেই পৌঁছে যেতাম৷

আচ্ছা অবলা বেড়ালটা কি দেখে অমন চেঁচালো? ওর চোখে কিছু পড়েছে কি না? কুকুর বেড়াল নাকি এমন অনেককিছুই দেখে যা মানবচোখে ধরা পড়ে না৷

এসব ভাবতে ভাবতেই তন্ময়ের ডাক কানে এলো৷

জিনিসটা পাশে সরে যাচ্ছে ৷ দেখতে পাচ্ছিস জিতু?

হুম। আমারো চোখে পড়লো৷ সামনে মনোযোগ দিতেই দেখলাম ঐ গাছের মতন বস্তুটা রাস্তা ছেড়ে পাশের জলাশয়ের দিকে নেমে যাচ্ছে৷ জলের ছপাত ছপাত শব্দও বুঝি কানে এলো৷ সবটাই কল্পনা!

তবুও আমি তন্ময়কে স্পিড বাড়াতে বললাম৷ হাইওয়েতে ভূতুড়ে কাণ্ড ঘটে মাঝেমধ্যে। এটা হয়তো সেরকম কিছুই৷

সিলেটের কোন রাস্তায় যেন আধামানব আধা ছাগলের এক অবয়ব রাস্তা পারাপার করে। কম গতির কোন গাড়ি দেখলেই ধীরে ধীরে রাস্তা পার করে সে৷ ওকে দেখতে গিয়ে থামলেই বিপদে পড়তে হয় যাত্রীদের৷

স্যাটানিক এই ব্যাপারগুলো মানতে ইচ্ছা হয় না কিন্তু আজকের ঘটনাটায় কেমন সব গুলিয়ে যাচ্ছে৷ এগুলো বলতে গেলেই সেই বিজ্ঞান, অশিক্ষা কুসংস্কারের বেড়াজালে জড়িয়ে যাবো৷ ঘটনাটা নিজের মাঝে রাখাই শ্রেয়৷

বাকিপথ প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে পাড়ি দিলাম৷ আর কোন ঝামেলা হলো না৷ শুধু মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিলো প্রকাণ্ড কিছু একটা আমাদের গাড়িকে অনুসরণ করছে৷ আমরা পেছনে তাকালেই রাস্তা ছেড়ে পাশের ক্ষেত বা জলাশয়ে নেমে যাচ্ছে৷

 

আমরা যখন পৌঁছালাম তখন সাড়ে তিনটা বাজে৷ ইংরেজিতে এই সময়টাকে বলে ডেভিলস আওয়ার৷ যত বন্দী ভূত, পেত্নী, দত্যি দানোকে নাকি এই সময় ছেড়ে দেওয়া হয় দুনিয়া দাপিয়ে বেড়ানোর জন্য৷

অনলাইনে একটা ফাইভ স্টার হোটেল বুক করা ছিলো৷ হোটেল সি কুইন৷ বেশ উন্নতমানের হোটেল৷

নাম কা ওয়াস্তে ফাইভ স্টার না৷

রিসিপশনের ফর্মালিটি সেরে রুমে ঢুকে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না৷ ভেবেছিলাম উঠে দেখবো দুপুর হয়ে গেছে।

কিন্তু মাত্র দশটা বাজে৷ যাক সমুদ্রে নামা যাবে আজ৷

সমুদ্রের তীরের আবহাওয়ার মধ্যেই একটা সতেজতা আছে৷ ক্লান্তি ভুলে যাওয়া যায়৷

আমাদের কাজ বিকালে। বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ রোডের পাশেই সি বীচে কোম্পানীর রিসোর্ট হচ্ছে৷ সেখানে মিটিং আছে।

তন্ময়কে ডাক দিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ফেলিক্স এখনো ঘুমে৷

ইন্টারকমে কল দিয়ে দুটো কফি অর্ডার করলাম। কফি শেষ করে ব্যাগ থেকে ক্যাটফুড আর ফেলিক্সের প্রিয় পুতুলটা বিছানায় রেখে দিলাম৷ গলার লিশটা বিছানার

আলনার সাথে আটকে দুজনে বের হয়ে পড়লাম৷

রিসিপশনে বলে রাখলাম যেন ওর খেয়াল রাখে৷ তবুও টেনশন হচ্ছিলো৷ অবশ্য ফেলিক্স শান্ত বেড়াল৷ ও একা থাকলে পুতুলটা নিয়ে খেলবে৷ খুব বেশি হলে হয়তো ঘরটা একটু নোংরা করবে৷ সেটা ব্যাপার না৷

ওকে পেয়েছিলাম একমাস আগে৷ অফিসে যাবার পথে৷ মা বেড়াল ওকে রেখে চলে গেছে৷ কালো বেড়াল নিয়ে অনেকের কুসংস্কারের ফসল হিসেবে ওকে কেউ নিয়েও যায়নি৷ আমার বেড়াল পোষার অভ্যাসটা সেই ভার্সিটি থেকেই৷ অবশ্য আমার প্রিয় বেড়াল ‘মিনি’ মারা যাবার পর থেকে আর পোষা হয়নি৷

অনেকদিন পর বেড়াল দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না৷ ফ্ল্যাটে নিয়ে এলাম।

মজার ব্যাপার হলো সেই রাতে আমি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছিলাম৷ স্বপ্নটা এখনো মনে আছে৷

গমগমে কণ্ঠে কেউ আমায় বলছে, “ত্রাতা একদিন আপনার মঙ্গল করবেন৷”

কালো বেড়াল নিয়ে সারাদিন অনেক কথা শুনেছি৷ নেটে ঘাটাঘাটি করেছি অনেক৷ এসবের ফলাফল আমার সেরাতের স্বপ্ন।

 

বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম সী বীচ এই কক্সবাজার৷ আমরা নামলাম সুগন্ধা পয়েন্টে৷ তিনটে পয়েন্টের মধ্যে মাঝারি এটা৷

বেশ গোছানো৷ ছোট একটা ঝাউবন আছে৷ মাঝেমধ্যে নাটক সিনেমার শুটিং হয় এখানে৷ কারণ এই পয়েন্টে ভিড় অনেক কম হয় ।

 

সমুদ্রে নেমে শরীরের ক্লান্তি যেন মিশে গেলো জলে৷ দুই বন্ধু বাচ্চাদের মতন অনেকক্ষণ জলে দৌড়াদৌড়ি করলাম৷ টিউব ভাড়া করে ভাসলাম কিছুক্ষণ৷ জেট স্কিতে চড়লাম৷

প্যারাগ্লাইডিংয়ের শখটাও পূরণ হলো এবার৷

এমন করে কখন জোয়ার শেষ হয়ে ভাটার সময় হয়েছে টের পাইনি৷ তীরে দাঁড়িয়ে থাকা লাইফগার্ড হুইসেল বাজাচ্ছে জল থেকে উঠে পড়ার জন্য৷

আমরা উঠতে যাবো এমন সময় তন্ময় আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো৷ ওর চোখেমুখে কীসের যেন আতঙ্ক।

অন্য হাতটা সমুদ্রের দিকে উঁচিয়ে ধরলো৷

আমি তাকাতেই কেমন যেন ধোঁকায় পড়ে গেলাম৷ গত রাতে রাস্তায় যেরকম অসংখ্য চোখওয়ালা আঁকাবাঁকা গাছের মতন বস্তুটা দেখেছি সেটা একটু দূরে জলের মধ্যেও দেখতে পাচ্ছি!

এ ঠিক যেন গাছ না৷ যেন অক্টোপাসের মতন কিলবিলে শুঁড় ওগুলো৷ যতই দেখছি ততই বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে৷

পুকুরের পানা যেমন পুকুরের জলকে একসময় সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে ঐ বস্তুগুলোও সাগরের জলকে ঢেকে ফেলছে৷ পানার সাথে এদের পার্থক্য হলো রঙে৷ এদের রঙ কড়া বেগুনি৷ এই রৌদ্রস্নাত দিনে এমন অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে আর বীচের কেউ দেখছে না কেন?

লাইফগার্ড কাছে এগিয়ে এলো।

“এই যে স্যার, হুইসেল শুনতে পাননি নাকি? তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন৷ আজ আবহাওয়া খারাপ হয়ে যাবে৷ বিপদ সংকেত দেখানোর সম্ভাবনাও আছে।” বলে সমুদ্রের দিকে একবার তাকালো৷

 

আমি একবার ওর চোখের দৃষ্টি পরখ করে নিলাম৷ নির্লিপ্ততা মাখা৷ যেন কিছুই চোখে পড়েনি৷

ওদিকে দিগন্ত থেকে যেন কালো মেঘ ধেয়ে আসছে৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই বৃষ্টির দেখা পাবো৷

অন্য দিন হলে বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করাটা স্বস্তির হতো৷ কিন্তু আজ মন টানছে না৷ সামনের দৃশ্যটা যদি আমাদের দৃষ্টিভ্রমের একটা অংশও হয়ে থাকে তবুও আমার এখানে থাকতে ইচ্ছা করছে না৷ হুট করেই ফেলিক্সের জন্য মনটা কেমন করে উঠছে৷

 

তন্ময় বললো, “ওটা কি আমাদের কাল রাত থেকেই ফলো করছে নাকি?” ওর চোখেমুখে কেমন যেন বিষাদের ছায়া৷

আমি তন্ময়কে অনেক আগে থেকেই চিনি৷ ও ভয় পাচ্ছে না৷ কিন্তু দুঃখবোধটা চোখে পড়ছে৷ কোথায় একটা খাপছাড়া ভাব৷

আর কিছুক্ষণ বীচে থাকলে বীচ আমাদের যেন গিলতে আসবে৷ তাই আর দেরি করলাম না৷

বীচের বালির অংশটা পার হয়ে আবার ফিরে তাকালাম৷ কোনকিছুই পরিবর্তিত হয়নি৷

সাগরজলের উপরিভাগ গাঢ় বেগুনি হয়ে উঠেছে। যেন বিচিত্র রঙের শৈবালের আস্তরণ৷ মাঝেমধ্যে ঢেউয়ের তালে দুলে উঠছে সেগুলো৷

আবার মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে ঢেউ স্থির হয়ে গেছে। কিলবিলে শুঁড়ের মতন বস্তুগুলোই নড়ছে জীবন্ত প্রাণীর মতন!

 

হোটেলে ফিরে ভেবেছিলাম একটু ঘুমিয়ে নেবো৷ দিনটা মেঘলা হয়ে আসছে৷ কিন্তু এসেই দুঃসংবাদ শুনতে হলো।

ফেলিক্স রুম থেকে পালিয়েছে!

এসি রুম৷ জানালা বন্ধই থাকে৷ বের হবার অন্য কোন পথ নেই৷ রুম ক্লিন করার জন্য লোক ঢুকে কোন বেড়াল দেখতে পায়নি৷ গলার লিশটা খাটের পাশের আলনার সাথে লাগানো আছে৷ খাটের ওপর ক্যাটফুড আর ওর খেলনাটা একইভাবে পড়ে আছে৷

ক্লিনার খাটের ওপর লোম দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো৷ ও ভেবেছে কী না কী জন্তু খাটের ওপর বসেছিলো। পরে রিসিপশনে জানানোর পর ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়৷

সারা হোটেল তন্নতন্ন করে খুঁজেও ওকে আর পাওয়া যায়নি৷

এমনিতেই সাগরের ঘটনাটায় মাথা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, ওদিকে আবার ফেলিক্সের অন্তর্ধান মনটাকে বিষিয়ে তুললো৷ পোষা প্রাণীগুলো একসময় আত্মার আত্মীয় হয়ে যায়৷ মানুষের চাইতে ওদের প্রতি ভালোবাসাটা তখন বেশি আসে৷ কারণ ওরা মানুষের মতন স্বার্থপর হয় না৷ ভালোবাসার প্রতিদানে ওদের কাছে দ্বিগুণ ভালোবাসা পাওয়া যায়৷

ওদিকে সময় ঘনিয়ে আসছে৷ বিকেলে কোম্পানির রিসোর্টে মিটিং৷ ভেবেছিলাম মিটিং এর নাম করে তন্ময়ের সাথে একটা ঝটিকা সফর হয়ে যাবে কিন্তু এটা যে এমন বিষাদের সফরে রূপ নেবে কে জানতো৷

 

তন্ময় আমার কাঁধে হাত রেখে অনেক বোঝালো৷ হোটেল ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে ওরা ক্ষমা চেয়েছে৷ এমনকি একটা নতুন পারসিয়ান বেড়াল গিফট পর্যন্ত করতে চেয়েছে৷ কিন্তু তাতে আমার মন সায় দেয়নি৷ ফেলিক্সকে হারানোর কষ্টটা থেকে যাবে৷ ওর জায়গা কেউ কোনদিন নিতে পারবে না৷

 

পড়ন্ত বিকালে গাড়ি নিয়ে বের হলাম । মেরিন রোড ধরে হিমছড়ি পার হয়ে যেতে হবে৷ রাস্তার বামপাশে আকাশ ছোঁয়া পাহাড় আর ডানে সমুদ্রের অসীম জলরাশি। সৌন্দর্যের এক অসম্ভব সুন্দর মেলবন্ধন।

মন ভালো থাকলে হিমছড়ির পাহাড়ে একবার চড়তাম ৷ উঁচু পাহাড় থেকে সাগর দেখার মতন মোহনীয় দৃশ্য আর দুটো হয় না। কিন্তু ফেলিক্সকে হারিয়ে সেটাও আজ ঠুনকো মনে হচ্ছে৷

বেড়ালরা নাকি তাদের মনিবের শরীরের গন্ধ পায় অনেকদূর থেকেই৷ আমি এখনো আশা করছি রাতে ফেরার পর হয়তো দেখবো ফেলিক্স ফিরেছে৷

তন্ময় গাড়ি চালাচ্ছিলো। কিন্তু দেখলাম ও মাঝেমধ্যেই স্টিয়ারিং বামে ঘুরিয়ে হালকা ব্রেক কষে পাহাড়ের দিকে কী যেন দেখার চেষ্টা করছে৷ প্রথমে মনে হলো গাড়ির ইঞ্জিনে কোথাও সমস্যা করছে তাই বামে কোথাও থামাবে৷ কিন্তু না৷

ও উঁকি দিয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করছে৷ আমি ওকে কী দেখছে জিজ্ঞেস করতে যাবো এমন সময় আমার চোখে পড়লো জিনিসটা৷

শরীরে অজান্তেই একটা হালকা কাঁপুনি অনুভব করলাম। রাস্তার সমান্তরালে পাহাড়ের দিকটায় একটা বিশালাকার বস্তু আমাদের পাশাপাশি ভেসে চলেছে৷ পাহাড়ের মেটে সবুজ রঙ ধারণ করেছে সে। দেখতে ভয়ালদর্শন সাপের মতন! আকারে বিরাট৷ পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলছে তাই বোঝা যাচ্ছে না৷

চলনে কিন্তু ভুজঙ্গ ভাবটা থেকে গেছে৷ সরীসৃপ সদৃশ এঁকেবেঁকে চলাটা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে কারণ ওটা ভূমিতে চলছে না৷ মাটি থেকে বেশ কয়েক ফুট উপরে শূন্যে ভাসতে ভাসতে সামনের দিকে এগোচ্ছে৷ চলার ছন্দ আমাদের গাড়ির গতির সমানুপাতিক। তন্ময় যতবার গাড়ি থামিয়েছে ততবার ওটার গতিও মন্থর হয়ে এসেছে৷

শুধু মাঝেমধ্যে গাছগাছালির আড়ালে পড়ে যাচ্ছে বস্তুটা৷ অবশ্য বস্তু না বলে প্রাণী বললেই বা দোষ কোথায়!

প্রাণীটার দেহের সবুজ আবরণের কারণেই পাহাড়ে ছদ্মবেশে ঘোরাটা হয়তো আমরা ছাড়া আর কারোর চোখে পড়েনি।

অশুভ এই সত্ত্বা কি শুধুই আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে কিনা সেটাই বা কে জানে৷

কিন্তু এই প্রাণী আমাদের অনুসরণ করছে কেন?

গতরাতের ঘটনা বা আজ দুপুরের ঘটনার সাথে এর কোন সম্পর্ক আছে কি?

তন্ময়কে দেখলাম খানিকটা ঘাবড়ে গেছে৷ বিশেষ করে প্রাণীটা যখন রাস্তার খুব কাছে চলে আসছে তখন সত্যিই একটা ভয়ের শিহরণ খেলে যাচ্ছে মনে৷ গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে কমিয়েও তো লাভ নেই। তাই আমি ওকে বললাম বামে না তাকিয়ে গাড়ি চালাতে৷

 

রিসোর্টে পৌঁছে বেশ ক্লান্ত লাগছিলো৷ অথচ এই মেরিন ড্রাইভ রোডে সারাদিন গাড়ি নিয়ে চক্কর দিলেও আগে ক্লান্তি স্পর্শ করতো না৷ মেজাজ থাকতো সামুদ্রিক বাতাসের মতই ফুরফুরে। মনের বোঝাটা রাস্তায় আসতে আসতেই ভারী হয়েছে৷ সেটাই যে অযাচিত ক্লান্তির কারণ তা সহজেই বুঝতে পারছি।

রিসোর্টের মিটিং সেরে এক্সিকিউটিভদের হোটেলে সাথে করে আনতে হলো৷ আমাদের হোটেলেই থাকার ব্যাবস্থা করলাম। ভোরে ঢাকায় ফিরবে ওরা।

হোটেলে ফেরার সময় রাস্তায় আর তেমন কিছু চোখে পড়লো না। তন্ময় অবশ্য একবার সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু বোঝাতে চেয়েছিলো কিন্তু সাথে অপরিচিত লোক থাকায় ওকে ইশারায় থামতে বলেছিলাম।

আমাদের সাথে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা সবাই সমানভাবে নেবে না। নেশাখোর বা পাগল ভাবতেও ওদের বাঁধবে না৷

তাই আপাতত এটা নিজেদের মধ্যে রাখাই ভালো।

একেবারে ডিনার সেরে রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে কফি অর্ডার করলাম। শরীর ক্লান্ত কিন্তু মন ছুটোছুটি করছে। ঘুম এমনিতেও হবে না। কফি আসার পর তাতে একটা চুমুক দিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসলাম। কানে হেডফোন গুঁজে রাগ ভৈরবী ছেড়ে দিলাম। সুরলহরীতে মনের উৎকণ্ঠা যদি কিছুটা হলেও কমে।

তন্ময় শুয়ে পড়েছে৷ ঘুমাক বেচারা৷ গাড়িতে ও কী বলতে চেয়েছিলো সেটা শুনতে ইচ্ছা করছে কিন্তু ওকে বিরক্ত করতে চাইছি না।

রাত যখন প্রায় আড়াইটা তখন একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এলো ঘরে৷ ল্যাপটপের চার্জ শেষ৷ ওটা চার্জে দিলাম।

মনে পড়লো ব্যালকনিতে গেলে এখন সমুদ্র দেখা যাবে৷ ঢেউয়ের গর্জন শুনতে পাবো৷ আরেক কাপ কফি হলে ভালো হতো কিন্তু সকালের আগপর্যন্ত কেটারিং সার্ভিস বন্ধ৷

ব্যালকনিতে গিয়ে গ্লাসের স্লাইডার টেনে দিলাম। এসির বাতাসে ঘুমাক তন্ময়৷

আজ ফেলিক্স সাথে থাকলে ওকে কোলে নিয়েই দাড়াতাম এখানে৷ ভাবনাটা মাথায় আসাতে মনটা নিমিষেই বিষণ্ণ হয়ে উঠলো৷ সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে। জোয়ারের ফেনিল ঢেউ দেখা যাচ্ছে৷

মাঝরাতের সমুদ্র যেন ডাকছে আমায়৷ হঠাৎ দেখে মনে হচ্ছে এই বিশাল সমুদ্র কতটা নিঃসঙ্গ৷

ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলাম। এমন সময় মনে হলো একবার যাবো নাকি সী বীচে? ঘুম তো আর আসবে না৷ বীচ ধরে একটু হেঁটে আসলে যদি মনটা একটু ভালো হয়। যেই ভাবা সেই কাজ৷ রুম লক করে নেমে এলাম নিচে৷ রিসিপশনে বাতি জ্বলছে কিন্তু কেউ নেই সেখানে৷ নিচের গেট খোলা। গার্ডদের কাউকেও দেখলাম না। কাল রাতে হোটেলে ঢোকার সময় হোটেল চত্বরে বেশ লোক সমাগম ছিলো। আজ একটা মানুষও নেই।

 

সকালে লাইফগার্ড বলেছিলো আবহাওয়া অনেক বেশি খারাপ হবে৷ হয়তো সে কারণেই লোক নেই বাইরে৷ হাঁটতে হাঁটতে বীচের রাস্তায় এলাম । বীচে যেতে পাঁচ মিনিট লাগলো৷ স্বভাবতই এখানে লোক থাকার কথা না, থাকলেও কম ; তবুও কেন জানি আশা করছিলাম কেউ থাকুক৷

 

মানুষের চলাচল নেই তাই কি না জানি না, এক সমুদ্রের গর্জন ছাড়া আর কিচ্ছু কানে আসছে না৷ চারপাশ এতটা নীরব যেন দম বন্ধ হয়ে আসবে৷ এখন মনে হচ্ছে তন্ময়কে সাথে আনলে বোধহয় ভালো হতো৷ ভীষণ একা লাগতে শুরু করেছে আচমকা। বীচের দোকানপাট আগে অনেক রাত পর্যন্ত খোলা থাকতো৷ আজ সেগুলোও বন্ধ। যেন শহরজুড়ে কারফিউ লেগেছে৷

পুরনো দিনের একটা বদভ্যাস মনে পড়ে গেলো৷ একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো হতো৷ একা একা ভাবটা একটু হলেও কমতো৷

এসব অগোছালো চিন্তার ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একটা পরিচিত শব্দে চিন্তায় ছেদ পড়লো৷ শব্দটা কী সেটা বুঝে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো৷

কোথাও থেকে কিছুক্ষণ পরপর মিউ মিউ শব্দটা ভেসে আসছে! এটা ফেলিক্সের গলা৷ রাতের নিকষ অন্ধকার চিড়ে ওর মিউ মিউ শব্দটা ঘুরপাক খাচ্ছে।

আমি হন্নে হয়ে শব্দটার উৎস খুঁজতে লাগলাম। মনে হচ্ছে বীচের যে অংশটায় জোয়ারের জল এসে বালি ছুঁয়ে যাচ্ছে সেখান থেকে আসছে শব্দটা৷ কিন্তু এই সুদীর্ঘ পথে আমি কোথায় খুঁজবো ওকে!

একটা আশার বিষয় হচ্ছে জায়গাটা খোলামেলা৷ কিন্তু ওর গায়ের রংটা কালো হওয়ায় বেশ অসুবিধা হচ্ছে৷ শব্দ শুনে এই মনে হচ্ছে কাছে আবার এই মনে হচ্ছে দূরে৷ ওদিকে আমার মোবাইলটা রুমে ফেলে এসেছি৷ ফ্ল্যাশ জ্বাললে ফেলিক্সের জ্বলজ্বলে চোখদুটো দূর থেকেও চোখে পড়তো কিন্তু এখন সে উপায় নেই৷

হোটেল থেকে যে তন্ময়কে ডেকে আনাবো তার সুযোগও নেই। ভয় হচ্ছে যদি ওকে ডাকতে গেলে ফেলিক্স হারিয়ে যায়।

একা একা দিশেহারা লাগছে৷ কখন বেড়ালটাকে কোলে নেবো সেটা ভেবে মনটা ছটফট করছে।

ফেলিক্সের শব্দটা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে৷ ধীরে ধীরে শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলতে লাগলো। মনে হলো একটা না৷ অন্তত হাজারটা বেড়াল একসাথে ডেকে উঠছে৷

গমগমে সে শব্দের কম্পাংক

কিছুক্ষণের মধ্যে এমন বেশি হয়ে দাঁড়ালো যে আমার মাথা টনটন করে ব্যাথা করতে আরম্ভ করলো।

হাজার হাজার বেড়াল মাথায় চড়ে নাচছে যেন।

ধীরে ধীরে অসহ্য হয়ে উঠছে সব৷

আমি উদ্ভ্রান্তের মতন ছুটোছুটি করতে লাগলাম৷ কখন যে নিজের পা দুটোর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি জানি না৷ শুধু এতটুকু মনে আছে যে আমি সমুদ্রের দিকে হেঁটে চলেছি আর দিগন্তরেখা থেকে চোখ ধাঁধানো একটা আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে৷ সেই আলো আর শব্দের তীব্রতায় জ্ঞান হারালাম৷

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন আমি আধভেজা হয়ে পড়ে আছি বালিতে৷ চোখ খুলতে গিয়েও আলোর তীব্রতায় বন্ধ হয়ে আসছে৷

শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে উঠে বসলাম৷ চারদিকের আলোর পরিমাণ বেড়ে গেছে। আলোর উৎস সমুদ্রে৷ ঠিকমতো তাকানোই যাচ্ছে না৷ অনেকটা সময় গেলো ধাতস্থ হতে৷ সাগরের ফেনিল জলের ওপর যেন থিয়েটারের পর্দা বসানো হয়েছে!

চারদিক থেকে সেই পর্দায় যেন ফেলা হয়েছে উজ্জ্বল ফ্লাডলাইটের আলো! সেই আলোয় এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি চারপাশ ৷

মিউ মিউ শব্দটা আবার শুরু হয়েছে৷

কিন্তু এবার সেই সুরটার মধ্যে একটা নমনীয়তা আছে৷ কানে লাগছে না৷ এই সুরটার মধ্যে কোন একটা সংকেত আছে যেন৷

সেই সংকেত আমি ধীরে ধীরে টের পেতে লাগলাম৷ অগোছালো বেড়ালের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে একটা উপাখ্যানে পরিণত হচ্ছে৷ মনে পড়ছে ফেলিক্সকে যেদিন কুড়িয়ে পেয়েছিলাম সেদিনের কথা৷ সেই রাতে স্বপ্নে কাউকে বলতে শুনেছিলাম, “ত্রাতা একদিন আপনার মঙ্গল করবেন৷”

 

সাগরের ঢেউ উত্তাল হয়ে উঠছে!

আলোকিত সমুদ্রে আবির্ভূত হচ্ছে সেরাতের রাস্তা আটকানো গাছের মত বস্তুটা। ক্রমান্বয়ে দেখলাম আজ সাগরে দেখা বেগুনি শুঁড়ের মত দেখতে জিনিসটা।

সকালে যেটা দেখেছিলাম৷ তারপর বিকেলে দেখা সবুজ সাপের মতন প্রাণীটা। এসবকিছুই একটা বিশালাকার শরীরের অংশ৷ সব অঙ্গগুলো অক্টোপাসের শুঁড়ের মতন কিলবিল করছে! ছটফট করছে সদ্য কাটা কর্ষিকার মত!

সবকিছুর সম্মিলিত রূপ আকার দিয়েছে একটা ভয়াবহ কুৎসিত প্রাণীর৷ দিগন্তরেখা জুড়ে তার বিস্তার। বিশাল সমুদ্রটা যেন তার অস্তিত্বের কাছে তুচ্ছ এক জলাভূমি!

প্রাণীটার মাথার অংশটা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম!

আমার নিরীহ বেড়াল ফেলিক্সের মুখটা যেন বেলুনের মতন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে জুড়ে দেয়া হয়েছে সেখানে।

আমার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তাভাবনার ধরণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷

ফেলিক্স! এতকিছুর মূলে ফেলিক্স ছিলো। শান্ত, নিষ্পাপ বাচ্চা বেড়ালটা!

আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি৷ কিন্তু এই মৌনতার মাঝেই যোগসূত্র স্থাপিত হচ্ছে দানব ফেলিক্সের সাথে।

আমার মনে জমা হওয়া হাজারটা প্রশ্নের জাল ছিন্ন করে ফেলছে ও৷

যার ভাব সম্প্রসারণ করলে দাঁড়ায় এরকম।

দখলের নেশাটা অশুভ শক্তিদের একটা লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য!

গ্যালাক্সীর পর গ্যালক্সী জুড়ে তাদের বিস্তার। কত নাম না জানা গ্রহ ধবংস হয়ে গেছে তাদের দখলদারিত্বে।

জনবসতিপূর্ণ গ্রহগুলো তাদের নির্মমতায় পরিণত হয়েছে ধবংসস্তূপে! সব গ্রহের পর এবার পালা এসেছে পৃথিবীর! তিনভাগ জলে তাদের অধিকার স্থাপিত হয়ে গেছে। যে প্রবল শক্তির আধার তাদের কাছে আছে তাতে নিমিষে স্থলভাগের ভূখণ্ড উপড়ে নিতে পারবে সে বা তারা৷

একটা কথা শুনে প্রায় পাথর হয়ে গেলাম! ধ্বংসযজ্ঞ নাকি ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে৷ আমি এইজন্য হোটেল থেকে বের হয়ে কাউকে দেখিনি৷ চোখের সামনে সাগরে মরা মাছের মতন ভেসে উঠছে শত শত লাশ!

আমি ফেলিক্সকে বাঁচিয়েছিলাম৷ তাই সে আমায় প্রাণভিক্ষা দিতে চাইলো। জনবিরল এই পৃথিবীর একমাত্র বাসিন্দা হয়ে যাবো আমি৷ আমার আত্মীয়স্বজন আর প্রিয় মুখগুলো পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছে৷

আর আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে কাপুরুষের মতন একা বাঁচতে!

কিন্তু আমি আমার মনোভাব বুঝিয়ে দিতেই কেমন যেন নড়েচড়ে বসলো প্রাণীটা৷ আমি মরে যাই এটা ওরা চাইছে না৷ ওরা ওদের ত্রাতার রক্ষককে মারবে না৷ কিন্তু এর বাইরেও কোন একটা সত্য লুকিয়ে আছে যা আমাকে জানাতে চাইছে না ও৷

কিন্তু আমি মনস্থির করে ফেলেছি৷ ওদের বিকট সত্তায় কোথাও একটা মনোযোগের ঘাটতি ছিলো৷

 

সেই সুযোগে আমি প্রাণপণে ছুটে সমুদ্রে নেমে গেলাম। প্রচণ্ড রাগে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে গর্জন করে উঠলো প্রাণীটা!

প্রাণীটার মনের খবর পাচ্ছি আমি৷ আমি মরে গেলে মরতে হবে ওকেও৷ ধবংস হবে সে। আবার অশুভ সত্তার আগমণের জন্য যুগযুগ ধরে অপেক্ষা করতে হবে! পৃথিবী আবার পুনর্জন্ম লাভ করবে৷

এই চক্রটা বহুকাল থেকেই চলে আসছে৷ বিভিন্ন অপশক্তির প্রভাবে পৃথিবী ধবংস হয়েছে শতবার৷ কিন্তু কেউ না কেউ স্বেচ্ছামৃত্যুতে ফিরিয়ে এনেছে প্রিয় ধরণীকে৷

আমার শরীরে অসংখ্য বিষাক্ত তীর বিঁধে যাচ্ছে যেন৷ অথচ এই মুহূর্তে কেউ জীবিত থাকলে আমার মুখের হাসিটাই আগে দেখতো!

পাঠকেরা যা পড়ছেন